২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:২৬
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিন্দা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসমস্যা মোকাবেলায় জাতিসংঘে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রস্তাব তুলে ধরেন। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোর পৌনে ৬টায় ভাষণ শুরু করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। নিজে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। সে হিসেবে সন্ত্রাসের শিকার মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। সন্ত্রাস মোকাবিলায় আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলে। জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি। বৈশ্বিক এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাবগুলো হলো:
১. সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে;
২. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে এবং
৩. শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান। বলেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া, শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো ও অধিক সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে আমরা সব সময় প্রস্তুত। শান্তি বিনির্মাণে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করি।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রদানকারী অন্যতম দেশ। আমরা জাতিসংঘ শান্তি মিশনগুলোর কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করি।
তিনি বলেন, অব্যাহত শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছ থেকে সাহসী ও উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করছি। এজন্য 'জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে' বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমি এক লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি।
যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই নীতির প্রতিফলন হিসেবে আমরা জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক প্রস্তাবিত যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত ভলেন্টারি কমপ্যাক্টে সমর্থন প্রদান করেছি। এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় আমি মহাসচিবের 'সার্কেল অব লিডারশিপ'-এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে গঠিত 'ভিকটিম সাপোর্ট তহবিলে' প্রতীকী অনুদান হিসেবে আমি এক লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা দিচ্ছি।
যুদ্ধবিগ্রহের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয় মানবকল্যাণ চাই । এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য ।
১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রথম ভাষণের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো এখানে ভাষণ দেয়ার সময় এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে তার অঙ্গীকারের কথা বলে গেছেন।
তিনি বলেন, সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন: ‘এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে। এবং আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখ লাখ শহীদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহীত রয়েছে।’
শান্তির প্রতি তার অঙ্গীকার পূণর্ব্যাক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমরা শান্তি-কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করে চলেছি। এ উপলব্ধি থেকেই সাধারণ পরিষদে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ‘শান্তির সংস্কৃতি’ (কালচার অব পিস) শীর্ষক প্রস্তাব পেশ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর আহবান পূনর্ব্যাক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি, শান্তিবিনির্মাণে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে ‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছ থেকে আমরা সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করছি।
এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে’ ১ লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান প্রদানের ঘোষণাও করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনসমূহের কার্যকারিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আমরা আমাদের নিজস্ব প্রস্তুতি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বজায় রেখে চলছি। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার প্রদান, শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে আমরা সদা প্রস্তুত রয়েছি।
আপনার মন্তব্য