নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ জুন, ২০১৫ ০৪:২৩

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস বর্ষা শুরু আজ

পয়লা আষাঢ়, আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। বাঙালির ষড়ঋতুর প্রাণবন্ত আষাঢ় নিয়ে আসছে বর্ষাকাল। পঞ্জিকার পাতা উল্টিয়ে একই সাথে বর্ষার আগমন ঘটবে ‘অফিসিয়ালি’; যদিও বর্ষার চিরচেনা বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আগে থেকেই।

আষাঢ় প্রতিবারই সাজে নয়া আর নানা রূপে। বৃষ্টিরধারায় নবতর জীবন আসে পুষ্প-বৃক্ষে, পত্রপল্লবে, নতুন প্রাণের সঞ্চার করে প্রকৃতির অবয়বে। নতুন সুরের বার্তা নিয়ে সবুজের সমারোহে আসছে এই বর্ষা।

বর্ষার আসে বৃষ্টির স্বরে, বর্ষা আসে প্রকৃতির গতর ধরে, বর্ষা আসে কবিদের কাব্য হয়ে। বর্ষার প্রাণবন্ত রূপ খুঁজে পাওয়া যায় বিশেষত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যভাণ্ডার থেকে- ‘ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নবযৌবন বরষা/ শ্যাম গম্ভীর সরসা...’অথবা ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে/ ময়ূরের মত নাচেরে/ আকুল পরাণ আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে...’ কিংবা ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগন/তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা/যাসনে ঘরের বাহিরে।’ অথবা ‘আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো/ গেল রে দিন বয়ে/বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে।’

শুধু কী রবীন্দ্রনাথ? ‘মেঘদূত’র মহাকবি কালিদাস তো এই আষাঢ়স্য প্রথম দিবসেই বিরোহী যক্ষ মেঘকে দূত করে সুদূর দুর্গম কৈলাস শিখরে পাঠিয়েছিলেন বিরোহিণী প্রিয়ার কাছে। তিনি এই আষাঢ়েই চিরায়ত কাব্যগ্রন্থ মেঘদূত রচনা করেন। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। বাঙালির অতি প্রিয় এই ঋতুর আগমনে পুরো প্রকৃতি তার রূপ ও বর্ণ বদলে ফেলে। গাছপালা, তরুলতা সবকিছুই যেন গ্রীষ্মের দহন থেকে পরিতৃপ্তি পেতে স্নান করে ওঠে।

কবিতায় নয় কেবল বর্ষায় প্রকৃতিও সাজে অপরূপ সাজে। বর্ষার সতেজ বাতাসে জুঁই, কামিনি, বেলি, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা আরো কত ফুলের সুবাস। লেবু পাতার বনেও যেন অন্য আয়োজন। উপচেপড়া পদ্মপুকুর রঙিন হয়ে ফোঁটে বর্ষাকে পাওয়ার জন্য। কেয়ার বনেও কেতকীর মাতামাতি। রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশও ছেয়ে... আসে বৃষ্টিরও সুবাস ও বাতাসও বেয়ে...’

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘এমনও দিনে তারে বলা যায়, এমনও ঘনঘোর বরষায়...’। বর্ষাকে বরণের জন্য নানা আয়োজনে মেতেছে বাঙালী। যে কথাটি বলি বলি করেও তাকে বলা হয়নি, বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল নিয়ে যেন তারই আসার অপেক্ষা। মনের কথাটি বলার এইতো সময়।

দেশের নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে বর্ষাকে নিয়ে নানা মিথ। কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায় বর্ষাকে বরণ করে ভিন্ন মাত্রায়। প্রতিবছর তারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে মাসব্যাপী বর্ষাবরণ উৎসবের আয়োজন করে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা এ বর্ষা বরণ উৎসবে যোগ দেয়।

হঠাৎ বর্ষা যেমন আনন্দের, বর্ষার নির্মম নৃত্য তেমনি হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। তবুও বর্ষা বাঙালী জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পল্লীর আস্তরণে আনে জীবনেরই বারতা। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাঙলা মায়ের নবজন্ম এই বর্ষাতেই। সারা বছরের খাদ্য-শস্য-বীজের উন্মেষতো ঘটবে বর্ষার ফেলে যাওয়া অফুরন্ত সম্ভাবনার পলিমাটি থেকে।

এদিকে বাস্তবে আষাঢ় নিয়ে তপস্যা আর বিরহ যা-ই থাকুক, বর্ষা ঋতুকে বরণ করে নিতে প্রতি বছরের মতো এ বছরও বর্ষা উৎসবের আয়োজন করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। রাজধানী ঢাকাসহ সিলেটেও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন করবে বর্ষবরণ আয়োজন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত