নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০৬

শিক্ষায় ভ্যাট : যত কথা অর্থমন্ত্রীর

বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট প্রয়োগ নিয়ে একের পর এক পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য রেখে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নিজের বক্তব্যের কারনে অর্থমন্ত্রীকে নিয় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

শিক্ষায় ভ্যাট প্রয়োগ নিয়ে প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসলেও অর্থমন্ত্রী প্রথমদিকে এসব প্রতিবাদ-আন্দোলনকে উড়িয়ে দিয়ে ভ্যাটের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ভ্যাট প্রত্যাহার রা হবে না বলেও জানান তিনি।

আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে রোববার অর্থমন্ত্রী নিজের অনমনীয় অবস্থায় থেকে সরে এসে বলেন, শিক্ষায় ভ্যাট প্রয়োগের বিষয়ে অনড় নয়। আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছা হবে।

১৪ আগস্ট সিলেটে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ভ্যাট প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। সেদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যাপারে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি ক্ষুব্দ কণ্ঠে বলেন,' তারা ৫০ হাজার টাকা ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারে। মাত্র সাড়ে ৭ পাসেন্ট ভ্যাট কেনো দেবে না? তাদের আন্দোলনে আমার কোনোভাবেই সমর্থন নেই।'

এ বছর বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের টিউশন ফি'র উপর সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করা হয়।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা।

এ অবস্থায় ১৪ আগস্ট সিলেটে আসেন অর্থমন্ত্রী। সেদিন এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, 'ভ্যাট প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।' সেদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যাপারে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি ক্ষুব্দ কণ্ঠে বলেন,' তারা ৫০ হাজার টাকা ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে পারে। মাত্র সাড়ে ৭ পাসেন্ট ভ্যাট কেনো দেবে না? তাদের আন্দোলনে আমার কোনোভাবেই সমর্থন নেই।'

গত বৃহস্পতিবার সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'শিক্ষায় ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে না। তবে এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফি বাড়াতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই ভ্যাটের টাকা পরিোধ করতে হবে।'

এসময় অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, 'আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একজন শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের গড় খরচ একহাজার টাকা। তারা কেনো ৭৫ টাকা ভ্যাট দিতে পারবে না।'

এরপর শুক্রবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে নিজের আগের দিনের বক্তব্য থেকে সরে এসে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'এ বছর ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় যাতে এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় না করে, সেজন্য সরকার মনিটরিং করবে। আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাট দিতে হবে।'


আরোপিত ভ্যাট এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে মুহিত বলেন, 'যেহেতু প্রথম বছর হিসেবে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, তাই আমরা তা মেনে নিয়েছি। এ বছর শিক্ষার্থীদের ভ্যাট দিতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ভ্যাট পরিশোধ করবে। কিন্তু পরবর্তী বছর থেকে শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাট দিতে হবে।'

শনিবার বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে ফি নেয়, তা খুবই হাই। আমি একটি হিসাব করে দেখেছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর প্রতিদিন খরচ হয় এক হাজার টাকা। এটা তার ফি, বইয়ের খরচ, লাইব্রেরি ফি, খাওয়া-দাওয়াসহ। আমি সেখান থেকে কত চেয়েছি? মাত্র ৭৫ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমি বলেছি যে এই সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট, যেটা টিউশন ফি আদায় হচ্ছে সেখান থেকে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীদের বলছি, তোমরা যদি নজর না দাও তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফি, ডেভেলপমেন্ট ফান্ড কিংবা অন্য কোনো নামে তোমাদের কাছ থেকে এই অর্থ তুলে নেবে। সে জন্য তোমরা আগামী বছরের জন্য প্রস্তুতি নাও, যেন ফি না বাড়ে।'

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, 'নতুন রাস্তা-ঘাট আমরা আর করছি না। বিদ্যমান সড়কের মান ভালো করছি। স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া আরও অনেক খাত থেকে আমাদের ওপর হুকুম আসছে, সে খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। সে টাকাটা কোথা থেকে আসবে? সেটার জন্য রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আর রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন জায়গায় খোঁচা দিতে হয়। তেমনই একটি হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ।'

সর্বশেষ রোববার অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, “ভ্যাট নিয়ে যে জটিলতা হয়েছে, সে বিষয়টির একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো যাবে। শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান হবে।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে আমরা রিজিড অবস্থান নিইনি।… গত ছয় বছরে আমরা অনেক বিষয় রিভিউ করেছি।”

অর্থমন্ত্রী একেক সময় একে কথা বলায় ভ্যাট নিয়ে চলমান সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারাও।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘ভ্যাটবিরোধী চলমান আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে যা বলেছেন সেটাই আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতি বলে মনে করি। ভ্যাট নিয়ে নানারকম বক্তব্য পুরো বিষয়টিকে হ-য-ব-র-ল করে তুলেছে। এ ইস্যুতে অর্থমন্ত্রী কী বললেন সেটা আমার কাছে মুখ্য নয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রভাবশালী এক মন্ত্রী বলেন, এ ইস্যুতে অতিকথনই পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। ওই মন্ত্রী আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী ভাবেন ইংরেজিতে, বলেন বাংলায়। তাই তার কনসিসটেন্সি থাকে না।

ভিডিও :

আপনার মন্তব্য

আলোচিত