সিলেটটুডে ডেস্ক

২৩ জুন, ২০২৬ ০২:৪৬

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, কর্মসূচি ঠেকাতে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি

নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রোববার (২১ জুন) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নগরীর ২০০টির বেশি কৌশলগত স্থানে বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানো হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

ডিএমপি জানায়, নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি তাদের বিশেষায়িত ইউনিট ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) মাঠে সক্রিয় থাকবে। এছাড়া সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও আইএডি সদস্যরা গোয়েন্দা তৎপরতা চালাবেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার চারটি প্রধান কন্ট্রোল রুমে অতিরিক্ত ফোর্স রিজার্ভ রাখা হবে। নিরাপত্তা কার্যক্রম তদারকিতে পুলিশ কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে, চলতি মাসের শুরু থেকে ২০ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন মামলায় বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

কেবল ঢাকা শহরেই নয় এর বাইরে সারাদেশের অন্তত ৫ জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য তৎপরতা প্রতিরোধে ছয় জেলায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কমিশনড কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার।

সোমবার (২২ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ইসমাইল হোসেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলায় ২২ জুন থেকে ৩০ জুন তারিখ পর্যন্ত এই আদেশ কার্যকর থাকবে।

মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২(১) ও ১৭ ধারা অনুযায়ী এসব এলাকা ও এ সময়ের জন্য এই কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করা হলো। কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপদমর্যাদার কর্মকর্তারাও এ ক্ষমতার আওতাভুক্ত হবেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ এবং ১৪২ অনুযায়ী অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে তারা এই ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

কেবল সরকারি ব্যবস্থাই নয়, আওয়ামী লীগের যেকোনো কর্মসূচি ঠেকাতে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত সব গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে দলটি। সোমবার (২৩ জুন) এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই কর্মসূচির কথা জানানো হয়। নির্দেশনায় এনসিপির সকল স্তরের নেতা-কর্মীকে বিকেল পাঁচটায় নিজ নিজ জেলা ও মহানগর এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি না থাকলেও আগের কিছুদিনের ধারাবাহিকতায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার কে এম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হককে দলের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দি। বন্দি অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে দলের তৃতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ ঘোষণার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর থেকে তিনি দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলে দলটির সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ভারতে আশ্রয় নেন। দেশে জুলাইয়ের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়’ তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্বাহী আদেশ জারি করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর বিএনপি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে আইনি ভিত্তি দেয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আওয়ামী লীগের (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কাজী হুমায়ুন বশীর সাহেবের কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনের বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।’ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু আরও লেখেন- ‘আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনো আসে নাই, তাই যাঁরা বাইরে আছেন তাঁরা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’-এ লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগ সরকারের ভয়ভীতি, ত্রাস ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে সম্মেলনকে (মুসলিম লীগের কর্মীদের সম্মেলন) সহযোগিতা দিতে অনেক ঢাকাবাসী সাহস পাননি। সম্মেলনের জন্য সরকারি কোনো মিলনায়তন জোগাড় করা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে কাজী হুমায়ুন বশীর তাঁর কে এম দাস লেনের বাসভবন রোজ গার্ডেনে সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেন। সম্মেলনের প্রস্তুতি চলার সময় ভাসানী (মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী) ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে থাকতেন। ১০ জুনের দিকে সংবাদ পাওয়া গেল, সরকার ভাসানীকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা করছে। খন্দকার মোশতাক আহমদ তখন কাজী বশীরের সঙ্গে পরামর্শ করে শওকত আলীর সহায়তায় ভাসানীর গায়ে কম্বল পেঁচিয়ে তাকে সেই রাতেই ঘোড়ার গাড়িতে করে রোজ গার্ডেনে পৌঁছে দেন। সম্মেলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাসানী কাজী বশীরের রোজ গার্ডেনেই ছিলেন।’

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার বর্ণনা দিতে গিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ আরও লেখেন, ‘২৩ জুন (১৯৪৯) বেলা তিনটায় রোজ গার্ডেনের দোতলার হলঘরে সম্মেলন শুরু হয়। সেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ কর্মী উপস্থিত হন।’ ১৫০ মোগলটুলি সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদ তার বইয়ে লেখেন, ‘এখানে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই শাখা অফিসকে কেন্দ্র করেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত হয়। ঢাকার নবাববাড়িকেন্দ্রিক প্রভাব খর্ব করার ক্ষেত্রে ১৫০ নম্বর মোগলটুলির তরুণদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।’

‘আওয়ামী লীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’ বইয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘আতাউর রহমান খান মূল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অনেক আলোচনার পর ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগ নামটি মওলানা ভাসানীর দেওয়া। ...২৩ তারিখের (২৩ জুন) অধিবেশনের শেষ দিকে মওলানা ভাসানী প্রস্তাব করেন, প্রতিটি জেলা ও প্রতিষ্ঠানের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হোক। এত বড় কমিটি করার ব্যাপারে অনেকেরই আপত্তি ছিল। পরে মওলানা ভাসানীকেই কমিটি করার অনুরোধ জানানো হয়। ভাসানী পরামর্শের জন্য একটি ঘরে ঢোকেন এবং কিছুক্ষণ পর বাইরে এসে ৪০ জন নিয়ে একটি কমিটির প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটির ব্যাপারে সবাই একমত হন। কমিটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (সভাপতি), আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমেদ খান, আলী আমজাদ খান ও আবদুস সালাম খান (সহসভাপতি), শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে এম রফিকুল হোসেন (সহসম্পাদক) এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান (কোষাধ্যক্ষ)।’

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় ১৯৫৫ সালে। এ প্রসঙ্গে ড. শ্যামলী ঘোষ তার বইয়ে উল্লেখ করেন, “১৯৫৫ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সদস্যপদ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথম বিষয়টি উত্থাপিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভাসানী কর্তৃক জনমত যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে (ছিল)।” পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তি অর্থাৎ স্বাধীনতার পর দলটির নাম হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত