স্পোর্টস ডেস্ক

২৩ জুন, ২০২৬ ০১:৫০

৩৮-এও দলকে একা টানছেন মেসি, নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা

ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় অথবা ফুটবলীয় চেতনাবিরোধী ‘হ্যান্ড অব গড’-এর ৪০ বছর পূর্তির দিনে ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হলো আরও এক মহাকাব্যিক রাতের। গ্যালারিজুড়ে হাজারো ভক্তের ‘মুচাচোস’ গানের উৎসবের রাতে অস্ট্রিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউটে (রাউন্ড অব ৩২) পা রাখল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা।

আর এই জয়ের নায়ক সেই চিরচেনা লিওনেল মেসি, যিনি ৩৮ বছর বয়সেও জাদুকরী পারফরম্যান্সে একাই টানলেন দলকে।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুই ম্যাচ খেলে ৫ গোল করেছে আর্জেন্টিনা, এবং তার সবগুলোই একা লিওনেল মেসির। 

ডালাসের কানায় কানায় পূর্ণ ৮০ হাজার আসনের স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুতেই চরম নাটকীয়তার জন্ম হয়। ৫ম মিনিটে মেসির পাস ধরে লাউতারো মার্তিনেস বক্সে ঢুকলে অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডার স্তেফান পশ তাঁকে ফাউল করেন। ভিএআর দেখে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড ভাঙার মোক্ষম সুযোগ পান মেসি। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে ৯ম মিনিটে মেসির বাঁ পায়ের শটটি পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়।

এটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির তৃতীয় পেনাল্টি মিস, যা বিশ্বকাপে একক খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড।

তবে পেনাল্টি মিসের সেই হতাশা উবে যায় ম্যাচের ৩৮ মিনিটে। লাতিন আমেরিকার চিরচেনা ধ্রুপদী ছন্দে চোখজুড়ানো এক দলীয় আক্রমণে লিড নেয় আলবিসেলেস্তেরা। বাঁ প্রান্ত থেকে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু কাটব্যাকে বুদ্ধিদীপ্তভাবে বল নিজের পায়ের নিচ দিয়ে গলিয়ে (ডামি) দেন থিয়াগো আলমাদা। পেছনে একদম ফাঁকায় বল পেয়ে যান মেসি; বাঁ পায়ের নিখুঁত ছোঁয়ায় অস্ট্রিয়ার জাল কাঁপাতে কোনো ভুল করেননি তিনি। এই গোলের মাধ্যমে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৭ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে যান মেসি। একই সঙ্গে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোর পর তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি।

১-০ তে পিছিয়ে পড়ে বিরতির পর আক্রমণের ধার বাড়ায় রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া। নিজের শততম ম্যাচ খেলতে নামা মার্সেল সাবিৎসার ও কনরাড লাইমারের জুটিতে তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ৫৫ মিনিটে সাবিৎসারের বিপজ্জনক এক ফ্রি-কিক বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে রুখে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। এর পরপরই ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দিকে নামান স্কালোনি। ম্যাচের শেষ দিকে হুলিয়ান আলভারেজ, পারেদেস ও তালিয়াফিকোকে মাঠে নামিয়ে রক্ষণ আরও নিরেট করে আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের যোগ করা সময়ের (৯৫ মিনিটে) নাটকীয়তা রূপ নেয় চরমে। অস্ট্রিয়ার কেভিন ডানসো ও পাত্রিক ভিমারের একটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। ওয়ান-টু-ওয়ান পাসে অস্ট্রিয়ার বক্সের ভেতর প্রথমে আলভারেজের শট ও পরে মেসির প্রথম প্রচেষ্টা ডিফেন্ডাররা প্রতিহত করলেও, সেকেন্ড চান্সে বল পেয়ে দারুণ দক্ষতায় লক্ষ্যভেদ করেন মেসি। এই গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপে মেসির গোল সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮-তে। চলতি বিশ্বকাপে ২ ম্যাচে ৫ গোল নিয়ে এখন পর্যন্ত তিনিই আসরের শীর্ষ গোলদাতা।

এই জয়ের ফলে ২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জে’-র শীর্ষস্থান ধরে রেখে নকআউট নিশ্চিত করল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অন্যদিকে সমান ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে অস্ট্রিয়া।

এই ম্যাচের পর একটি অনন্য রেকর্ডের মালিকও হয়েছেন মেসি। আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ক্যারিয়ার মিলিয়ে টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে ৩৫ বারের মতো অংশ নিয়ে প্রতিবারই (১০০% রেকর্ড) নকআউট পর্বে ওঠার অবিশ্বাস্য এক কীর্তি গড়লেন এই ফুটবল জাদুকর।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত