২০ জুলাই, ২০২৬ ১২:৫৫
ফুটবল বিশ্বে পরিসংখ্যান আর অন্ধবিশ্বাসের লড়াই নতুন কিছু নয়। তবে কিছু কিছু পরিসংখ্যান এতটাই অমোঘ হয়ে সামনে আসে যে, তাকে আর কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তেমনি এক ভীতি জাগানিয়া মাসের নাম ‘জুলাই’।
আগের তিন ফাইনালের মতো এবারও অভিশপ্ত-জুলাইয়ে আটকা পড়ল আর্জেন্টিনা। জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের ষোলোকলা যেন পূর্ণ! স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় হেরে আর্জেন্টিনার ঝুলিতে জমা হলো জুলাই মাসের ৪ নম্বর ফাইনাল হারের ক্ষত।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের সুদীর্ঘ পথচলায় আর্জেন্টিনা এ পর্যন্ত যতবার জুলাই মাসে ফাইনালের মঞ্চে পা রেখেছে, ততবারই রানার্সআপের মেডেল গলায় ঝুলিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। এই অশুভ জুলাই যেন দলটির জন্য এক অন্তহীন দুঃস্বপ্নের নাম।
১৯৩০: প্রথম আসরেই জুলাইয়ের ধাক্কা
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসের প্রথম আসরটি বসেছিল ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে। সেই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াইটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৩০ জুলাই। স্বাগতিক উরুগুয়ের বিপক্ষে ফাইনালে লড়েছিল আর্জেন্টিনা। তবে প্রথমার্ধে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে হেরে ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার। জুলাই মাসে ফাইনাল হারের সেই যে শুরু, তা আর থামেনি।
১৯৯০: ম্যারাডোনার কান্নার ৮ জুলাই
আর্জেন্টিনা তাদের প্রথম দুটি বিশ্বকাপ (১৯৭৮ ও ১৯৮৬) জিতেছিল জুন মাসে। কিন্তু দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে আবারও ফাইনাল পড়ে জুলাই মাসে। ৮ জুলাই রোমের সেই ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৮৫ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল হজম করে এবং দুজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বমঞ্চে ম্যারাডোনার সেই কান্না আজো আলবিসেলেস্তেদের অন্যতম বড় আক্ষেপ।
২০১৪: ব্রাজিলের মাটিতে হৃদয়ভঙ্গ মেসির
ঠিক ২৪ বছর পর, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আবারও জুলাই মাসের অভিশাপ হানা দেয় আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে। ১৩ জুলাই রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ট্রফি জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১১৩তম মিনিটে মারিও গোটজের সেই বিখ্যাত গোলে আবারও জার্মানির কাছেই শিরোপা হারায় তারা। আরও একবার ১৩ জুলাইয়ের ফাইনাল আর্জেন্টিনাকে উপহার দেয় এক বুক হাহাকার।
২০২৬: ভাঙল না বৃত্ত, ইতিহাস হলো দীর্ঘায়িত
কিলিয়ান এমবাপেদের হারিয়ে ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বজয়টি এসেছিল ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আসরটি আবারও ফিরে যায় চিরচেনা জুন-জুলাইয়ের সূচিতে। দুর্দান্ত খেলে লস অ্যাঞ্জেলেসের ফাইনালের টিকিট কাটলেও সমর্থকদের মনে বড় ভয় ছিল ২০ জুলাইয়ের ফাইনালের তারিখটি নিয়ে।
সেই আশঙ্কাই সত্য হলো। নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের চোখ ধাঁধানো ফুটবলের সামনে পুরো ১২০ মিনিট জুড়েই নিজেদের ছায়া হয়ে রইল আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় পার করে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেররান তোরেসের করা একমাত্র গোলটি আর্জেন্টিনার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড আর ম্যাচ শেষের কুৎসিত হাতাহাতি কেবল দলটির হতাশার গভীরতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে。
চারটি আলাদা প্রজন্ম, চারজন ভিন্ন ভিন্ন কোচ এবং আলাদা মহাদেশ—সবকিছু বদলে গেলেও আর্জেন্টিনার জন্য বদলাল না শুধু জুলাইয়ের ভাগ্য। আজ আরও একটি জুলাইয়ের ট্র্যাজেডি শেষে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল চরম শূন্যতা নিয়ে।
আপনার মন্তব্য