২১ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:৫৪
নগরীর জল্লারপাড় সড়ক দিয়ে ছেলেকে নিয়ে লামাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন মা আরতি রায়। মণিপুরী রাজবাড়ি এলাকায় যাওয়ার পরই ছেলে শুভ্র চেঁচিয়ে উঠলো- 'মা, মা, ওই দেখো গুহা। গুহার ভেতরে ঢুকবো।'
নাছোড়বান্দা ছেলের আবদারে গুহার ভেতরে ঢুকলেন মা। ঢুকে তো ছেলের সাথে তিনি নিজেও রোমাঞ্চিত। বললেন, মনে হচ্ছে আদিম যুগের কোনো পাহাড়ি গুহার মধ্যে প্রবেশ করেছি। গুহার ভেতরে দুর্গার মূর্তি। একটা গা ছমছমে ভাব। সত্যিই এডভাঞ্চারাস।
মণিপুরী রাজবাড়িতে দুর্গা দর্শনে গিয়ে 'এডভাঞ্চারাস' অনভূতি হয়েছে আরো অনেকেরই। গুহার আদলে নির্মান করা হয়েছে এখানকার মন্ডপ। গুহার সরু পথ দিয়ে লাইন ধরে মন্ডপে প্রবেশ করছেন নারী ও পুরুষ। যেনো রুপকথার গল্পের 'চিচিং ফাঁক' বলার সাথে খোলে যাচ্ছে গুহার ভেজানো কপাট।
মঙ্গলবার ছিলো দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী। মঙ্গলবার মণিপুরী রাজবাড়িতে গিয়ে এমন নান্দনিক মন্ডপের দেখা মিলে। এই মন্ডপ দেখতে ভিড় করছেন অনেক দর্শনার্থী ও ভক্তকুল।
এমনিতেই দাড়িয়াপাড়া এলাকায় দুর্গা পূজার মন্ডপ তৈরিতে বরাবরই নান্দনিকতা ও সৃষ্টিশীলতার ছাপ থাকে। এখানকার চৈতালি, সনাতন পূজা কমিটির মন্ডপগুলো প্রতিবারই দর্শনীয় হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই এই এলাকায়ই পূজা পরিক্রমায় বেরোনো ভক্তদের ভিড় বেশী।
আজ (বুধবার) দূর্গােৎসবের মহা অষ্টমী। আজ থেকে পূজা দেখতে আসা ভক্তদের ভিড় আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
মঙ্গলবার রাতে মণিপুরী রাজবাড়ির গুহামন্ডপে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকের তাল, ধূপের ধোয়ায় অন্ধকার দেবী দুর্গার বেদীর চারপাশ। যেনো এই মাত্র মাটি ফূঁড়ে গুহার ভেতরে আর্ভির্ভত হলেন দেবী দুর্গা। সবমিলিয়ে এক আদি ভৌতিক পরিবেশে। এরমধ্যে দৈববাণী ভেসে আসার মতো সাউন্ডে সিস্টেম থেকে ভেসে আসছে আরাধনা সংগীত।
সারিবদ্ধ ভাবে মণিপুর রাজবাড়ি মন্দিরে প্রবেশ করছেন পূণ্যার্থীরা। উৎসবে মুখরিত চারপাশ।
মণিপুরী রাজবাড়ি পূজা আয়োজক কমিটির সদস্য বেণু মাধব দাশ বলেন, নান্দনিক মন্ডপ তৈরিতে আমরা শ্রেষ্ঠ এমনটি দাবি করছি না, তবে আমরা ব্যতিক্রম।
মণিপুরী রাজবাড়ি পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ গোপ বলেন, এখন পর্যন্ত সুন্দর ভাবে পূজার কার্যক্রম চলছে।
পূজায় তাহিরপুর থেকে আসা পুণ্যার্থী স্কুল শিক্ষিকা রেবা রাণি তালুকদার বলেন, এখানে তিনি গত কয়েক বছর থেকেই পূজা দেখতে আসেন। এখানের মন্ডপের সাজসজ্জ্বা খুব সুন্দর হয়। ব্যতিক্রম কিছু থাকে।
রাজবাড়িতে পূজা দেখতে এসেছে চতুর্থ শ্রেনীর শিক্ষার্থী পথিক তালুকদার। পথিক জানায়, সে প্রার্থনা করেছে যেন আগামী বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারে।
ঢাক ঢোলের তালে যারা সবাইকে মাতিয়ে রেখেছেন তাঁদের একজন বাদ্যযন্ত্র শিল্পী সত্যরঞ্জন চন্দ্র ঋষি বলেন, তাকে পাঁচ দিনের জন্য এখানে ভাড়া করে আনা হয়েছে। বিজয়া দশমীর শেষে তাঁদের ভাড়া প্রদান করা হবে।
মন্ডপ এলাকার পঞ্চতত্ত্ব ভেজিটেবল এন্ড কনফেকশনারীর বুদ্ধ গৌড় দাশ বলেন, পূজা উপলক্ষ্যে তাঁদের বেচা কেনা বেশ ভালো।
মণিপুরী রাজবাড়ির পূজায় পুরোহিতের কাজ করছেন সত্য ভট্টাচার্য আর প্রতিমা নির্মাণ করেছেন হিমালয় পাল।
আয়োজকরা জানান, মাগুরার দিলিপ বকশী ডেকারোটার্স এই ব্যতিক্রমী মন্ডপটি তৈরি করেছে।
হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুসারে দেবী দূর্গা ‘দূর্গতিনাশিনী’ বা সকল দুঃখ দুর্দশার বিনাশকারিনী। পুরাকালে দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর’র শরীর থেকে আগুনের মত তেজরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল এক আলোক পূঞ্জে পরিণত হয়। ঐ আলোক পুঞ্জ থেকে আর্বিভূত এক দেবী মূর্তি। এই দেবীই হলেন দুর্গা। দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত আদ্যাশক্তি মহামায়া অসুর কুলকে একে একে বিনাশ করে স্বর্গ তথা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে শান্তি স্থাপন করেন।
আপনার মন্তব্য