নিরঞ্জন দে

০১ মে, ২০২৬ ১৩:৩৩

মানবসভ্যতার নন্দনভুবনে মহামতি বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের অবদান

অমৃতবাণীর অপেক্ষায় মানব সন্তান। সেই মহাপ্রাণ কে? যিনি ত্রাণ করতে আসবেন, নানা ভাবে আসবেন, ফিরে ফিরে আসবেন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ নিজের স্বার্থে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, প্রসারিত করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিংসার আশ্রয় নিয়েছে। স্বার্থ-দ্বন্দ্ব-বিরোধ বিদ্বেষ মানব মহিমাকে করেছে কালিমালিপ্ত, করেছে খর্ব, ক্ষুদ্র। আজও হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহামতি গৌতম বুদ্ধের অমৃতবাণী বিশ্বচরাচরে মানুষকে যে অহিংস পথের সন্ধান দিয়েছে তার স্মরণেই লিখেছিলেন-

“নূতন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী
করো ত্রাণ মহাপ্রাণ, আনো অমৃতবাণী,
বিকশিত করো প্রেমপদ্ম চিরমধুনিষ্যন্দ।
শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,
করুণাঘন, ধরণীতল করো কলঙ্কশূন্য।”

হিংসা মানবসভ্যতাকে কলঙ্কিত করেছে বার বার, আজও করছে। তাই অহিংস মৈত্রীময় সর্বজীবের আবাসস্থল এ পৃথিবীর কল্যাণে বুদ্ধবাণীর অবদান অপরিসীম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে বৈদান্তিক দর্শন উপনিষদের ব্যাপক ও উজ্জ্বল প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এরই সাথে শান্ত সৌম্য বুদ্ধের ধ্যানস্থ রূপের সামনে তিনি নত হয়েছেন বার বার। চোখের জলে তাঁর সকল অহংকার ডুবিয়ে দিয়ে তিনি মাথা নত করেছেন বুদ্ধের স্মরণে। তাই রবীন্দ্র সাহিত্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের প্রভাব নানা লেখায় স্পষ্টত ফুটে উঠেছে। আধুনিক বাঙালির মানসপটে তাই বৌদ্ধ দর্শনের অমৃতবাণী চিরতরে গাঁথা হয়ে আছে। সাহিত্যে, শিল্পে, স্থাপত্যকলায়, সংগীতে, নৃত্যে ও চিত্রকলায় প্রাচীন ভারতে এবং গোটা এশিয়া মহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের অবদান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সহ বহু মনীষীর মুখে ও লেখায় শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখিত হয়েছে। এশিয়া মহাদেশ তথা ভারত ভূমিতে জ্ঞানচর্চা, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বৌদ্ধ ধর্মের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। যিনি হিংসার বিরুদ্ধে মৈত্রী, দান, করুণা, শিষ্টাচার ও ভালোবাসার বাণী প্রচার করেছেন সংঘশক্তি প্রতিষ্ঠা করে। তিনি এবং তাঁর সংঘের প্রভাবে এবং শিক্ষায় ধর্ম থেকে এক অপূর্ব নন্দনভুবন সৃষ্টি হয়েছে। ধ্যানরত ভগবান বুদ্ধের যে রূপ, যে মুর্তি বা ভাস্কর্য তার নান্দনিক ও দার্শনিক দিক গুলোই একজন উদার চিত্তের মানবিক মানুষকে শ্রদ্ধায় অবনত করে। শিল্প ও ভাস্কর্যের জগতে ধ্যানস্থ বুদ্ধ যেনো এক অনুপম সৃষ্টি। এই মূর্তি কেবল কোনো ধর্মীয় শিল্পকর্ম নয়, বরং এটি মানুষের অন্তর্গত আত্মজিজ্ঞাসা, অনন্ত প্রশান্তি ও জ্ঞানের সাধনার এক সার্বজনীন প্রতীক। এক উৎকর্ষ শিল্প। ধ্যানরত বুদ্ধের শান্ত মুখচ্ছবি যেন মহাজগতের কেন্দ্রে এক স্থির দীপশিখা- তিনি যেনো বলেন, “যে নিজেকে চিনেছে, সে জগতকে চিনেছে।” ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি তাই মানবচিন্তার ইতিহাসে আত্মবোধ, নির্বাণ ও চিত্তের নির্মলতার শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে স্থিত।

ধ্যান বৌদ্ধ দর্শনের কেন্দ্রীয় সাধনা। বুদ্ধের নিজস্ব জীবনে ধ্যানই ছিল বোধিলাভের প্রধান উপায়। বোধিবৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সিদ্ধার্থ গৌতম চরম সত্য উপলব্ধি করেন- “জীবনের সমস্ত দুঃখের কারণ আসক্তি, আর মুক্তির পথ নিরাসক্তি।”এই অবস্থাই বোধি বা জ্ঞানপ্রাপ্তি। ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তি এই মুহূর্তেরই প্রতিরূপ- বোধিবৃক্ষতলে অন্তর্মুখী, জাগ্রত ও নিস্তব্ধ সেই মুহূর্তের স্থিতচিত্র এই ধ্যানস্থ বুদ্ধমুর্তি। বৌদ্ধ দর্শনে ধ্যান হলো চিত্তের প্রশমনের প্রক্রিয়া, যেখানে মন সমস্ত অশান্তি থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রতার মাধ্যমে স্বরূপে স্থিত হয়। এই অবস্থায় তিনটি মূল সত্য অনুধাবন সম্ভব হয়: অনিত্য- সবকিছু ক্ষণস্থায়ী। দুঃখ- আকাঙ্খা দুঃখের উৎস। অনাত্মা- কোনো স্থায়ী আত্মা নেই; অপরিবর্তনীয় আত্মা নেই। ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্তি তাই এই তিন সত্যের গভীর উপলব্ধির এক প্রতীক- যেখানে “চেতনা” ও “বিশ্ব” এক হয়ে যায়, বিভাজন বিলীন হয়।

ধ্যানরত বুদ্ধ সাধারণত ধ্যানমুদ্রায় উপবেশনরত।
এই মুদ্রার প্রতিটি অংশ একটি দার্শনিক তত্ত্ব প্রকাশ করে- দুই হাতের ভঙ্গি, একটির উপর আরেকটি হাত জ্ঞান ও করুণার মিলনের প্রতীক। পদ্মাসন পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতীক। মুদিত নয়ন অন্তর্জগতের দিকে দৃষ্টিকে স্থির করে। মৃদু হাসি নির্বাণপ্রাপ্ত চিত্তের প্রশান্তির ইংগিত দেয়। সোজা মেরুদণ্ড স্থিতি, সচেতনতা ও ধ্যানের সাম্য অবস্থা প্রকাশ করে।

বুদ্ধের নির্বাণ মানে কোনো শূন্যতা নয়, বরং চূড়ান্ত চেতনার উন্মোচন- যেখানে জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সংসারচক্র) অতিক্রম করা যায়। ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্তির প্রশান্ত মুখ সেই “অতিক্রমের আনন্দ” প্রকাশ করে। এটি “অস্তিত্বের শেষ” নয়, বরং অস্তিত্বের নতুন মাত্রা। এখানে ব্যক্তি আর জগৎ পৃথক নয়; সবকিছু এক অনন্ত চৈতন্যে বিলীন। বুদ্ধ দর্শনে মুক্তি কোনো বাহ্যিক ত্যাগে নয়, চেতনার বিশুদ্ধতায় প্রাপ্ত হয়।

ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্তি এক নান্দনিক সমাহার-দার্শনিক গভীরতার সঙ্গে রূপের মাধুর্য মিশে গেছে এতে। মাথার উঁচু শিখা (উষ্ণীষ) - প্রজ্ঞার আলোকশিখা। অর্ধনিমীলিত নয়ন - অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী চেতনার সংযোগ। মৃদু হাসি যেনো নির্বাণের প্রশান্ত সুখ। বস্ত্রের সরলতা - নিরাসক্ত জীবন। মূর্তির সমতা - মধ্যমার্গ, আতিশয্য ও ঘাটতির পরিহার। এই নান্দনিক সুষমাই বুদ্ধদর্শনের মূল নীতি যা “মধ্যপন্থা” হিসেবে স্বীকৃত। এই বিষয়টি ভাস্কর্য শিল্পকে দান করেছে এক ব্যতিক্রম মর্যাদা।

ধ্যানরত বুদ্ধ কেবল বৌদ্ধধর্মের প্রতীক নয়; এটি মানবতার সার্বজনীন প্রতীক। মানবতার শিল্পরূপ। এ মূর্তি শেখায় - বাহিরে নয়, সত্য নিজের অন্তরে। সহানুভূতি ও প্রজ্ঞা মিলেই মুক্তি। শান্তিই শক্তি, নীরবতাই গভীরতম ভাষা। আজকের হিংসায় উন্মত্ত ভোগবাদী, উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত সভ্যতায় ধ্যানরত বুদ্ধের প্রতিমা যেন এক চিরন্তন আহ্বান- “Return to yourself, for the universe is within you.” চেতনার বোধিবৃক্ষের নিচে ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্তি যেনো অসীম দর্শন- এক কালোত্তীর্ণ শিল্প। সুতরাং প্রাচীনকাল থেকে শিল্পকলায় বৌদ্ধ ধর্মের অবদান অপরিমেয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম কখনও শুধু উপাসনার পথ নয়, বরং এক গভীর নান্দনিক সাধনার উৎস। প্রাচ্যের মনন ও সৃষ্টিশীলতা চিরকাল ধর্মচেতনার সঙ্গে জড়িত। সেই ধারাতেই বৌদ্ধ ধর্ম প্রাচীন ভারত ও সমগ্র এশিয়াজুড়ে শিল্পকলার জগতে এক নবজাগরণ ঘটিয়েছিলো। শিল্পকলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কেবল ধর্মীয় আচার বা মন্দির-নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সৌন্দর্যবোধে এক নতুন আলোক সঞ্চার করে।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সিদ্ধার্থ গৌতম যখন সংসারত্যাগ করে বোধিবৃক্ষতলে জ্ঞানপ্রাপ্ত হন, তখন তাঁর বাণী শুধু আধ্যাত্মিক মুক্তির কথা বলেনি-বলেছিল মানবিক করুণা, মৈত্রী ও অহিংসার চিরন্তন সত্যের কথা। এই মৃদু অথচ মহৎ বাণী শিল্পীর মনে গভীর অনুরণন তুলেছিল। কারণ, শিল্পের মূলেও তো সেই মানবিক বোধই নিহিত-যা জগতের দুঃখকে বুঝে তাকে রূপের মাধ্যমে লাঘব করতে চায়। বুদ্ধের শিক্ষা থেকে শিল্পীরা খুঁজে পেয়েছিল নান্দনিক জ্ঞানের এক নতুন দিক-শান্তির সৌন্দর্য। প্রথম যুগের বৌদ্ধ শিল্প ছিল প্রতীকনির্ভর। বুদ্ধের সরাসরি চিত্রায়ণ করা হতো না; তাঁর পদচিহ্ন, বোধিবৃক্ষ, ধর্মচক্র বা খালি সিংহাসনই ছিল তাঁর উপস্থিতির প্রতীক। এই প্রতীকগুলোই বৌদ্ধ দর্শনের বিমূর্ত সৌন্দর্যকে বহন করত। পরবর্তী যুগে, বিশেষত খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে, গান্ধার ও মথুরা শিল্পধারায় বুদ্ধ মানবাকৃতিতে রূপায়িত হতে শুরু করেন। প্রাচীন গ্রীক ও রোমান এবং ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে গড়ে উঠা গান্ধার শিল্পে গ্রিক-রোমান শৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়: গভীর চোখ, কুঞ্চিত চুল, সূক্ষ্ম পোশাকের ভাঁজ-যেন ভাবুক দার্শনিকের শান্ত মুখে অনন্ত ধ্যান ফুটে আছে।

খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক থেকে ভারতের মথুরা নগরে বিকশিত ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্প অর্থাৎ মথুরা শিল্পে বুদ্ধের মূর্তি দেশীয় রূপে প্রকাশ পায়-দৃঢ় দেহ, মৃদু হাসি, অদ্বিতীয় স্থিতি। এই দুই ধারাই পরবর্তীতে অজন্তা, সাঁচি, ভরহুত ও অমরাবতীর ভাস্কর্যে মিলিত হয়ে এক বিস্ময়কর রূপ ধারণ করে। সাঁচির বৃহৎ স্তূপের দরজায় খোদাই করা বৌদ্ধ জাতক কাহিনীগুলো শুধু ধর্মীয় কাহিনী নয়, বরং জনজীবনের বাস্তবতা ও করুণার চিত্র।

বৌদ্ধ ধর্মের চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ নিঃসন্দেহে অজন্তা গুহাচিত্রে। পাথরের দেয়ালে রঙ ও রেখার মায়াজালে ফুটে উঠেছে বুদ্ধের জীবন, জাতক কাহিনি, প্রেম, ত্যাগ ও মানবিকতা। সেখানে রাজা, রাণী, গৃহী, তপস্বী, জনতা-সবাই বুদ্ধের বার্তার সাক্ষী। এই চিত্রগুলো নিছক ধর্মীয় বর্ণনা নয়; এগুলো মানবমনের চিরন্তন আবেগের নান্দনিক ভাষ্য। বুদ্ধের মুখে যে প্রশান্তি, তাঁর চোখে যে মায়া, তা যুগযুগান্তর ধরে শিল্পীর হৃদয়ে আলো জ্বেলে চলেছে। অজন্তার পাশাপাশি, সিগিরিয়া (শ্রীলঙ্কা) ও বামিয়ান (আফগানিস্তান, অধুনা ধ্বংসপ্রাপ্ত )-এর বুদ্ধচিত্র ও দণ্ডায়মান বুদ্ধের প্রস্তরমূর্তি প্রমাণ করে, বৌদ্ধ শিল্পের আলো ভারত থেকে সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তিব্বতের থাংকা চিত্র, চীনের মণ্ডলচিত্র, জাপানের জেন শিল্প-সবই এই আধ্যাত্মিক ধারারই রূপান্তর।

বৌদ্ধ ধর্মের স্থাপত্য কেবল নির্মাণ নয়-তা ছিল এক ধ্যানচিন্তার স্থির প্রতীক। স্তূপ বুদ্ধের পরম ধ্যানের প্রতীক; চৈত্যগৃহ ছিল সম্মিলিত প্রার্থনার স্থান; আর বিহার ছিল শিক্ষালয়ের সঙ্গে তপস্যাকেন্দ্রের মিলিত রূপ।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালের সন্নিকটে খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে মৌর্য সম্রাট অশোক কর্তৃক নির্মিত সাঁচি স্তূপ এবং ভারতের উত্তর প্রদেশের সারণাথের ধামেক স্তূপ, বৌদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দির, নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়-এসব শুধু স্থাপত্য নয়, এগুলো প্রজ্ঞা ও শান্তির মন্দির। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ স্থাপত্য আরও বৈভবময় হয়ে ওঠে। ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর, কম্বোডিয়ার আংকর থম, থাইল্যান্ডের ওয়াট ফো মন্দির-এসব নিদর্শন আজও প্রমাণ করে বৌদ্ধ ধর্ম কীভাবে বিশ্বমানবতার স্থাপত্যচেতনায় অমর হয়ে আছে।

এবার আসি ভারতের প্রাচীন শ্রাবস্তী নগরীর কথায়। শ্রাবস্তী নগরীর শিল্প-সৌন্দর্য ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আজও বিস্মিত হতে হয় অনুসন্ধিৎসু সৌন্দর্য পিপাসু মানুষকে। এক সুপরিকল্পিত নগরী ছিলো এই প্রাচীন শ্রাবস্তী নগরী। যা বৌদ্ধধর্মের বিকাশের কালেই গড়ে উঠেছিলো। প্রশস্ত রাস্তা, অলঙ্কৃত প্রবেশদ্বার, প্রাসাদ, উদ্যান ও বিহারগুলির সমন্বয়ে এক রাজসিক নগরী গড়ে উঠেছিল। রাজপ্রাসাদ, বণিকপল্লী ও ধর্মকেন্দ্রগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল যে, ধর্ম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি একত্রে বিকশিত হতে পেরেছিল।

প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ আছে, নগরটির চারদিকে পরিখা ও প্রাচীর নির্মিত ছিল, যার অলঙ্করণে ব্যবহৃত হত পাথর ও ধাতব অলংকার। রাতের বেলায় দীপালোকিত নগরটি এক স্বপ্নীল আবেশে ভাসত। শ্রাবস্তীর শিল্পসৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো জেতবন বিহার-যা ছিল স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার এক অনুপম সমন্বয়। বিহারের প্রবেশদ্বার ও স্তম্ভে ছিল ফুল, বেললতা, পদ্ম ও শঙ্খ-চক্রের সূক্ষ্ম খোদাই-যা বৌদ্ধ দর্শনের ধারক। বুদ্ধের আসন, ধ্যানকক্ষ ও স্তূপগুলো ছিল নান্দনিক শ্বেতপাথর ও ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত, যেখানে সাদামাটা সরলতা ও মহিমার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। জেতবনের বৃক্ষবীথি ও পদ্মপুকুরগুলো নগরীকে এক শান্ত নন্দনকাননে পরিণত করেছিল। জেতবনের শিল্পরূপে বৌদ্ধ ধর্মের মৌল নীতি-“মধ্যমার্গ ও নির্লিপ্ত সৌন্দর্য”-জীবন্ত হয়ে ওঠে।

শ্রাবস্তীতে আবিষ্কৃত বহু প্রত্নভাস্কর্য ও মূর্তি প্রমাণ করে যে, এখানে প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্প উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি, ভূমিস্পর্শ মুদ্রা বা অভয়মুদ্রা-সবকিছুতেই দেখা যায় গভীর ধ্যান, সমাহিত শান্তি ও দার্শনিক গভীরতা। নারীমূর্তিগুলির শরীরভঙ্গি, অলঙ্কারের সূক্ষ্মতা, ও মুখাবয়বে প্রশান্তির ছায়া-এসব শ্রাবস্তীর ভাস্করদের নন্দনবোধের সাক্ষ্য বহন করে।

মন্দিরের দেয়ালে ছিল রঙিন ফ্রেস্কো চিত্র বা ম্যুরাল পেইন্টিং যেখানে বুদ্ধের জীবনের ঘটনা, জাতক কাহিনী, বৃক্ষ, প্রাণী ও ফুলের নকশা ফুটে উঠেছিল প্রাকৃতিক রঙে। শ্রাবস্তীর শিল্পসৌন্দর্যের মূল প্রেরণা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আধ্যাত্মিক সংযোগ। শান্ত বৃক্ষছায়া, পদ্মফুলে ভরা পুকুর, পাখির কলতান ও ধ্যানরত ভিক্ষুদের উপস্থিতি-সবকিছুই যেন বুদ্ধের অহিংসা, শান্তি ও প্রেমের দর্শনকে দৃশ্যরূপ দিয়েছিল। শ্রাবস্তীর শিল্পচেতনা শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, তা এক দার্শনিক সৌন্দর্যবোধের প্রতিফলন। এই নগরী প্রমাণ করে যে-সৌন্দর্য কেবল অলংকারে নয়, বরং অন্তর্নিহিত শান্তিতে নিহিত। বুদ্ধের ধর্ম, ধ্যান ও করুণার আদর্শ এই শিল্পকে দিয়েছে এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য। শ্রাবস্তী তাই কেবল ইতিহাসের এক নগরী নয়, এটি এক “ধ্যানমগ্ন নগর”-যেখানে ধর্ম, শিল্প, প্রকৃতি ও নন্দন একাকার হয়েছে। এর স্থাপত্যে দৃশ্যমান মহিমা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি এর নীরবতায় লুকিয়ে আছে বুদ্ধের বাণীর মতোই এক চিরন্তন সৌন্দর্য ও শান্তি। সুরম্য নগরী নির্মাণে ও স্থাপত্যকলার পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য ও সাহিত্যেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ছিলো প্রবল। বৌদ্ধ দর্শনের মূলে আছে ধ্যান ও ধ্বনি-এই দুইয়ের সংলগ্নতায় গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ সংগীত ও নৃত্যের ধারা। বৌদ্ধ স্তোত্র বা সূত্রপাঠের মৃদু সুর, ধ্যানসংগীতের নিঃশব্দ লয়, কিংবা নৃত্যের মুদ্রায় বোধিসত্ত্বের করুণাভাব-সবই এক অনন্ত প্রশান্তির প্রতীক।

বৌদ্ধ শিল্পকলার আরও একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন অমরাবতীশিল্প। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের প্রাচীন ধন্যকটক অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে বিকশিত হয়েছিল অমরাবতীশিল্প। সাতবাহন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতার কারনে এই সময়টিকে সাতবাহন যুগ বলা হয়। ‘অন্ধ্র বিদ্যালয়’ বা ‘ভেঙ্গি বিদ্যালয়’ নামে খ্যাত এই শিল্পধারায় বৌদ্ধের জীবন, জাতক সহ নানা ঘটনাবলির বিচিত্র বর্ণনা ফুটে উঠেছে।

প্রাচীন সাহিত্যেও বৌদ্ধ ধর্মের রয়েছে সুস্পট অবদান। ভারতের সাহিত্যে আমরা পাই জাতক কাহিনী, বুদ্ধচরিত, ললিতবিস্তর সূত্র ইত্যাদি। এসব রচনায় কেবল ধর্ম নয়, নৈতিকতা ও মানবতার গল্প ফুটে উঠেছে। পরবর্তীকালে এই কাহিনীগুলোই বাংলা, পালি, তিব্বতী ও চীনা সাহিত্যের গভীরে প্রোথিত হয়। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ দোহা ও গান। নেপালের রাজদরবারে এটি পাওয়া যায় ১৯০৭ সালে। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহোদয় এটির সন্ধান লাভ করেন।

বিশ্বসংস্কৃতিতেও বৌদ্ধ শিল্পের প্রভাব রয়েছে। ভারত থেকে চীন, জাপান, নেপাল, কোরিয়া, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড-সব দেশেই বৌদ্ধ শিল্প স্থান পেয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে। চীনে এটি পরিণত হয়েছে বোধিসত্ত্ব গুয়ানইনের কোমল মুখে, জাপানে জেন পেইন্টিং ও বাগান শিল্পে, তিব্বতে থাংকা ও মণ্ডলচিত্রে, নেপালে পাট্টচিত্রে, আর বাংলাদেশে মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর ও ময়নামতির বৌদ্ধবিহারের নিদর্শনে।

বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে কালের আবর্তে ভারতীয় ভূখন্ডে যে ধর্ম দর্শন গুলোর উদ্ভব হয়েছে সেগুলোর প্রভাব এবং অবদানে প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের জনসমাজে নানা দিকে বিকশিত হয়েছে। এক সময় প্রাচীন ভারতীয় ধর্মদর্শনের অবদান বিস্তৃতি লাভ করেছে গোটা এশিয়া মহাদেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্যকলা, ভাস্কর্য, নগর, নির্মাণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, তৈজসপত্র, আসবাবপত্র সহ মানবসমাজের সকল ক্ষেত্রে এ প্রভাব গুলো স্বমহিমায় স্পষ্ট হয়ে আছে। ক্রমশঃ এদের আদান-প্রদান বা মিশ্রণও ঘটেছে ধীরে ধীরে। নবতর শিল্পের ধারা বা আঙ্গিক তৈরী হয়েছে গান্ধার শিল্প, মথুরা শিল্প ও অমরাবতী শিল্প এবং গ্রীক ও রোমান শৈলীর মিশ্রণ, বৌদ্ধস্তুপ ও গুহামন্দির সব কিছুতেই বৌদ্ধদর্শন ও শিল্পকলার এক ব্যতিক্রমী নান্দনিক রূপ আজও দীপ্যমান। বৌদ্ধ শিল্পকলায় আধ্যাত্মিক ভাবনা, মানবতা, সেবা ও মৈত্রীর শাশ্বত বাণী প্রতীকীভাবে স্থান পেয়েছে। এসব কারনে বৌদ্ধ ধর্ম মানবের এক অপূর্ব নন্দন ভুবন সৃষ্টি করে হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতির ঐক্যের সেতুবন্ধন। বৌদ্ধ ধর্ম শিল্পকলাকে শিখিয়েছে যে, সৌন্দর্যের উদ্দেশ্য কেবল আনন্দ নয়, জাগরণও বটে। বুদ্ধের বাণী - “সব প্রাণীর প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করো”- এই বাক্যই বৌদ্ধ শিল্পকলার প্রাণস্পন্দন। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম শিল্পকলায় মানবতার শান্তিময় সৌন্দর্য ও চিরন্তন করুণার সুর বয়ে এনেছে। বৌদ্ধ শিল্পকলার এ নন্দনভুবনে আমার অধিকার ও অহংকার অনস্বীকার্য। তাই কবিগুরুর গানের ভাষায় বলতে হয়,

“বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।”


নিরঞ্জন দে : লেখক, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও সংগঠক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত