এম, এ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ :

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২১:৩৩

অপেক্ষা ছিল ছেলে ফেরার, এখন অপেক্ষা লাশের!

গ্রীসে নবীগঞ্জের দুই যুবক খুন

‘মাগো অনেক দেরি হয়ে গেছে, তোমাকে দেখি নাই। আমি আসছি।’ গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) মা গোলেছা বিবির সঙ্গে মুঠোফোনে ছেলে আব্দুল মমিনের (৪০) কথোপকথন। মায়ের সঙ্গে ছেলের সেটিই ছিল শেষ কথা। ছেলে বহু বছর পর বাড়িতে আসবে। এ আনন্দ গোলেছার পরিবারে। কিন্তু গোলেছার পরিবারের এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একদিন পরই মঙ্গলবার খবর আসে গ্রীসে দৃর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হয়েছেন মমিন। নিমিষেই গোলেছার পরিবারের আনন্দ পরিণত হয় বিষাদে।

একই ঘটনায় গুলিতে শাহীন মিয়া (২৫) নামে আরও একজন খুন হয়েছেন। গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সের আসপোগিরগো এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে গুলিবিদ্ধ মরদেহগুলো উদ্ধার করে গ্রীস পুলিশ। আব্দুল মমিন ও শাহীন মিয়ার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড় ভাকৈর ইউনিয়নের কামড়াখাই এলাকায়।

নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভাগ্য ফেরাতে ১৪ বছর আগে প্রবাসে যান নবীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড় ভাকৈর ইউনিয়নের কামড়াখাই গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে আব্দুল মমিন। ৭ বছর আগে প্রবাসে যান একই গ্রামের নূর হোসেনের ছেলে শাহীন মিয়া (২৫)। ইরান থেকে তুরষ্ক হয়ে গ্রীসে ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন আব্দুল মমিন আর ২ বছর ধরে গ্রীসে বসবাস করছেন শাহীন মিয়া। গ্রীসের আসপোগিরগো এলাকায় একটি কন্টেইনার কোম্পানিতে পাহারাদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আব্দুল মমিন। দুবছর আগে শাহীন মিয়াও সেখানে গিয়ে পাহারাদারে চাকরি নেন। একটা ভালো জীবন, একটা সচ্ছল জীবনের আশায় সেখানে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন তারা। প্রবাসে যাবার পর আর দেশে আশা হয়নি তাদের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিণতি। ভাগ্য ফেরানোর বদলে তারা লাশ হয়ে দেশে ফিরছেন। গত মঙ্গলবার ভোররাতে গীসে দৃর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হয়েছেন তারা।

গ্রীসে বসবাসরত প্রবাসীদের বরাত দিয়ে নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, দুইটি কন্টেইনারে ডাকাতির প্রস্তুতি নেয় দৃর্বৃত্তরা। এ সময় মমিন ও শাহীন বাধা দিলে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এনিয়ে গ্রীসের স্থানীয় পুলিশ তদন্তে নেমেছে এবং মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে।

সরেজমিনে কামড়াখাই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তাদের মৃত্যু সংবাদে এলাকায় নেমেছে শোকের ছায়া। এলাকার লোকজন ও স্বজনরা নিহতদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের লোকজনকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ছেলের শোকে নিহতদের মা-বাবা অচেতনপ্রায়। অশ্রুশিক্ত নয়নে তারা অপেক্ষায় আছেন কখন ছেলের লাশ বাড়ি ফিরবে।

সরেজমিনে মমিনের মা গোলেছা বিবির সঙ্গে কথা হয়। তিনি কাঁদছিলেন আর ছেলের জন্য বিলাপ করছিলেন। গোলেছা বিবি বলেন, ‘ছেলে আমাকে দেখার জন্য আসবে বলেছিল। কিন্তু ছেলে আমার লাশ হয়ে আসবে এটা আমি ভাবি নাই। আমার ছেলেকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে আমি এর বিচার চাই। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি। আমার ছেলেটারে শেষ দেখা দেখতাম চাই।’

নিহত আব্দুল মমিনের চাচাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রফিক বলেন, ‘দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মমিন প্রবাসে বসবাস করে আসছে। সে প্রথমে ১ বছর ইরান, তুরষ্ক ২ বছর ও গত ১০ বছর ধরে গ্রীসে বসবাস করে আসছে। হঠাৎ করে এমন ঘটনায় আমরা শোকে কাতর। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই। একই সাথে নিহতদের লাশ দেশে আনতে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করছি।’

নিহত আব্দুল মমিনের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। বাবা হত্যার বিচার দাবি করে তারা লাশ দেশে আনার ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। নিহতদের পারিবারিক সূত্রে আরও জানা গেছে, তারা বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য টাকা জমা করেছিলেন। খুন করে তাদের টাকা পয়সা লুট করা হয়।

অপরদিকে আলাপকালে নিহত শাহীন মিয়া পিতা নূর হোসেন বলেন, ‘শাহিন পরিবারের কথা চিন্তা করে বিগত ৭ বছর পূর্বে প্রবাসে যায়। সে অবিবাহিত। সেখানে ইরান ৪ বছর, তুরষ্ক ১ বছর ও ২ বছর ধরে গ্রীসে বসবাস করে আসছে। এই দুর্ঘটনার আগে আমাদের সাথে তার শেষ কথা হয়েছে। শাহীনের এমন ঘটনায় আমরা বাকরুদ্ধ। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। আমার ছেলেকে শেষ দেখা দেখতে চাই। ছেলের লাশ দেশে ফেরাতে সরকারের সহযোগিতাও কামনা করছি।’

এই ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মহি উদ্দিন বলেন, ‘খবরটি শোনে আমি শোকাহত। লাশ দেশে ফেরাতে সরকারিভাবে যা কিছু প্রয়োজন তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত