সিলেটটুডে ডেস্ক

২৪ অক্টোবর, ২০১৫ ১৫:৫৯

বিনা দোষে ২২ বছর কারাবাস: ‘কান্দিও না, আমি বাইছা আছি’

সম্পর্কে তাঁরা আপন মামা-ভাগ্নে। দুজনের বয়সের ব্যবধান মাত্র সাত দিন। ভাগ্নে মামার চেয়ে সাত দিনের বড়। একই গ্রামে বেড়ে ওঠা। একটানা এক যুগ কেটেছে একসঙ্গে। পাঠশালা কিংবা খেলার মাঠে একসঙ্গে ছিলেন দুজন। ছিলেন দুজন হরিহর আত্মা। তারপর একসময় ভাগ্নে হারিয়ে যান। কয়েক বছর পর ফিরেও পাওয়া যায় তাঁকে। এর কিছুদিন পর আবারও নিখোঁজ হন তিনি। তারপর কেটে গেছে এক এক করে ২৮টি বছর। ভাগ্নের সঙ্গে দেখা নেই মামার। সবার ধারণা, হয়তো আর বেঁচে নেই ভাগ্নে। কিন্তু না, তিনি বেঁচে আছেন।

দীর্ঘদিন পর ভাগ্নের বেঁচে থাকার কথা শুনে তাঁকে দেখতে জামালপুর থেকে সিলেটে ছুটে আসেন মামা। এই ২৮ বছর না দেখা মামাকে দেখেই চিনে ফেলেন ভাগ্নে। আর এই সেই 'বাল্যবন্ধু' ভাগ্নেকে কাছে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মামা। জড়িয়ে ধরেই মামার সে কী কান্না। ভাগ্নে তাঁর চোখের পানি মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, 'কান্দিও না, আমি বাইছা আছি।' বিনা দোষে ২২ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পাওয়া ফজলু মিয়াকে দেখতে এসে এভাবেই চোখের পানি ফেলেন মামা মফিজ উদ্দিন।

জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার শাউনিয়া বাঁশছড়া থেকে এসেছেন মফিজ উদ্দিন। তাঁর সঙ্গে এসেছেন চাচা মীর ফিরোজ আহমেদ। এই শাউনিয়া বাঁশছড়া গ্রামই ফজলুর জন্মস্থান। ১০-১২ বছর বয়সে ফজলু বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ধরাধরপুর গ্রামের সৈয়দ গোলাম মাওলার সঙ্গে। তিনি ফজলুকে তাঁর বাড়ি নিয়ে আসেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় মফিজ উদ্দিন ও মীর ফিরোজ সিলেট এসে পৌঁছান। এরপর সেখান থেকে তাঁরা প্রথমে যান ফজলু মিয়ার গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিবাজারে তেতলী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। সেখানেই গত এক সপ্তাহ ধরে বসবাস করছেন ফজলু মিয়া।

পরিষদ ভবনের দোতলায় গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য বাবুল মিয়ার কক্ষে একটি আলাদা খাটে শুয়ে ছিলেন ফজলু মিয়া। মামা মফিজ উদ্দিন কক্ষে পা রাখতেই ফজলু মিয়া মাথা তুলে তাকান। তারপর মামা-ভাগ্নে আর চাচা-ভাতিজার মধ্যে চোখাচোখিতে চলে যায় কয়েক মুহূর্ত। তারপর অসুস্থ ফজলু মিয়া আবার বালিশে মাথা রাখেন। ফিরোজ আহমেদ ও মফিজ উদ্দিন ঘরে ঢোকেন।

গ্রামপুলিশ বাবুল মিয়া ফজলু মিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন, 'ফজলু ভাই, তারা কে?' ফজলু মিয়ার ভাবলেশহীন সাবলীল জবাব, 'একটা ভাগিনা, আরেকটা ভাতিজা'। চাচা এবং মামার চেয়ে বয়সে ফজলু মিয়া বড় হওয়ায় তিনি দুজনকে ভাতিজা ও ভাগিনা বলে পরিচয় দেন। এরপর মামা ও চাচা ফজলু মিয়াকে জড়িয়ে ধরেন। মামার চোখ ছলছল করছে। ফজলু মিয়া মামার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

এরপর তিনজনের মধ্যে কিছু আলাপচারিতা হয়। ফজলু তাঁর মায়ের খবর জানতে চান। মামা ও চাচা জানান, তিনি ভালো আছেন। ফজলুকে দেখতে আসবেন। ফজলু মিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে লোক আসার কথা শুনে সেখানে হাজির হন ফজলু মিয়ার জামিনদার সমাজকর্মী কামাল উদ্দিন রাসেলসহ এলাকার কিছু ব্যক্তি।

ফজলু মিয়ার সঙ্গে তাঁদের কত দিন পর দেখা, কিভাবে তাঁরা ফজলু মিয়ার খবর জানলেন, উনিই যে তাঁদের ফজলু মিয়া তা তাঁরা নিশ্চিত হলেন কিভাবে-এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ আহমদ ও মফিজ উদ্দিন যা বললেন তার সারমর্ম হলো-প্রায় ২৮ বছর আগে ফজলু মিয়ার সঙ্গে তাঁদের দুজনের শেষ দেখা হয় যখন ফজলু মিয়ার পালক বাবা সিলেটের সৈয়দ গোলাম মওলা তাঁদের (ফজলু মিয়ার গ্রামের) বাড়ি গিয়েছিলেন। এরপর ফজলু মিয়া সিলেট চলে আসেন।

মফিজ উদ্দিন জানান, ফজলু চলে আসার পর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। ২০-২১ বছর তাঁর বড় ভাই (ফজলুর বড় মামা) ফজলুর খবর নিতে সিলেট আসেন। তিনি দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর গ্রামের গোলাম মওলার বাড়ি যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন গোলাম মওলা ও তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ফজলু উন্মাদ হয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছেন। ফজলুর স্ত্রীরও সেখানে নেই। গোলাম মওলার বাড়ির কেউ ফজলু মিয়ার কোনো খবর জানেন না। এর পর থেকে তাঁদের ধারণা ছিল, ফজলু মিয়া হয়তো আর বেঁচে নেই। মফিজ উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে টেলিভিশনে ফজলু মিয়াকে দেখে তাঁর ভাতিজা রাজু মিয়া ফোন করে জানান, ফজলু বেঁচে আছেন। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় ফজলু মিয়ার সচিত্র প্রতিবেদন দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন, এই ফজলুই তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ফজলু। এরপর তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জামালপুর জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান বিষয়টি জানতে পেরে ফজলুর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। সিলেটে অবস্থানরত ফজলুর সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনে কথাও হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে তাঁরা গতকাল সকালে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেন।

মফিজ উদ্দিন জানান, ফজলু মিয়ার বাবা বিষু মিয়া মারা গেছেন অনেক আগে। বেঁচে আছেন মা মজিরন বেওয়া। একমাত্র বোন হামেদা বেগম, নানা মৌলভি হাসমত উল্লাহ।

মফিজ আরো জানান, তাঁদের পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ফজলুর মা মজিরন বেওয়া হচ্ছেন সবার বড়। তিনি ছোটবেলা থেকে বাকপ্রতিবন্ধী। ছেলে নিখোঁজের পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তিও এখন হারিয়ে ফেলেছেন। তবে তাঁর ছেলেকে পাওয়া গেছে-বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মজিরন বর্তমানে ভাইদের আশ্রয়েই আছেন।

মায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ফজলু মিয়া বলেন, 'আছেন, আম্মা আসবেন।'

প্রসঙ্গত, ফজলুর পালক বাবা গোলাম মওলা ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মকর্তা। এলাকার প্রভাব ও জমিজমা সম্পত্তি ছিল তাঁর।

জানা যায়, কিছু সম্পদ তিনি পালকপুত্র ফজলু মিয়ার নামেও লিখে দেন। গোলাম মওলা মারা যাওয়ার পর ফজলু মিয়ার জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। একসময় তিনি গলায় ডালা বেঁধে পান-সিগারেট বিক্রি শুরু করেন। সিলেট শহরের বন্দরবাজার আদালতপাড়ায় তিনি ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করতেন। ১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই তিনি আদালতপাড়ায় পান-সিগারেট বিক্রি করছিলেন। জাকির হোসেন নামের এক ট্রাফিক সার্জেন্ট সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। ৫৪ ধারায় কোতোয়ালি থানায় ফজলু মিয়ার বিরুদ্ধে ডায়েরি করেন সার্জেন্ট জাকির। এরপর পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে ফজলু মিয়ার বিরুদ্ধে পাগল আইনের ১৩ ধারায় অভিযোগ আনে। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। প্রায় ২২ বছর পর গত ১৫ অক্টোবর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

সূত্র : কালেরকণ্ঠ

আপনার মন্তব্য

আলোচিত