জুড়ী প্রতিনিধি

১৪ অক্টোবর, ২০২০ ২০:২৪

নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ দেখিয়ে ইজারা!

ইজারা বাতিলের দাবিতে এলাকাবাসীর আন্দোলন

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গোগালীছড়া নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ উল্লেখ করে নদীটিকে মৎস্যজীবী সমিতির কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এ ইজারা বাতিলের দাবিতে প্রায় ৬ বছর থেকে আন্দোলন করে আসছেন এলাকাবাসী। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার জুড়ী উপজেলার শাহগঞ্জ বাজারে এক দীর্ঘ মানববন্ধন করে এলাকাবাসী।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মতছিন আলীর সভাপতিত্বে এ মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান, পাখি মিয়া, আব্দুল বারী, আব্দুল গাফফার, আইয়ুবুর রহমান, হাজী সলিমুল্লাহ, ইয়াছিন মিয়া, মিছবাহ উদ্দিন সুমেল, মহেষ বিশ্বাস, ইস্রাব আলী, আনজির মিয়া, হাজির মিয়া প্রমুখ।

জলমহাল সম্পর্কে সরকারের আইনে উল্লেখ আছে, ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে নদী ও জলাভূমিকে স্পষ্টভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ আইনে বলা আছে, চলমান নদীকে কোনো অবস্থায়ই বদ্ধ জলমহাল বলা যাবে না। এছাড়া ও (১৯৯৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়, শাখা-৭) বলা হয়েছে, ‘দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণার্থে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহে সরকার নদী, খাল ও উন্মুক্ত শ্রেণির ছড়া; যা জলমহালের আওতায় রয়েছে সেগুলোর ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’এত কিছুর পরও এ ইজারা বাতিল না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, হারারগজ পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবহমান নদী গোগালীছড়া। মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছুঁয়ে এ নদী হাকালুকি হাওরে গিয়ে পতিত হয়েছে। অথচ এ নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ হিসেবে কাগজে কলমে দেখানো হয়েছে। এভাবে একটা দীর্ঘ প্রবহমান গোগালীছড়া নামক
নদীকে কাগজে-কলমে পাল্টে ফেলে সেটিকে আনা হয়েছে ইজারার আওতায়। আর এ পুরো কাজটি করা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের গেজেট বিজ্ঞপ্তিকে আড়াল করে। এ নদীকে মূলত ইজারার আওতায় আনতেই কৌশলে অসাধু এক শ্রেণি ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওই পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। সিন্ডিকেট করে এই নদীকে জলমহাল দেখিয়ে একটি মৎস্যজীবী সমিতিকে ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। বন্দোবস্তের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে আবারও ৬ বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এ অবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে হাকালুকি হাওর পাড়ের প্রায় ১৫-২০ হাজার একর জমিতে বোরো ধান আবাদে সেচ সুবিধা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষ। গত ৬ বছর থেকে এই এলাকার হাজার হাজার কৃষক এ সমস্যা নিয়ে ভুগছেন। জনস্বার্থে নদীটির ইজারা বাতিলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তৎকালীন সময়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদনও করা হয়েছিল।

এলাকাবাসীর অভিযোগ , ২০০৭ সালে কুলাউড়ার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল ইসলাম গোগালীছড়া নদীকে ‘জলমহাল’ ঘোষণা করে একটি মৎস্যজীবী সমিতিকে ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এতে ওই বছরের ৯ অক্টোবর ইসলাম উদ্দিন নামের ভূকশিমইল ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামের একজন ব্যক্তি ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন ও পাশাপাশি গোগালীছড়াকে উন্মুক্ত নদী উল্লেখ করে ইজারা বন্দোবস্ত বাতিল করতে কুলাউড়ার সহকারী জজ আদালতে একটি স্বত্ব মামলা করেন।

প্রজ্ঞাপনে একই বছর আদালত মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্দোবস্ত স্থগিত রাখতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু ওই বছরের ৮ নভেম্বর মৌলভীবাজারের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর ওই নদীকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ উল্লেখ করে তা ইজারা বিজ্ঞপ্তির আওতায় আনতে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠান। পরে ২০০৮ সালের ১৬ আগস্ট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রস্তাবটি অনুমোদনের কথা জানিয়ে নদীটিকে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে ৬ নম্বর নথিভুক্ত (জলমহালের নির্ধারিত নথি) করতে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়। নথিতে এর আয়তন দেখানো হয় ২৬ দশমিক ৬০ একর।

সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল আদালত ইসলাম উদ্দিনের ওই মামলা খারিজ করে দেন। এরপর সে বছরের ২৬ জুন তৎকালীন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান জুড়ীর তৎকালীন ইউএনও মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে জানান, ‘গোগালীছড়া বদ্ধ জলমহাল’ ইজারা পেতে দুটি মৎস্যজীবী সমিতি আবেদন করেছে। আবেদন যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয় চিঠিতে।

এরপর ঐ বছরের ১০ জুলাই ইউএনও মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জলমহালটিকে ১৪২১ সাল থেকে ১৪২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ৪০ হাজার টাকা মূল্যে ‘দীঘলবাঁক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সমিতিকে ইজারা বন্দোবস্ত দেওয়ার সুপারিশসহ জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে কমিটির সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়।

ইজারা বাতিলে গত ১১ আগস্ট মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবর এক আবেদন করেছেন এলাকাবাসী। এতে জুড়ীর নদী তীরের লোকজনের স্বাক্ষর রয়েছে।
এ অভিযোগের প্রেরণের পর, এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে ইজারাদার জাল লুটপাট করা ইত্যাদি অভিযোগ উত্থাপন করে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

এলাকাবাসী বলেন, মূলত ইজারাদাররা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার হীন মানসিকতায় প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ করে যাচ্ছেন।
আমরা নিরীহ গ্রামবাসী সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী প্রবহমান নদী ইজারা দেয়া যাবে না। সেই সাথে জাল যার, জলা তার কথাটি সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃত। । সেই সাথে সরেজমিন উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে রেকর্ড সংশোধন ও ইজারা বাতিলের জোর দাবি ও জানান এলাকার মানুষ।

এদিকে সরেজমিন গোগালীছড়া নদীর নালিশা এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, নদীর ৫টি স্থানে বড় বড় জাল পেতে জেলেরা মাছ ধরছে। আলাপচারিতায় জেলে আরফাত মিয়া ও ফারুক মিয়া বলেন, গোগালীছড়া নদীর এই স্থানে ৫টি জায়গায় জেলেরা মাছ ধরছে। কুলাউড়া উপজেলার বেগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের নিকট থেকে সাব লিজ এনে প্রায় দুই মাস থেকে আমরা মাছ ধরছি। এর আগে অন্যরা মাছ ধরেছে। তবে আমাদের মাছ ধরতে কেহ বাঁধা দেয়নি।

এ ব্যাপারে জুড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান রুহুল ইসলাম বলেন, ৪/৫ বছর আগে এলাকাবাসী এই লীজ বাতিলের জন্য আবেদন করছেন বলে আমি শুনেছি। কিন্তু তাদের আবেদন কখনো অনুমোদন পায়নি। তারা বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের কাছে লীজ বাতিলের আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু তারা এটা না করে ইজারাদারকে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন বলে শুনেছি। একজন ইজারাদারকে এভাবে হুমকি দেওয়াও ঠিক না।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত