২৪ অক্টোবর, ২০১৫ ১৯:৪৯
২৮ বছর পর মায়ের দেখা পেলেন ফজলু মিয়া। ২২ বছর যাকে বিনাদোষে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছিলো। শনিবার সন্ধ্যায় দেখা হয় মা-ছেলের। এসময় এক আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মা-ছেলে উভয়ের চোখ ভিজে যায় জলে।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ২২ বছর কারাগারে রাখা হয়েছিলো ফজলু মিয়াকে। গত ১৫ অক্টোবর তিনি জামিনে মুক্তি পান। কারগারে যাওয়ারও ৬ বছর আগে ফজলু মিয়ার বয়স যখন ১০/১২, তখন জামালপুরের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন তিনি। এরপর মায়ের সঙ্গে দেখা নেই।
২৮ বছর পর গণমাধ্যমে ফজলু মিয়ার সন্ধান পেয়ে আজ (শনিবার) জামালপুর থেকে সিলেট আসেন ফজলু মিয়ার মরিয়ম বেওয়া ও ফজুলর বোন। সাথে জামালপুরের এনডিসি জোর্তিময় পাল। জামালপুরের জেলা প্রশাসকই উদ্যোগী হয়ে সিলেট পাঠিয়েছেন তাদের।
শনিবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেলিবাজারে তেতলী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে দেখা হয় মা-ছেলের। কারামুক্তির পর থেকে সেখানেই বসবাস করছেন ফজলু মিয়া। দেখা হওয়ার পর মা-ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠেন। ফজলু মিয়ার মা বাকপ্রতিবন্ধি। চোখেও দেখেন না। ফজলুও অসুস্থ। তেমন কথা বলতে পারেন না। মানসিকভাবেও অপ্রকৃতস্থ। তবু দীর্ঘদিন পর মায়ের দেখা পেয়ে উচ্ছ্বাস তার চোখেমুখে। মায়ের দেখা পেয়ে 'খুশি' 'খুশি' কেবল এই একটি শব্দই দু'বার উচ্চারণ করলেন ফজলু।
জামালপুরের এনডিসি জোর্তিময় বড়ুয়া বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ফজলু মিয়াকে আমরা তার বাড়ি জামালপুরে নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে আইনী ও চিকিৎসা সহায়তাও প্রদান করা হবে।
এরআগে শুক্রবারই ফজলু মিয়াকে দেখতে এসেছিলেন তাঁর মামা মফিজ উদ্দিন।
জানা যায়, জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার শাউনিয়া বাঁশছড়া এলাকায় ফজুল মিয়ার বাড়ি। ১০-১২ বছর বয়সে ফজলু বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ধরাধরপুর গ্রামের সৈয়দ গোলাম মাওলার সঙ্গে। তিনি ফজলুকে তাঁর বাড়ি নিয়ে আসেন।
ফজলু মিয়ার মামা মফিজ উদ্দিন জানান, প্রায় ২৮ বছর আগে ফজলু মিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন। তারপর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। ২০-২১ বছর তাঁর বড় ভাই (ফজলুর বড় মামা) ফজলুর খবর নিতে সিলেট আসেন। তিনি দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর গ্রামের গোলাম মওলার বাড়ি যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন গোলাম মওলা ও তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ফজলু উন্মাদ হয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছেন। ফজলুর স্ত্রীরও সেখানে নেই। গোলাম মওলার বাড়ির কেউ ফজলু মিয়ার কোনো খবর জানেন না। এর পর থেকে তাঁদের ধারণা ছিল, ফজলু মিয়া হয়তো আর বেঁচে নেই।
মফিজ উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে টেলিভিশনে ফজলু মিয়াকে দেখে তাঁর ভাতিজা রাজু মিয়া ফোন করে জানান, ফজলু বেঁচে আছেন। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় ফজলু মিয়ার সচিত্র প্রতিবেদন দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন, এই ফজলুই তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ফজলু। এরপর তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
জামালপুর জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান বিষয়টি জানতে পেরে ফজলুর প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। সিলেটে অবস্থানরত ফজলুর সঙ্গে তাঁর মোবাইল ফোনে কথাও হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের আজ ফজলু মাকে সিলেট পাঠানো হয়।
ফজলু মিয়ার জামিনদার সমাজকর্মী কামাল উদ্দিন রাসেল বলেন, ফজলু মিয়র মা-সহ প্রশাসনের একজন র্ককর্তা এসেছেন। তারা ফজলু মিয়াকে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু রবিবার ফজলু মিয়ার মামলার হাজিরার তারিখ। আমরা তার মামলাটি খারিজের আবেদন করেছি। সেটি খারিজ হলে তাকে নিয়ে যেতে পারবেন।
জানা যায়, ফজলু মিয়া একসময় গলায় ডালা বেঁধে সিলেট নগরে পান-সিগারেট বিক্রি শুরু করেন। সিলেট শহরের বন্দরবাজার আদালতপাড়ায় তিনি ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করতেন। ১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই তিনি আদালতপাড়ায় পান-সিগারেট বিক্রি করছিলেন। জাকির হোসেন নামের এক ট্রাফিক সার্জেন্ট সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। ৫৪ ধারায় কোতোয়ালি থানায় ফজলু মিয়ার বিরুদ্ধে ডায়েরি করেন সার্জেন্ট জাকির। এরপর পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে ফজলু মিয়ার বিরুদ্ধে পাগল আইনের ১৩ ধারায় অভিযোগ আনে। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। প্রায় ২২ বছর পর গত ১৫ অক্টোবর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
আপনার মন্তব্য