১৮ নভেম্বর, ২০২০ ১৪:২৭
কেউ শিক্ষক, কেউ জনপ্রতিনিধি, আছেন ব্যাংকার, ব্যবসায়ী। নিজ নিজ অবস্থানে তারা সকলেই প্রতিষ্ঠিত। কাজের সুবাদে একেকজন একেক জায়গায় থাকেন। সেই কবে জীবন থেকে শৈশব ছুটি নিয়েছে। কাজ ও নাগরিক ব্যস্ততা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে তাদের। তবুও নিজেদের মনের ভেতরে পুষে রেখেছেন সবুজ শৈশব। গ্রামের মেঠো পথ, শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডা। এসব তাদের খুব টানে। সময়-সুযোগ হয়না সবার একসাথে হওয়ার।
তবে তাদের শৈশবের সেই সময়কে কাছে টেনে নিয়ে এল ‘আমরা কাঠালতলী ইউনিয়নবাসী’ ফেসবুক গ্রুপ। নবান্ন উৎসব উপলক্ষে সোমবার (১৬ নভেম্বর) দিনব্যাপী মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের ‘আমরা কাঠালতলী ইউনিয়নবাসী’ ফেসবুক গ্রুপের উদ্যমী তরুণ-যুবকরা গ্রামীণ বিলুপ্তপ্রায় টোফাটুফি’র (চড়ুইভাতি) আয়োজন করে। আর এ অয়োজনকে ঘিরে শৈশবের আনন্দ পেতে নাগরিক ব্যস্ততার পাট চুকিয়ে সকলে ছুটে আসেন।
দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের রুকনপুর এলাকার সবুজ অরণ্য ঘেরা এক টিলায় অনুষ্ঠিত হয় এ চড়ুইভাতি। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় কার্যক্রম। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। দিনভর নানা আনুষ্ঠানিকতায় এখানে আসা সকলে ফিরে যান শৈশবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়। অনেক দিন পর পুরোনা বন্ধুদের কাছে পেয়ে আপ্লুত হন কেউ কেউ। বড়দের সাথে আসে শিশুরাও। ঘুরে ঘুরে তাদের বিভিন্ন জিনিসের সাথে পরিচিত করিয়ে দেওয়া হয়। কিভাবে আগের শৈশব ছিল এগুলো আলাপ করেন বড়রা। রান্নার আয়োজনে সকলে সহযোগিতা করেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। দুপুরে শুরু হয় খাবার পর্ব। এরপর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন সবাই। কেউ গান গেয়েছেন। কেউ কৌতুক করেছেন, কেউ আবৃত্তি। কেউ আবার প্রিয় মানুষদের সাথে ছবি তুলে রাখেন স্মৃতি ধরে রাখতে। সবুজ অরণ্য ঘেরা টিলা ও লেকের পাশে ছবি তুলেন অনেকে। দিনব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতায় উদ্যাপন হয় চড়ুইভাতি।
আয়োজকরা জানান, প্রথমে ‘আমরা কাঠালতলী ইউনিয়নবাসী’ ফেসবুক গ্রুপ গ্রুপের এডমিন শিক্ষক আবু ইউসুফ মো. সাহিদ উদ্যোগ নেন। তিনি গ্রুপে একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতেই সাড়া মেলে। এরপর গ্রুপের ৭৬ জন সদস্যের কাছ থেকে ১৫০ টাকা করে তোলা হয়। এরপর সবাই বসে দিনক্ষণ ঠিক করেন। শৈশবের আনন্দ উপভোগ করা ও বিলুপ্ত প্রায় গ্রমীণ ঐতিহ্যকে জাগিয়ে তুলতে এ উদ্যোগ।
গ্রুপের এডমিন শিক্ষক আবু ইউসুফ মো. সাহিদ বলেন, ‘পহেলা অগ্রহায়নে আমাদের আয়োজন। পহেলা অগ্রহায়নে আমরা শৈশব উৎসব পালন করতাম। সারা দেশে এটা নবান্ন উৎসব নামে পরিচিত। আমাদের সিলেটের আঞ্চলিকভাষায় এটাকে ভোলাভুলি বলা হয়। আর ভালাভুলি উৎসবের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে একটা ছিল টোফাটুফি (চড়ুইবাতি) উৎসব। মূলত এ উৎসব গ্রমীণ এলাকা থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেই জিনিসটা অনুভব করে বড় পরিসরে সকলকে নিয়ে এ আয়োজন করেছি আমরা। এখানে গরিব অনেক পথ শিশুকে খাওয়ানো হয়েছে। এই রেওয়াজটা যেন ভষিৎতে থাকে। এটা গ্রামীণ একটা ঐতিহ্য। বিলুপ্ত উৎসবকে জাগিয়ে তুলতে এই আয়োজন।’
আলাপকালে আয়োজকদের একজন আমজাদ হোসেন পাপলু বলেন, ‘ছোটবেলা ভোলাভুলিতে অনেক আনন্দ ফুর্তি করতাম। গ্রামের প্রতিটা বাড়ির ঘরে নতুন ধান উঠলে পিঠা উৎসব হত। এখন গ্রামের কোথাও পিঠা খাওয়ার উৎসব হয়না। টোফাটুফি (চড়ুইভাতি) খাওয়া হয় না। এটা অনেকে এখন জানেই না। একটা সময় বিভিন্ন বাড়িতে চালের গুড়ি ভাঙার শব্দ শোনা যেত। অন্যরকম আনন্দ লাগত এ শব্দ শোনে। আজ এসব বিলুপ্ত। টোফাটুফির (চড়ুইভাতি) মাধ্যমে মিলনমেলা হয়। এতে ভাতৃত্ববোধের সৃষ্টি হয়। একে অন্যের প্রতি আন্তরিকতা বাড়ে, শ্রদ্ধাবোধ বাড়ে। এখন ভার্চুয়াল লাইফে পাশে একজন বসা থাকলেও আমরা আর কথা বলি না। মোবাইলে আমাদের সব আসক্তি। আর গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুষ্ঠান নিয়মিত হলে পরস্পর-পরস্পরকে জানতে পারব। শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। আন্তরিকতা বাড়বে।’
আমজাদ হোসেন পাপলু’র মতো বক্তব্য শিক্ষক ফারুক আহমদ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাগরণ সমাজ কল্যাণ যুব সংঘের সভাপতি শাহরিয়ার জামান খালেদ, সমাজ সেবক মুজিবুল হক খোকনেরও। তারা আরও বলেন, ‘এ আয়োজন আমাদের সকলকে এক সাথে আনন্দময় পরিবেশে বসার সুযোগ করেছে। প্রতি বছর এরকম আয়োজন করব আমরা।’
ব্যাংক কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘চড়ুইভাতি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। এটা বিলুপ্ত প্রায়। আয়োজকরা নতুন করে আমাদের মাঝে নিয়ে এসেছেন। আয়োজকদের ধন্যবাদ। এখানে এসে মনে হয়েছে আমি শৈশবে ফিরে গেছি।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় দক্ষিণভাগ উত্তর ইউপির চেয়ারম্যান এনাম উদ্দিন, ব্যাংক কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম, গ্রুপের এডমিন শিক্ষক আবু ইউসুফ মো. সাহিদ, তরুণ সমাজসেবক জবরুল ইসলাম, মুজিবুল হক খোকন, জাগরণ সমাজ কল্যাণ যুব সংঘের সভাপতি শাহরিয়ার জামান খালেদ, শিক্ষক দোলোয়ার হোসেন ইমন প্রমুখ।
আপনার মন্তব্য