শাকিলা ববি

১১ মে, ২০২১ ০১:৫৩

গৃহবধূ-শিক্ষার্থীরাও এখন ব্যবসায়ী

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার লস্করপুর এলাকার শেখ সামিয়া রহমান। সাধারণ গৃহবধূ। তবে এখন গৃহবধূ থেকে হয়ে উঠেছেন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। প্রযুক্তির কল্যাণে ২০১৪ সালে গৃহবধূ হওয়া সামিয়া ২০২১ সালে হয়ে গেলেন ব্যবসায়ী।

সামিয়া রহমান ‘চায়ের ফাঁকে কেনাকাটা’ নামক একটি ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে বিক্রি করেন ব্লক, বাটিক, হেন্ডপেইন্টেড ড্রেস, মধু, চা পাতা ও সিজনাল আচার। স্বামী, সন্তানের দেখাশুনা, গৃহস্থালির কাজ করেও এই পেইজের মাধ্যমে তিনি তার প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে প্রতি মাসে আয় করছেন প্রায় ২০ হাজার টাকার উপরে।  

শেখ সামিয়া রহমান বলেন, আমি একজন গৃহিনী ছিলাম। স্বামী সন্তান নিয়ে সময় কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু বরাবরই আমার মনে হত স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। নিজের আলাদা পরিচয় থাকা প্রয়োজন। সেই তাগিদে ২০১৯ সালে ফেসবুক পেজের ‘চায়ের ফাঁকে কেনাকাটা’ মাধ্যমে ব্লক, বাটিক, হেন্ডপেইন্টেড ড্রেস সেইল করা শুরু করি। প্রথমে অন্যের দোকান থেকে কাপড় এনে বিক্রি করতাম। ধীরে ধীরে নিজের তৈরি পণ্য সেইল দেওয়া শুরু করি।

সামিয়া বলেন, আমি কোনো পুঁজি ছাড়া একদম শূন্য হাতে কাজ শুরু করেছিলাম। আর এখন কম করে হলেও মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা সেইল থাকে। গত রোজার ঈদে প্রায় ৬০ হাজার টাকা সেইল দিয়েছি। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এই রোজার ঈদকে কেন্দ্র করেও আমি প্রায় ৫০ হাজার টাকার পণ্য সেইল দিয়েছি।    

সামিয়ার মত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি দিনদিন বাড়ছে। প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে স্বল্প পুঁজিতেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন নারীরা। কোনো কোনো নারীতো আবার শূন্য থেকে হয়েছেন লাখপতি।

এরকমই একজন চমনা চৌধুরী। শুধুমাত্র শাড়ি লুঙ্গি বিক্রি করে হয়েছেন লাখপতি। তিনি জানান, ২০২০ সালে আগস্ট মাসে সুরুচি ঘর নামে একটি ফেসবুক পেইজ থেকে দেশিয় জামদানি শাড়ি, তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রিপিস বিক্রি শুরু করেন। চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত তার সেইল হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

সুরুচি ঘরের পরিচালক চমনা চৌধুরী বলেন, গত বছর যখন করোনা শুরু হল তখন খুব বিপদে পড়ে যাই। স্বামী প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করেন। তার আয়ও বন্ধ প্রায়। করোনার কিছুদিন আগে একটা কিন্টার গার্টেন স্কুলের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে সেটা নিয়েও বিপদে পরি। একদিকে ছেলের সেমিস্টার ফি জমা দেওয়া, একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের ভাড়া দেওয়া, আবার সংসার খরচতো আছেই। সব মিলিয়ে অনেক সমস্যায় পড়ে যাই। তখন তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন ব্যবসার ব্যাপারে জানি। তারপর আমার ফেসবুক পেইজ ‘সুরুচি ঘর’ থেকে কাজ শুরু করি।

বিজ্ঞাপন



তিনি বলেন, করোনা মহামারি না আসলে এই আর্থিক সমস্যায় পড়তাম না আর এই অনলাইন ব্যবসাও শুরু করতাম না। এই মহামারীর সময়ও তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে আমি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। এই অনলাইন ব্যবসা আমাদের নারীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, এখন দেশে ফেসবুক পেইজকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তা আছেন প্রায় চার লাখের উপরে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ পেজ চালাচ্ছেন নারীরা।

চলমান করোনাকালে পড়ালেখা, সভা, সেমিনার, কেনাকাটাসহ বেশিরভাগ কাজই এখন হচ্ছে অনলাইনে। গত এক দশকে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে বিভিন্ন সেবা ডিজিটাইজ হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল, জমির ই-পর্চা, মিউটেশন, ব্যাংকিং, পাসপোর্ট ফরম পূরণ, ভিসা আবেদন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ই-চালান, পেনশন ভাতাসহ নানা সেবা মিলছে। ঘরে বসে কেনাকাটা, মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল, ব্যাংক-বীমার কিস্তি পরিশোধ করা যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি ২৯ লাখ মোবাইল গ্রাহক আছে। এই গ্রাহকের একটি বড় অংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাই অনলাইন ভিত্তিক কেনাকাটায় ঝুঁকেছেন। আর এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের ই-কমার্স ব্যবসা। যার সুফল ভোগ করছেন নারী উদ্যোক্তারা।

নারী উদ্যোক্তাদের কেউ গয়না, কেউ পোশাক, কেউ ঘর সাজানোর জিনিস, কেউ তৈরি খাবারসহ বাহারি পণ্য বিক্রি করছেন। কেউ শখের বসে ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কেউবা স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ব্যবসা করছেন। নারী উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই গৃহিনী। যারার সংসার সামলে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরেছেন আপন মহিমায়।  

সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে মাস্টার্স করছে ঈশিতা জাহান পলি। ফেসবুকের টাইমলাইনে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তার চোখ পড়লো অনলাইন ব্যবসা। পলি চিন্তা করলেন ঘরে বসেই অন্য সবাই যেহেতু ব্যবসা করতে পারছেন তিনি পারবেন। ২০২০ সালের ১৭ জানুয়ারি নিজের নামে ‘জাহান্স কালেকশনস’ নামে একটি পেইজ খুলেন।  সিলেটে একটি কাপড়ের দোকান থেকেই কাপড়ের ছবি তুলে এনে পেইজে দেন। শুরু হয়ে গেল তার অনলাইন ব্যবসা।

ঈশিতা জাহান পলি বলেন, ‘কোন ইনভেস্ট ছাড়াই আমি বিজনেস শুরু করেছিলাম। পেইজে দেওয়ার কিছু দিন পর অর্ডার আসে। আমার পেইজের প্রথম অর্ডার সেই খুশি বলে বুঝানোর মতো না। সেটা ডেলিভারি দিতে পেরে এবং কাস্টমারের রিভিউ পেইজে দেখে মনটা ভরে গিয়েছিল। কিছুদিন পেইজে ছবি দেওয়ার পর মাথায় আসে যদি কাপড় কিনে নিয়ে আসি আর নিজে ছবি তুলে পেইজে দেই কেমন হয়। যেই কথা সেই কাজ। ফেসবুকে অনেক পেইজ থেকে আমি ১০/২০পিচ করে কাপড় এনে যাচাই করি। কাপড় আনার পর পেইজে ছবি এবং ভিডিও আপলোড করার পর আমার পেইজে খুব বেশি সাড়া পাই। আস্তে আস্তে শুরু হয়ে যায় আমার পেইজের পরিচিতি। এখন আমার পেইজে প্রায় ৮০৫০জন সদস্য আছেন।

বিজ্ঞাপন



পলি বলেন, অনেকেই চিন্তা করতে পারেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এখন অনলাইন বিজনেস করছি। আসলে নিজের হাতে করা যেকোনো জিনিস অনেক আনন্দের। আর উদ্যোগী হওয়া এখন অনেক বড় একটা বিষয়। এবছর অনলাইন বাজারে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী। তারপরও প্রায় ৪০ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে এই রোজার ঈদ বাজারে। জাহান্স কালেকশনস আরও বড় হবে। জাহান্স কালেকশনসের একটা সপ থাকবে একদিন,এটাই স্বপ্ন।

ই-ক্যাবের যুগ্ম সম্পাদক নাসিমা আক্তার নিশা বললেন, ‘ইকর্মাস এখন একটি জনপ্রিয় সেক্টর। দিনদিন এর চাহিদা আরও বাড়তেছে। দেশে এখন উদ্যোক্তা আছেন প্রায় চার লাখের উপরে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এখন পর্যন্ত ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এই করোনাকালে লকডাউন থাকলেও ব্যবসা করতে পেরেছেন অনলাইন ব্যবসায়ীরা।’

নিশা বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা অনলাইনে কাজ করেন কিন্তু পেইজ নেই। তারা বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেন। এই পেনডামিক টাইমে মূলত উদ্যোক্তাও বেড়েছে, লেনদেনও বেড়েছে। কারণ এই অনলাইন সেক্টর ছাড়া বাকি সব সেক্টর বন্ধ ছিল। যার কারণে যারা কখনো চিন্তাও করে নাই যে উদ্যোক্তা হবেন তারা এসে উদ্যোক্তা হয়েছেন।’

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ ই-ক্যাবের সাবেক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, ‘অনলাইনে পণ্য বিক্রি নারীদের কাজের সুযোগ তৈরিতে ভাল অবদান রাখছে। বিশেষ করে শিক্ষিত নারীদের একটা অংশ হয়তো নানা কারণে ঘরে থেকে কাজ করতে আগ্রহী। তাদের জন্য ফেইসবুকে একটি পেইজ খুলে পণ্য বিক্রি অনেক ভাল অপশন হতে পারে। ২০২৫ সালের মধ্যে ই-কমার্সে উদ্যোক্তা, ফুল টাইম আর পার্ট টাইম চাকুরী, ফ্রিল্যান্স কাজ মিলে প্রায় ১০ লাখের মত লোক এদেশে জড়িত হবে। তার একটা বড় অংশ হবে নারী। তবে যারা এদিকে আসছেন বা কাজ করছেন তাদের প্রতি পরামর্শ হল ই-কমার্স নিয়ে আগে জানতে হবে। ৩-৪ টা মাস এই রিলেটেল আর্টিকেল গুগল সার্চ করে পড়া দরকার, অনলাইন বিজনেসের যে সব গ্রুপ আছে সেগুলোতে লাইক কমেন্ট করে নিয়মিত থাকা দরকার। তারপর বিজনেসে সময় দিলে ভাল করার সম্ভাবনা বাড়ে।’

নারী উদ্যোক্তাদের নিজেদের স্বার্থে একটিভ হতে হবে মন্তব্য করে রাজিব আহমেদ বলেন, ‘একটিভ মানে শুধু ফেসবুকে লাইক কমেন্ট পোস্ট দেয়া নয়। একটিভ মানে হল প্রতিদিন জানার চেষ্টা করা কারণ ই-কমার্স পুরো  জ্ঞান নির্ভর ইন্ডাস্ট্রি। তাই এখানে নিয়মিত জানতে হবে, শিখতে হবে। আমার মতে প্রতিটি উদ্যোক্তার উচিত তার নিজের বিজনেস, কাজ আর প্রডাক্ট নিয়ে ফেইসবুকে নিজের পার্সোনাল প্রোফাইলে লেখা। প্রতিদিন মাত্র ১টি পোস্ট দিলেও ভাল হয়। কারণ আমার প্রোফাইলে যারা রয়েছে তারা অনেকেই আমাকে চেনেন। ফলে আমার পণ্য সম্পর্কে তারা জানার পাশাপাশি কেনার ব্যপারে অনেক বেশি ভরসা পাবেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত