রিপন দে, মৌলভীবাজার

১২ মে, ২০২১ ১৩:৪০

পরিবহন শ্রমিকদের কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

কঠোর বিধিনিষেধে আন্তঃজেলা পরিবহন চলছে, দুরপাল্লার বাস বন্ধ

লকডাউনের আদলে দেশে চলা কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ কর্মহীন হয়ে দিশেহারা এর প্রভাব পরেছে পরিবহণ শ্রমিকদের মাঝেও। করোনার সংক্রমণ রুখতে সরকার গণপরিবহন বন্ধ রেখেছে তবে নিদিষ্ট নিয়ম মেনে আবার জেলা ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। গণপরিবহনের চলাচলের এই নিয়মে পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে একটি অংশ যখন কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে অন্য দিকে পরিবহন শ্রমিকদের আরেকটি অংশের করোনার এই সুযোগে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ। কোন নিয়মনীতি না মেনে অর্ধেকে যাত্রীর পরিবর্তে অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছেন সেই সাথে ভাড়াও নিচ্ছেন দ্বিগুণ।

সাধারণ যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়,  চলমান লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে সারাদেশের মত মৌলভীবাজারেও কর্মহীন হয়ে পরেন পরিবহন শ্রমিকরা। তবে যেসব পরিবহন চলবে তার জন্য অর্ধেক যাত্রী নেওয়া সাপেক্ষে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করে দেয় সরকার। এই নিয়ম ঘোষণার পর প্রথম কয়েকদিন মানতে দেখা গেলেও প্রথম সপ্তাহের পরেই বদলে যায় চিত্র। অর্ধেক যাত্রী নিয়ে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে দ্বিগুণ ভাড়া ধার্য করা হলেও স্থানীয় সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ গণপরিবহন পূনাঙ্গ যাত্রী নিলেও সেখানে ভাড়া নেওয়া হয় দ্বিগুণ। প্রথম কয়েকদিন যাত্রী কম থাকলেও ঈদ বাজার এবং  ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের এখন উপচে পড়া ভিড়।

যাত্রীদের এই ভিড়ে মৌলভীবাজারের শহরের বিভিন্ন এলাকায় কত কয়েকদিন ধরে যানজট দেখা গেছে নিয়মিত। অতিরিক্ত যাত্রী, স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই তার উপর দুইগুণ ভাড়া পরিবহন শ্রমিকদের একটি অংশের কাছে করোনার এই সময় পৌষমাস। এতে প্রায়ই যাত্রী এবং চালকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা লেগে থাকে।

মৌলভীবাজার শহরের গীর্জাপাড়ার বাসিন্দা জনি দত্ত জানান, বিভিন্ন জরুরী কাজে আমার প্রায় প্রতিদিন বের হতে হয়, স্বাভাবিক ভাবে অটোরিকশাই আমার ভরসা কিন্তু করোনার সুযোগ নিয়ে চালকরা ভাড়া দুইগুণ আদায় করলেও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে। একেকটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ৫ জন করে যাত্রী নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে তারা যুক্তি দেয় সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে কিন্তু সরকার অর্ধেক যাত্রী নেওয়ার কথা বলেছে বললে তারা বলে, যাত্রীরা উঠে গেলে আমাদের কারা কি আছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলিম উদ্দিন হালিম জানান, এমন অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। ঈদের কারণে যাত্রীদের প্রচুর চাপ তবে আমরা চালকদের বলে দিয়েছি যেনো অতিরিক্ত যাত্রী না নেয়। সেই সাথে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

তবে এর উল্টো চিত্র আন্তঃনগর ও দূরপাল্লার গণপরিবহনের শ্রমিকদের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে চলাচল বন্ধ থাকায় তারা পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন বিপদে।

সদর উপজেলার আথানগীরি গ্রামের আব্দুল মিয়া দেশের পরিচিত একটি গনপরিবহন কোম্পানির বাস চালক। মৌলভীবাজার-ঢাকা রুটে বাস বন্ধ তাই গত করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের চলমান লকডাউনের শুরু থেকেই তিনি বেকার। ঈদের দিন ভাল কিছু বাচ্চাকাচ্চাদের মুখে তুলে দিতে পারবেন না তার জন্য হতাশ, ইতোমধ্যে সংসার চালাতে গিয়ে আটকে আছেন দেনায়।

তার মতোই মৌলভীবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন যায়গায় এবং মৌলভীবাজার থেকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন শহরে চলাচলকারী আন্তঃজেলা বাস বন্ধ থাকায় এসব পরিবহনের প্রায় ৫শ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে সংসার চালাতে গিয়ে বিভিন্ন দেনার জালে আটকে আছেন। করোনা তাদের জন্য সর্বনাশ।

শ্যামলী বাস কাউন্টারের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমদ জানান, প্রতিদিন মৌলভীবাজার জেলা থেকে ঢাকা-চট্রগামসহ দুরের বিভিন্ন জেলায় শতাধিক বাস যাওয়া আসা করত। এসব বাস বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা দিশেহারা। পর্যাপ্ত সাহায্য বা ত্রাণও তারা পাচ্ছেন না। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে ত্রাণ মিললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য বলে দাবী করছেন শ্রমিক নেতারা। 

জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফজলুল আহমদ জানান , আমাদের ১৩শ শ্রমিক বেকার ছিল তবে ৬ তারিখ থেকে জেলার ভেতর বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পর কিছু শ্রমিক কাছে ফিরেছে। তবে অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি সরকার নিয়ম করে দিয়েছে এবং আমরা অর্ধেক যাত্রী পরিবহণের বিষয়টি নিশ্চিত করছি এবং নিয়মিত চালকদের বলে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আন্তঃনগর বাস বন্ধা থাকায় ৫শ পরিবহণ শ্রমিক এই জেলায় বেকার আছে। তাদের জন্য সাহায্যও প্রয়োজন।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অতিরিক্ত যাত্রী এবং ভাড়ার বিষয়ে কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসের যে শ্রমিকরা বেকার তাদের পাশেও দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পৌঁছে দিয়েছি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত