আমীর হামজা, হবিগঞ্জ

২৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০১:১৫

স্বাস্থ্যকর্মী সাইফুলকে কেন হত্যা, হত্যাকারী কারা?

হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব টেকনিশিয়ান) সাইফুল ইসলামকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে শহরের টাউনহল রোড এলাকার জুনিয়র হাই স্কুল এন্ড কলেজের রাস্তার প্রবেশ মুখে তাকে কুপিয়ে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা।

পরে তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে আসলে আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথেই মৃত্যু হয়।

সাইফুল ইসলাম হাসপাতালের করোনা টেস্ট সেন্টারে কাজ করতেন।

তিনি জেলার মাধবপুর উপজেলার মনতলা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। তবে তার মা-বাবা নেই।

জানা যায়, হাসপাতালে কাজের সুবাদে সাইফুলের সাথে পরিচয় হয় নবীগঞ্জের পুরানগাও এলাকার তাহমিনা বেগম চৌধুরীর সাথে। পরে ওই মহিলাকে সাইফুল ধর্ম মা ডাকেন।

ঘটনার সময় সাইফুলের সাথেই ছিলেন তাহমিনা। কিন্তু ওসমানী হাসপাতাল থেকে উধাও হয়ে যান তিনি।

মঙ্গলবার রাত ১১টায় তাহমিনার সাথে মোবাইল ফোনে কথা হয় সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরের। এসময় তিনি সিলেটে আছেন জানিয়ে বলেন, ঘটনার পর থেকে আমার খুব ভয় হচ্ছে। সিলেটে আসার পর আমি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমার ভাইয়ের কাছে চলে এসেছি।

সাইফুলের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও তার ধর্ম মা তাহমিনা বেগমের সাথে কথা বলে সিলেটটুডে।

জানা যায়, অনেকটা শান্ত স্বভাবের লোক ছিলেন সাইফুল। কারো সাথে তার কখনো ঝগড়া হয় নি। মঙ্গলবার সকালে তার ধর্ম মা তাহমিনা বেগম ফোন দিয়ে করোনার ভ্যাকসিন নিতে পরামর্শ চান। সাইফুল তাকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য বলেন।

দুপুর ১২ টার দিকে তাহমিনা হাসপাতালে আসলে তখন সাইফুল করোনা টেস্ট বক্সে কাজ করছিলেন। পরে তাকে ভ্যাকসিন দিয়ে ল্যাবে বসতে বলেন। এরপর করোনা টেস্ট বক্সের কাজ শেষ করে ল্যাবে আসলে রক্ত দান করতে আসেন ২/৩ জন যুবক।

তখন ওই যুবকরা আগে রক্ত দেয়ার জন্য বললে সাইফুলের সাথে কাটাকাটি হয়। এরপর দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে রক্ত দান শেষে তারা চলে যান।

সাইফুলের ধর্ম মা তাহমিনা বেগম চৌধুরী বলেন, ‘যখন ওই যুবকরা রক্ত দিতে আসেন তখন তাদের সাথে কোন এক বিষয় নিয়ে সাইফুলের সাথে কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তার সাথে রাগারাগি করে ওই যুবকরা। ’

তিনি বলেন ‘সাইফুল আমাকে গাড়িতে তুলে দিতে রিকশা দিয়ে নবীগঞ্জ সিএনজি স্ট্যান্ডের (খোয়াই নদীর ব্রিজ) উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে টাউনহল রোড এলাকার জুনিয়র হাই স্কুল এন্ড কলেজের রাস্তার প্রবেশ মুখে রিকশা থেকে হঠাৎ তাকে টেনে নামায় এক যুবক। পেছন থেকে আরও এক যুবক আসেন বড় একটি বাঁশ নিয়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে মাটিতে ফেলে মারতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা বাঁশ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এতে প্রচণ্ড রক্ত ক্ষরণ হয়।’

তিনি বলেন, ‘যখন তাকে মারছিল তখন সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। মেরে মাটিতে ফেলে চলে যায় তখন লোকজন এসে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।’

হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ান সজিবুল ইসলাম সজিব বলেন, সাইফুল করোনা টেস্টের কাজ শেষ করে রক্ত দাতাদের রক্ত নিচ্ছিলেন। এসময় আমি অপর রুম থেকে শুনেছি তাদের কথাকাটাকাটি হচ্ছে। পরে আমি ভেবেছি প্রতিদিনই এমন অনেক লোক এসে কাজে অকাজে কথা কাটাকাটি করেন। তেমন কিছু হবে না। এরপর রক্ত নেয়া শেষ হলে তার মাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসবে বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়। পরে আমরা খবর পাই তাকে কেউ মেরেছে।

কাকে রক্ত দিতে এসেছিল ওই যুবকরা?
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী শিশু মিয়া (৮৫) নামের এক বৃদ্ধকে রক্ত দিতে আসে ওই যুবকরা। শিশু মিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু ঘটনার পর থেকে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন বলে জানান হাসপাতালের আরএমও ডা. মো. মোমিন উদ্দিন।

এদিকে রাত ৮টায় হাসপাতালের সামনে সাইফুলের খুনিদের শনাক্ত ও দ্রুত গ্রেপ্তার করতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন হাসপাতালের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

ঘটনার পর থেকে হত্যাকারী শনাক্ত করণে কাজ করছে পুলিশ, পিবিআই, সিআইডি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মাসুক আলী বলেন, ‘পুলিশ ঘটনার পর থেকে কাজ করছে বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের যে সিসিটিভিটি রয়েছে সেটিতে হত্যাকারীদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। আমি আশাবাদী খুব দ্রুত আমরা তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত