নিজস্ব প্রতিবেদক:

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ২৩:৪৪

প্রীতমের বিরুদ্ধে ‘ধর্ম অবমাননার’ মামলার বাদী ছাত্রলীগ নেতা

পাকিস্তানি লেখক সাদত হোসেন মান্টোর একটি উক্তি নিয়ে গত ৮ জুলাই একটি পোস্ট দেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের তরুণ প্রীতম দাশ। ওই পোস্টের স্ক্রিনশট ফেসবুকে শেয়ার করে তাকে আইনের আ্ওতায় আনার দাবি জানান শ্রীমঙ্গল পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবেদ হোসেন। ছাত্রলীগ নেতার ওই পোস্টের পর শ্রীমঙ্গলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রীতমের বিচার ও গ্রেপ্তার চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন অনেকে, যাদের বেশিরভাগই ছাত্রলীগের কর্মী। ছাত্রলীগের কর্মীরা মান্টোর ওই উক্তিতে ধর্মীয় অবমাননার দাবি করছিল। এতে নিরাপত্তা শঙ্কায় আত্মগোপনে চলে যান প্রীতম দাশ।

এরপরই গত সপ্তাহে প্রীতমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন পৌর ছাত্রলীগ কর্মী মাহবুব আলম ভূইয়া।

এই মামলায় শুক্রবার (৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল শহরের একটি বাসা থেকে প্রীতম দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ূন কবির বলেন, প্রীতম দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ছাত্রলীগ নেতার করা ধর্ম অবমাননার মামলায় প্রীতম দাশ গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হচ্ছে।

তারা বলছেন, ‘‘পাকিস্তানি লেখক সাদত হোসেন মান্টোর একটি উক্তি নিয়ে আরও অনেকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। নিবন্ধও লিখেছেন। গত ৭ জুলাই একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ‘নও পাকিস্তানি নও বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি লেখায় পাকিস্তানের দুর্দশার বর্ণনা করতে গিয়ে মান্টোর ওই উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন।

‘‘সেই লেখা থেকে নেয়া মান্টোর উদ্ধৃতি নিয়ে পোস্ট দেয়ার প্রায় দুই মাস পর প্রীতমের বিরুদ্ধে ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ তোলেন ছাত্রলীগ নেতা আবেদ হোসেন।’’

‘‘মন্টোর একই উদ্ধৃতি নিয়ে গত ২৮ জুলাই সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে এবং মৌলভীবাজার-২ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান নামের ফেসবুক পেজ থেকেও একই স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছিল। তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠেছে কেবল প্রীতমের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা প্রীতমকে টার্গেট করেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলেছে। ’’

মামলার বাদী পৌর ছাত্রলীগ কর্মী মাহবুব আলম ভূইয়ার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ায় এই বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চা শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষে থাকায় ছাত্রলীগের রোষানলে প্রীতম:

চা শ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকায় প্রীতম স্থানীয় ছাত্রলীগের রোষানলে পড়েন। এমনটি তার স্বজনদের দাবি। এরপরই প্রীতমের পুরনো একটি স্ট্যাটাস নিয়ে শ্রীমঙ্গলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উসকানি ছড়ায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ২৭ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে সমাবেশ করে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। শ্রীমঙ্গলে চৌমোহনা চত্বরে আয়োজিত এ সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটে। আয়োজকরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করছেন, স্থানীয় ছাত্রলীগের একটি অংশ এ হামলা চালায়।

প্রীতম দাশ ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। হামলার পর ২৯ ও ৩০ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে দুটি সংবাদ সম্মেলন করে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’। সেখানে লিখিত বক্তব্য পড়েন প্রীতম দাশ।

এতে তিনি অভিযোগ করেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবেদ হোসেনের নেতৃত্বে তার অনুসারীরা সমাবেশে হামলা চালায়। এতে প্রায় ১০ জন কর্মী আহত হন।

এই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ফেসবুকে ধর্ম অবমানননার অভিযোগ এনে প্রীতমের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দেন আবেদসহ অন্যরা।

প্রীতম দাশ বলেন, ‘চা শ্রমিকদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আমাদের সমাবেশে আবেদের নেতৃত্বে হামলা করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আমি তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছিলাম। সে কারণে সে ক্ষুব্ধ হয়ে আমার নামে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে উসকানি ছড়াচ্ছে।’

প্রীতম বলেন, ‘উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি বাসায় যেতে পারছি না। আমার পরিবারও আতংকে আছে। পুরো উপজেলার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।’


কী আছে সাবেক ছাত্রলীগ সম্পাদক আবেদ হোসেনের স্ট্যাটাসে:

শ্রীমঙ্গল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবেদন হোসেন ২৯ আগস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট দেন । ৮ জুলাই দেয়া প্রীতমের পোস্টের স্ক্রিনশট যুক্ত করে এতে আবেদ লেখেন (বাক্য, বানান অপরিবর্তীত), ‘আমি তার ফেসবুকে ৭ জুলাইয়ের একটি পোস্টের স্ক্রিনশট দিলাম যেখানে সে দেশের অবস্থা নাজেহাল বুঝাতে গিয়ে আমাদের ইসলাম ধর্মকে ব্যাঙ্গ করে উদাহরণ দিয়েছে, জুমার নামাজ, মুসজিদের ইমাম এবং মুসল্লীদের নামাজ পরাকে ব্যাঙ্গ করেছে।’

স্ট্যাটাসে আবেদ লেখেন, ‘আমি শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন ও শ্রীমঙ্গল থানার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই এ ধরণের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে যারা পবিত্র ধর্ম নিয়ে উসকানিমূলক কথা বলে তাদেরকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে তারা কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে করতে চায় তা বের করা দরকার।‘

আবেদের এই স্ট্যাটাসের পর তার অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মীসহ আরও অনেকে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এরপর মিছিল হয় শ্রীমঙ্গলে। সেই মিছিল থেকে প্রীতমকে গ্রেপ্তারে শুক্রবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত