০৫ মে, ২০২৫ ১৯:২১
‘হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে যায় সড়কের কার্পেটিং। গাড়ি চললে দেবে যায় সড়ক। দুই ইঞ্চি কার্পেটিংয়ের বদলে কোথাও এক ইঞ্চি কোথাও সোয়া ইঞ্চিও নেই। নির্মাণ কাজের পাশে সকল বিবরণ দিয়ে সাইনবোর্ড রাখার নিয়ম থাকলেও প্রকল্প এলাকার কোথাও নেই সাইনবোর্ড। রাতের অন্ধকারে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে, এই সড়ক কয়েক মাসও টিকবে না।’
এভাবেই সুনামগঞ্জের নিয়ামতপুর-আনোয়ারপুর সড়কের কাজের অনিয়মের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সড়কের সংস্কার কাজ চলছে গত তিন বছর ধরে।
সড়কটি দিয়ে সুনামগঞ্জের সদর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলা লোকজন চলাচল করেন। সুনামগঞ্জ শহর ও জামালগঞ্জ থেকে এই সড়ক দিয়ে সহজে তাহিরপুরে আসা-যাওয়া করা যায়।
যদিও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীর দাবি, নিয়ম মোতোবেক কাজ করা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলী বললেন, কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে বিল না দেয়ার কথা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস ছাত্তার বলেন,‘ সড়কে সঠিকভাবে পানি দেওয়া হয়নি। ধুলা-ময়লা না সরিয়ে মাটির উপরেই কার্পেটিং দিয়ে দিয়েছে। যার কারণে হাত দিয়ে টান দিলেই কার্পেটিং উঠে যায়, কোন শক্তি করা লাগে না।’
একই গ্রামের মো. গোলাম মোস্তফা বলেন,‘ রাস্তার কিনারের ইট দুই ইঞ্চি উপরে ছিল কিন্তু ঢালাই (কার্পেটিং) কম দিয়ে রুলার দিয়ে চাপ দিয়ে ইট নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ বুঝে ঢালাই ইটের সমান দিয়েছে। কোন কোন স্থানে এক ইঞ্চি হবে না। ’
গ্রামের মো. ফেরদৌস আলম বললেন,‘ রাতের অন্ধকারে সড়কের কাজ করেছে। কাজের সময় বৃষ্টি আসলে বৃষ্টিতেই কাজ করা হয়েছে। রুলার দিয়ে একবার চাপ দিয়ে চলে গেছে, এখন মানুষের পায়ের ঘসায় কাজ উঠে যাচ্ছে।’
জানা যায়, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন নিয়ামতপুর-আনোয়ারপুর সড়কটি সংস্কারের কাজ পায় ঢাকার ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠান এমএস সালেহ আহমেদ ও কামরুল এন্ড ব্রাদার্স। এক বছর মেয়াদে ৩৬ কোটি টাকা ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ জুন। এক বছরে কাজ মেয়াদ বাড়িয়ে বাড়িয়ে চলছে প্রায় তিন বছর ধরে।
আলীপুর গ্রামের মুক্তার হোসেন বলেন, ‘কাজের কোন সাইনবোর্ড আমরা দেখতে পাইনি। আমাদের দাবি, কাজটি যেন ভাল করে করা হয়। কিন্তু মাটির উপরে আধা ইঞ্চি করে কাজ করার কোন মানে নেই। যেভাবে কাজ করা হয়েছে এক মাসের বেশি ঠিকবে না। তাদের গাড়ির চাপেই সড়ক ফেটে যায়।’
তাহিরপুর উপজেলার মাহমুদ গ্রামের আতাউর রহমান বলেন,‘ নিয়ম অনুযায়ী পাথরের উপরের কার্পেটিং দেওয়ার কথা থাকলেও তারা মাটির উপরেই পাতলা করে দিয়ে দিছে। এখন পায়ের চাপ পড়লেই উঠে যায়।’
একই গ্রামের অমর কান্তি তালুকদার বলেন, ‘সরকার জনগনের রাস্তার সুবিধার জন্য টাকা দিয়েছে কিন্তু কাজ ভাল হয়নি। বড় বড় ট্রাকের চাপ দূরের কথা, অটো রিশকার চাকায় কার্পেটিং উঠে যায়।’
আনোয়ারপুর গ্রামের লোকমান হোসেন বলেন, ‘তিন বছর ধরে রাস্তার কাজ চলছে, কিন্তু কাজ শেষ হচ্ছে না। একদিকে কাজ চললেও, বারুংকা গ্রামের কাছে সড়কের ভাঙায় মাটিই ফেলা হয়নি। বর্ষায় এই অংশ পানিতে তলিয়ে যাবে, পায়ে হেটেই চলা যাবে না।’
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী শেখ সুজন মিয়া বলেন,‘ বন্যার কারণে কাজে কিছু বিলম্ব হয়েছে। নিয়ম মোতাবেক কাজ করা হয়েছে, কোন অনিয়ম হয়নি। নিয়ামতপুরের কাছে সাইনবোর্ড ছিল, সেটা কারা ভেঙে ফেলে দিয়েছে। কিছু মানুষ বদনাম করার জন্য ও যাতে কাজ না হয় তাই এসব কথা বলছে। তবে মেশিনের কারণে কিছু জায়গায় সমস্যা হয়েছিল স্বীকার করে তিনি বললেন, যেখানে কার্পেটিং এর পুরুত্ব কম হয়েছিল সেইটুকু আবার করে দেওয়া হচ্ছে। ’
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সহদেব সূত্রধর বললেন,‘ নিয়ম মোতাবেক কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। কার্পেটিং এর পুরোত্ব কম দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কোথাও এমন হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজ হস্তান্তরের পূর্বে একাধিক বিশেষজ্ঞ দল নানাভাবে কাজ পরীক্ষা করে দেখবেন। কোন কমতি পাওয়া গেলে বা কোন অনিয়ম ধরা পড়লে পুনরায় কাজ করানো হবে।’
আপনার মন্তব্য