নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ অক্টোবর, ২০২৫ ১৪:১৬

হকারমুক্ত নগরে স্বস্তি, এবারের উদ্যোগ স্থায়ী হবে তো?

এরআগে আরও অন্তত দুবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিলেট নগরের সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে লালদিঘির পাড় মাঠে পুণবার্সনের। সিলেট সিটির সাবেক দুই মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এমন উদ্যোগ নেন।

দুইবারই দেখা গেছে একই চিত্র। প্রথম কিছুদিন সড়ক ছেড়ে দেন হকাররা। ফুটপাতও হয় দখলমুক্ত। কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে পুরনো চিত্র। সড়ক-ফুটপাতজুড়ে হকারদের জঞ্জাল।

এবার আরেকদফা এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে সড়ক থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হকারমুক্ত সড়ক ও ফুটপাতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। এবার সিটি করপোরেশনের সাথে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে জেলা প্রশাসন, মহানগর পুলিশ। প্রশ্ন উঠেছে- এবারের উদ্যোগ স্থায়ী হবে তো?

মেয়র থাকাকালে আরিফুল হক চৌধুরী যখন হকারমুক্ত সড়কের উদ্যোগ নেন তখন ক্ষসতায় আওয়ামী লীগ। আর আরিফ বিএনপির নেতা। তিনি সেসময় পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগীতার অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, পুলিশের সগযোগিতা না পাওয়ায় হকারদের সড়ক ও ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা যায়নি।

তবে সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী আওয়ামী লীগেরই প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তিনি সড়ক থেরেক হকারদের সরিয়েছিলেনও। তবে ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর আবার হকাররা সড়ক ও ফুটপাত দখল করে নেয়।

এবার সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও মহানগর পুলিশ সমন্বিতভাবে এই উদ্যোগ নেওয়ায় আশা দেখছেন নগরবাসী। তবে অতীতের তীক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আছে শঙ্কাও।

যদিও সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসক জোর দিয়েই বলছেন এবার আর আগের পুণরাবৃত্তি হবে না। এবার অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলমের নির্দেশনা ছিল ১৯ অক্টোবর থেকে সিলেট নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও ফুটপাতে হকার বসতে দেওয়া হবে না। জেলা প্রশাসকের এই নির্দেশনা মেনে রবিবার থেকে সিলেট নগরীর প্রধান সড়ক ও ফুটপাত ছেড়ে দিয়েছেন হকাররা। রবিবার নগরী চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার এলাকার সড়ক ও ফুটপাতে হকারদের দেখা মিলেনি। সোমবার এবং আজ মঙ্গলবারও একই অবস্থা রয়েছে নগরীতে। তাই দখলমুক্ত সড়ক ও ফুটপাতের ফলে যানজটও কমে গেছে অনেকটা। এতে নগরীর বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করে এই অবস্থা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এই হকার মুক্ত নগরী কতদিন থাকবে বলেও প্রশ্ন করছেন নগরবাসীর।

মূলত সিলেট জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ঐক্যে হকার মুক্ত হচ্ছে নগরী। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা-ই রাফিন সরকার সম্মিলিতভাবে সিলেট সিটি করপোরেশনের দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। জেলা প্রশাসন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশবাহিনী ও সিসিকের দায়িত্বশীলরা এক হয়ে নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা জিন্দাবাজার, লামাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, বন্দরবাজার ও তালতলা এলাকায় পরিদর্শন করেন। রবিবার সন্ধ্যার পর নগরীর জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেট পর্যন্ত সরজমিনে পরিদর্শন করেন প্রশাসনের এই তিন কর্তা।

এদিকে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে হকাররা ব্যবসা পরিচালনার ফলে দীর্ঘদিন ধরে সিলেট নগরীতে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছিল। এর ফলে নগরবাসীর হাঁটাচলায়ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছিল। এ সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য সিলেট সিটি করপোরেশন ভ্রাম্যমাণ হকারদের বসার জন্য লালদিঘিরপাড়ে হকার শেড তৈরি করে দিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ হকাররা এখন রাস্তা-ফুটপাত ছেড়ে লালদিঘির পাড়ের নির্ধারিত স্থানে স্বাচ্ছন্দে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এতে নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হবে। যানজট কমার পাশাপাশি নগরবাসী স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলাও করতে পারবেন বলে জানান সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

এর আগের সিলেট নগরীর ফুটপাত হকার মুক্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মেয়র। কিন্তু এইসব পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হয়নি। বরং আন্দোলন করে, মানবিক এজেন্ডা দেখিয়ে প্রশাসনের কর্তাদের বিপাকে ফেলে বারবার হকাররা সড়কে অবস্থান নিয়েছে। তাই এবারও জনমনে প্রশ্ন কতদিন থাকবে হকারমুক্ত নগরী।

সিলেট নগরীর জল্লারপাড় এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন আহমেদ বলেন, এর আগেও দেখা গেছে যে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা এলাকাগুলোতে ব্যাপক আকারে হকার উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু সেগুলো সফল হয়নি বা সেগুলোর কার্যকারিতা স্থায়ী হয়নি বিভিন্ন অজুহাতে এবং প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে। কিন্তু এবার যদি সেই অজুহাতকে পাত্তা দেওয়া না হয় এবং সেই প্রশাসনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায় তবে এই ফুটপাত দখল করে, রাস্তা দখল করে হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ থাকবে না। সেক্ষেত্রে বর্তমানে যে ৩টি প্রতিষ্ঠান একত্রে অভিযান পরিচালনা করছে, তাদের কমপক্ষে ২ মাস এই কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে। এই কাজ এক সপ্তাহের বা এ পক্ষের না। এই কাজ অন্তত ২ মাস চালাতে হবে যাতে মানুষ হকারমুক্ত রাস্তায় হেটে স্বাচ্ছন্দ্য পায় ও রাস্তায় গতি বাড়ে। সেই সঙ্গে বর্তমান যে ৩টি প্রতিষ্ঠান একত্রে অভিযান চালাচ্ছে তারা তাদের অভিযান অব্যাহত রাখবে। রাজনৈতিক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে জনসমর্থন আদায় করতে পারলে এই অভিযান সফল হবে। এছাড়া সফলতা ক্ষণিকের সুখে পরিণত হবে।

নগরীর নয়াসড়ক এলাকার বাসিন্দা ডিউক স্ট্রারলিন বলেন, সিলেট নগরী হকারমুক্ত হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন নগরীর বাসিন্দারা। রোববার থেকে দেখলাম নগরীর সড়কগুলোতে কোনো হকার নেই। তাই যানজটও অনেক কম এখন। তবে কয়েকটি জায়গায় দেখলাম যেখানে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে সেখানে এখন সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে নিজেরা সচেতন না হলে এভাবে কি নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে?

এদিকে নগরীর যানজট নিরসন ও সড়ক-ফুটপাত হকারমুক্ত করার লক্ষ্যে লালদিঘিরপাড়ে অস্থায়ী হকার শেড তৈরি করে দিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। ভ্রাম্যমাণ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত অস্থায়ী বাজারে কোনোরকম ভাড়া ছাড়াই ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে হকাররা এখানে আসতে শুরু করেছেন। রবিবার অনেক হকারকে তাদের পসরা দিয়ে হকার শেডে বসতে দেখা গেছে।

হকারদের জন্য নগরভবনের পেছনে লালদিঘির পাড় মাঠে নতুন দশটি গলিতে ইট, বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী শেড নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন রাস্তা ও ড্রেন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে স্থাপন করা হয়েছে টয়লেটও। বাজারে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। কাঁচা বাজার, মাছ বাজার, কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসার জন্য সাইনবোর্ড টানিয়ে স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সিসিকের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিংয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। হকারদের সচেতন করতে সিসিক ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ প্রচার কাজ চালানো হচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ‘নগরী যানজটমুক্ত করতে এবং সিলেট নগরীর বাসিন্দাদের নির্বিঘ্ন চলাচলের স্বার্থে আমরা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জন্য লালদিঘির পাড়ে অস্থায়ী শেড তৈরি করে দিয়েছি। ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আশা করি এখন হকাররা নগরীর রাস্তা ও ফুটপাত ছেড়ে লালদিঘিরপাড়ে চলে আসবেন। আমরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোনো ভাড়াও নিচ্ছি না। কাউকে কোনো টাকা দিতে হবে না। এই অস্থায়ী বাজারটি হকারদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুবিধাজনক আশ্রয়। আশা করি ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা চালিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। একইসঙ্গে শহরের যানজট কমবে। ফুটপাতও দখলমুক্ত হবে। সুন্দর ও সুশৃঙ্খল সিলেট নগরী গড়তে আমরা সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’

সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম বলেন, হকারদের উচ্ছেদের পর আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা লেগুনার দখলে রাজপথ ফুটপাত চলে যেতে দেওয়া হবেনা। অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ বা গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়গুলো আমাদের নজরে আছে। সিলেট নগরীতে পরিবহন চলাচল ও পার্কিং ব্যবস্থা আরও শৃঙ্খলিত করতে তিন দফা নতুন নির্দেশনা জারি করেছি আমরা।

জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন, হকাররা ফুটপাথ বা রাজপথে বসছেন না। আমাদের নির্দেশনা তারা মেনেছেন সেজন্য তাদের ধন্যবাদ। তাদের জন্য লালদিঘীরপার অস্থায়ী হকার্স মার্কেট প্রস্তুত করায় সিলেট সিটি করপোরেশনকেও ধন্যবাদ। পুলিশ প্রশাসন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফুটপাত মুক্ত করার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে। তাই তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। নগরীর যানজটমুক্ত করতেই আমরা মূলত হকারদের উচ্ছেদ করেছি। এখন রাস্তাঘাট দেখতে সুন্দর লাগছে। তবে এই সুবিধার সুযোগে যদি সিএনজি ও লেগুনা চালকরা সড়ক দখল করে নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চালকদের জন্য নির্ধারিত স্ট্যান্ড রয়েছে, তারা সেখানেই যাত্রী তুলবেন ও নামাবেন। রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা সহ্য করা হবে না।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত