১০ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৩৯
ছবি: সংগৃহীত
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের খোয়াই নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার বাসিন্দা।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর নামক স্থানে খোয়াই নদীর আরেকটি বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে।
কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধের অংশটি ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত বেগে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর ও বনদক্ষিণসহ অন্তত ১৫টি গ্রামে পানি প্রবেশ করে।
হঠাৎ বন্যায় ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন দুর্গতরা। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে গবাদিপশু এবং ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্রসহ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন মানুষ। অনেকে নিকটস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। এছাড়া হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকার বেশ কিছু ঘরেও পানি প্রবেশ করেছে।
নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা।
এদিকে, হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধটিও এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বাঁধটি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে মেরামতের কাজ করে যাচ্ছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া ও গাফিলতির কারণেই এই ভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে আকস্মিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থান তলিয়ে গেছে। সড়কের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে সড়কটি দিয়ে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা হবিগঞ্জ সদরের সঙ্গে মিরপুরের যোগাযোগকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
বিপৎসীমার ওপরে পানি: কী বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড?
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোয়াই নদীর পানি তিনটি পয়েন্টেই বিপৎসীমার আশঙ্কাজনক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল:
বাল্লা পয়েন্ট (চুনারুঘাট): বিপৎসীমার ১৯২ সে.মি. ওপরে।
শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্ট: বিপৎসীমার ১১৩ সে.মি. ওপরে।
মাছুলিয়া পয়েন্ট (হবিগঞ্জ শহর): বিপৎসীমার ১৪০ সে.মি. ওপরে।
পাশাপাশি কুশিয়ারা নদীর পানিও কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দিনের বেলায় পানি বৃদ্ধি পেলেও রাতের দিকে কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। তবে দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
তত্পর প্রশাসন, চালু কন্ট্রোল রুম
কালীগঞ্জে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল হক এবং হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে ও আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী ও অসুস্থদের দ্রুত সরানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মঈনুক হক জানান, বন্যা পরিস্থিতি তদারকি করতে ইতিমধ্যেই একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রশাসনের কাছে ৫ লক্ষ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে। এছাড়া বন্যাদুর্গতদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, "বন্যা পরিস্থিতি আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। উদ্ধার কার্যক্রম ও ত্রাণ বিতরণের জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।"
আপনার মন্তব্য