হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

২৩ আগস্ট, ২০২৬ ২০:২৫

হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধে ফের ভাঙন, লোকালয়ে ঢুকছে পানি

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দেড় মাসের ব্যবধানে একই স্থানে নতুন করে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ভাঙন দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় বিকেল পর্যন্ত কালীগঞ্জসহ আশপাশের ১০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে শত শত একর জমির ধান ও সবজি। পানিতে তলিয়ে গেছে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ। এতে সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারতের চাকমাঘাট ব্যারাজ খুলে দেয়ার কারণে রোববার ভোর থেকে খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। দুপুরে চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে কালীগঞ্জ বাঁধের অংশটি দ্বিতীয় দফায় ভেঙে যায়। মুহূর্তেই ভাঙন দিয়ে তীব্র স্রোতে পানি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

ভাঙনের পর দ্রুতগতিতে পানি ঢুকে পড়ায় নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ঘরবাড়ির প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশু অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার পড়েছে চরম দুর্ভোগে।

এদিকে পানিতে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক যাত্রীকে ঝুঁকি নিয়ে কোমর সমান পানি পেরিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে সড়কটির আরও বড় অংশ তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

এর আগে গত ৯ জুলাই রাতে একই বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। সে সময় খোয়াই নদীর পানি উপচে সদর উপজেলার ৩০টি গ্রামে ঢুকে পড়ে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম দফার ভাঙনের পর বাঁধ মেরামতের কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করায় বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। এরই মধ্যে নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় বাঁধের দুর্বল অংশটি ফের ভেঙে গেছে।

কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মখলিছ মিয়া বলেন, ‘আগেরবার বাঁধ ভাঙার পর আমরা ভেবেছিলাম স্থায়ীভাবে সমাধান হবে। কিন্তু মেরামতের কাজ যেভাবে হয়েছে, তাতে আমাদের আশঙ্কা ছিল আবারও ভাঙন দেখা দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটিই হলো। এখন চোখের সামনে দিয়ে পানি ঢুকছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের হাজার হাজার মানুষের এই দুর্ভোগের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাঁধ মেরামতের কাজে সংশ্লিষ্টরা দায়ী।’

সুঘর এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘বাঁধ মেরামতের সময় কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল। যদি বাঁধটি ঠিকভাবে ও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হতো, তাহলে একই জায়গায় এত অল্প সময়ের মধ্যে আবার ভাঙন দেখা দিত না।’

তিনি বলেন, ‘কয়দিন আগে বাঁধ ভাঙার কারণে আমাদের এলাকার হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে, মাঠে থাকা সকল ফসলও তলিয়ে গেছে। সেই ক্ষতির দখল কাটিয়ে ওঠার জন্য কৃষকরা আবারো রুপা আমনসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ করেছিল। কিন্তু আবারও সবকিছু তলিয়ে গেছে। এই এলাকার কৃষকরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

একই এলাকার বিকাশ সূত্রধর বলেন, ‘পানি যেভাবে ঢুকছে, তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে নদীর পানি তিন জায়গায় ভাঙছিল। ফলে পানি তিনদিক দিয়ে বেরিয়েছে। এখন একদিক দিয়ে সবপানি প্রবেশ করছে। ফলে আগের চেয়েও বেশি ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ‘ভারতের ত্রিপুরায় গতকাল (শুক্রবার ) ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণে ত্রিপুরার চাকমাঘাট ব্যারাজ খুলে দেওয়ায় খোয়াই নদীতে হঠাৎ করে পানি বেড়ে যায়। যে কারণে বাঁধটি আবারও ভেঙে গেছে। আমরা খুবই মর্মাহত। তবে ব্যারাজ বন্ধ করে দেওয়ায় বিকেল থেকে নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। দ্রুতই পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।’

বাঁধের ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভাঙনকৃত অংশের মেরামতকাজ করতে সময় লেগেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত ভাঙনকবলিত অংশ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এদিকে নতুন করে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত বাঁধ সংস্কার করে পানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত