সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

২৬ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৫৪

এবার ছাতকে কাটা হচ্ছে চার শতাধিক গাছ

সুনামগঞ্জের পর এবার জেলার ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়ক এবং নদীতীরবর্তী এলাকার চার শতাধিক গাছ কাটছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। স্থানীয়রা বলছেন, ৫০ বছরেরও বেশি বয়সী এসব গাছ সড়কের ধার ও নদীতীরের ভাঙন প্রতিরোধে প্রাকৃতিক প্রহরী হিসেবে কাজ করে। সেগুলো কেটে ফেলা হলে বিপর্যয় নিশ্চিত।

সড়ক প্রশস্তকরণের কথা বলে এসব গাছ কাটার ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে অধিকাংশ মানুষের মাঝে। প্রতিদিন সরকারিভাবে নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব গাছ বিক্রি ও কাটার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নতুন করে বনায়ন না করে বা প্রতি একটি গাছের বিপরীতে দুটি চারা রোপণের পদক্ষেপ ছাড়াই চলছে এই নিধন যজ্ঞ। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, সড়ক ও নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে– যা স্থানীয়দের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ছাতক বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের ১৩ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য শিগগিরই কাজ শুরু হবে। সে লক্ষ্যে সরকারি নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সড়কটির পাশের মোট ৪৩৪টি গাছ বিক্রি করেছে বন বিভাগ। ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত এসব গাছে চিহ্ন (মার্ক) দেওয়া হয়। সড়ক প্রশস্তকরণ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় সম্প্রতি গাছগুলো নিলামে তোলা হয়।

বিক্রি হওয়া গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে– ১৭৪টি রেইনট্রি, ১১৪টি মেহগনি, ২৮টি আকাশমণি, ৪৫টি শিশু, ২৬টি জাম, ১০টি পিটালি, ১০টি অর্জুন, সাতটি ছাতিয়ান, ছয়টি জারুল, ছয়টি গামার, তিনটি কড়ই, দুটি চাম্বুল, দুটি কদম এবং একটি বাবলা গাছ। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এসব গাছ থেকে তিন হাজার ৫২৯ ঘনফুট কাঠ এবং দুই হাজার ৬৭১ ঘনফুট জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ হওয়ার কথা।

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক কার্যাদেশে উল্লেখ করা হয়, মোট ৪৩৪টি গাছ ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে উপকারভোগীরা পাবেন ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা এবং সরকারি কোষাগারে জমা হবে তিন লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে ঠিকাদারের লোকজন গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছাতক থেকে দোয়ারাবাজার পর্যন্ত সড়কটির একটি বড় অংশ নদীতীরঘেঁষা। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশে বেড়ে ওঠা এসব পুরোনো গাছ নদীতীরের মাটি শক্তভাবে আঁকড়ে আছে। বর্ষাকালে নদীরত পানি বাড়লে ঢেউয়ের আঘাত লাগে তীরে। তবে তা প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে পরিণত বয়সের এসব গাছ ও শিকড়ের গাঁথুনি।

স্থানীয়রা বলছেন, এসব গাছ কাটার কারণে স্বাভাবিকভাবেই নদীতীরের মাটি আলগা হয়ে যাবে– যা তীরের অংশকে দুর্বল করে দেবে। ভারী বর্ষণ বা বড় ঢেউয়ের আঘাতে সহজেই ভাঙনের সৃষ্টি হবে। এতদিন তারা নিশ্চিত একটি রক্ষা বলয়ের মাঝে ছিলেন। তবে সম্প্রতি নিবিড় বৃক্ষনিধনের ফলে পুরো এলাকা ভয়াবহ পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক উন্নয়ন বা আধুনিকায়নের নামে পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক সুরক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী গাড়িচালক কামাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তায় গাড়ি চালান। বড় বড় পুরোনো গাছ যাত্রী ও চালকদের ছায়া ও স্বস্তি দিত। নদীতীর ঘেঁষে থাকা এসব গাছ কেটে ফেলায় আগামী বর্ষায় দোয়ারাবাজার অংশে নদীভাঙনের আশঙ্কা বহুগুণ হবে।

নোয়ারাই ইউনিয়নের লক্ষ্মীবাউড় গ্রামের বাসিন্দা, শিক্ষার্থী সুমন আহমেদ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তার পাশের পুরোনো গাছগুলো ছায়া দিত এবং পরিবেশকে সুন্দর রাখত। দেখতেও দারুণ লাগত নদীতীরের দৃশ্য। সড়ক উন্নয়নে এভাবে এতগুলো পুরোনো গাছ কাটার প্রভাব ইতিবাচক হবে না। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হবে।

ছাতক-দোয়ারাবাজার অঞ্চলের স্থানীয় বন কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, গাছগুলো কাটার জন্য আগেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণ কাজে সড়কের পাশের অতিরিক্ত গাছ নিয়ম অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত