সাজু মারছিয়াং, শ্রীমঙ্গল

০২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯:০৮

অবসান হচ্ছে ৮ বছরের প্রতীক্ষার, ২৮ নভেম্বর চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন

দীর্ঘ ৮ বছরের প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে চা বাগানের লক্ষাধিক শ্রমিকদের। ২৮ নভেম্বর হতে যাচ্ছে চা শ্রমিক ইউনিয়নের বহু প্রতিক্ষিত নির্বাচন। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।

নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং-বি-৭৭) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে অনেকটা স্থবির ভাব বিরাজ করছিল ট্রেড ইউনিয়নটির কার্যক্রমে। সবশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন দেশের চা শ্রমিকদের একমাত্র এ ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সংগঠনের গঠনতন্ত্রের নিয়মানুযায়ী তিন বছর অন্তর অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা। কিন্তু উচ্চ আদালতে মামলাসহ নানা কারনে ২০২১ ও ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ চা-শ্রমিকরা শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন-নিবেদন করার পর চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুছ সামাদ আল আজাদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।

নির্বাচন কমিশন গঠনের পরই দেশের বিভিন্ন জেলার চা বাগানগুলোতে উৎসবের আমেজ দেখা দেয়। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ, ভ্যালী কার্যকরী পরিষদ ও পঞ্চায়েত কমিটি প্রাথমিক কার্যকরী পরিষদের সাম্ভাব্য প্রার্থীরা চষে বেড়ানো শুরু করেন নির্বাচনী ময়দান। চা বাগানগুলোতে বইতে শুরু করে নির্বাচনী উৎসবমুখর পরিবেশ।

এরই মধ্যে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিদপ্তরের অধীন গঠিত ‘বাচাশ্রইথ নির্বাচন কমিশন, ২০২৬ এর পক্ষ থেকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুছ সামাদ আল আজাদ স্বাক্ষরিত নির্বাচনী তফসিলে জানানো হয়, আগামী ২৮ নভেম্বর শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনে দেশের ৫টি জেলার ২০টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (নির্বাচনে সহকারী রিটানির্ং অফিসার) কার্যালয় থেকে ৫ ও ৬ নভেম্বর প্রতিদিন সকাল ১০টা হতে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা যাবে।

৫, ৬ ও ৯ নভেম্বর প্রতিদিন সকাল ১০টা হতে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১০ নভেম্বর সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এবং ১১ নভেম্বর সকাল ১০টা হতে বেলা ১টা পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (নির্বাচনে সহকারী রিটানিং অফিসার) কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে। ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে প্যানেল ভিত্তিক খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ১২ নভেম্বর সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাতিলকৃত মনোনয়ন পত্রের উপর আপীল ও শুনানী অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ নভেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করা যাবে। ১৪ নভেম্বর সকাল ১১টায় প্যানেল ভিত্তিক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। একইদিন বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা এবং ১৫ নভেম্বর সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্যানেল ভিত্তিক প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রতিটি চা বাগানের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ সদস্যের পঞ্চায়েত কমিটি; লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম-এ সাতটি ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সভাপতি মন্ডলী ও সম্পাদক মন্ডলীর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ৮ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য এবারের নির্বাচনে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী এবং প্রায় ৬ শতাধিক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশের ২৩১টি চা বাগানের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ চা শ্রমিক নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও বিভাগীয় শ্রম দপ্তর শ্রীমঙ্গলের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন জানান, শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কমিটিকে সভাপতি পদে মাখন লাল কর্মকার ও সাধারণ সম্পাদক পদে রামভজন কৈরী জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে নির্বাচিত সভাপতির অসুস্থ্যতা জনিতকারনে দীর্ঘদিন ধরে সভাপতির দায়িত্ব অলিখিতভাবে পালন করে আসছিলেন সহসভাপতি পংকজ কন্দ। অপরদিকে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করার পর চা-শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। সে সময় থেকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে সহ-সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল। অতি সম্প্রতি সংগঠনের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার দীর্ঘদিন রোগেভুগার পর মৃত্যুবরণ করেন। আগামী নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদে রামভাজন কৈরী, রাজু গোয়ালা ও পঙ্কজ কন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নিপেন পাল ও পরেশ কালিন্দির নেতৃত্বাধীন প্যানেলের নাম শুনা যাচ্ছে।

তফসিল ঘোষণার পরপরই ভ্যালি ও পঞ্চায়েত পর্যায়ের প্রার্থীরাও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

​কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদপ্রার্থী বিজয় বুনারজি বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল এবং এর কমিটিগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।

​ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, শ্রমিকরা এখন কেবল নির্বাচনে জয়ী হতে চায় এমন নেতাদের বদলে তাদের উচ্চ মজুরি ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম নেতাদের নির্বাচিত করতে সংকল্পবদ্ধ। তিনি বলেন, তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, যথাসময়ে বেতন প্রদান, চা শ্রমিকের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।

​ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে ২০১৮ সালে নির্বাচিত কমিটি টানা আট বছর ধরে দায়িত্বে রয়েছে, কারণ ২০২১ ও ২০২৪ সালে নির্ধারিত পরবর্তী নির্বাচনগুলো নানা জটিলতার কারণে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত