২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৯:৪২
সিলেটে থাকাকালীন একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠানে তানভীর
২০১২ সালের শুরু থেকে প্রায় ৯ মাস সিলেটে ছিলেন ঢাকার আজিমপুরে পুলিশি অভিযানের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মহত্যা করা জঙ্গি তানভীর কাদেরি সিপার। পরবর্তীতে ‘আব্দুল করিম’ ও ‘শমসেদ’ এরকম আরও দুটি সাংগঠনিক নামও ছিল তার । জঙ্গিনেতা তামিম আহমেদ চৌধুরি নিহত হবার পর যিনি 'নব্য জেএমবির' সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
সিলেটে থাকাকালীন তিনি মোবাইল ফোন অপারেটর রবিতে উচ্চপদে চাকরি করতেন। তবে ওই সময় তার উগ্রবাদি কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কোন তথ্য মেলেনি।
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা আশিকুর রহমান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তানভীরের সিলেটে থাকার তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে তার ওই সময়কার এক সহকর্মী জানিয়েছেন, তানভীর ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসেই সিলেটে আসেন এবং সেপ্টেম্বর মাসের শেষ কিংবা অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে তিনি রবির ঢাকা অফিসে বদলি হয়ে চলে যান। দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানে চাকরির পর ২০১৪ সালে তিনি ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে যোগ দেন।
ওই সহকর্মী জানান, তানভীর তখন মোটামুটি ধার্মিক ছিলেন কিন্তু কোন উগ্রবাদী চিন্তাধারায় সম্পৃক্ত বলে তাদের মনে হয়নি। বরং তিনি আধুনিক জীবন যাপনই করতেন। ওইসময় স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা উরফে খাদেজা বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেনে চাকরি সূত্রে জমজ দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকাতেই বাস করতেন।
তানভীরের ওই সহকর্মী আরও জানান, ২০১৫ সালের মার্চ মাসের দিকে তার উত্তরার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখতে পান তানভীরের জীবনধারা আমূল বদলে গেছে। চেহারা থেকে পোশাকে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আগে বরাবরই ক্লিন শেভড থাকা তানভীর তখন শশ্রুমন্ডিত । স্ত্রী ফাতেমা বেছে নিয়েছেন বোরকা ও হিজাব। পরে জানা যায় তাদের দুই কিশোরপুত্রকেও একই মতাদর্শে দীক্ষিত করেছেন তারা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে গত ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগরে পুলিশি অভিযানে নিহত জঙ্গি মেজর (অবঃ) জাহিদুল ইসলামও চাকরিসূত্রে বেশ কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করেছেন। 'নব্য জেএমবির' নেতা নিহত তামিম আহমেদ চৌধুরীর বাড়িও সিলেটে।
তানভীরের স্ত্রী ফাতেমাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তা মুহিবুল ইসলাম গত ১৭ সেপ্টেম্বর জানান, জঙ্গি তামিম, মেজর (অবঃ) জাহিদ ও গুলশান হামলাকারী অন্য জঙ্গিদের সাথে তানভীরও গুলশান হামলার আগে বসুন্ধরার একটি বাড়িতে থাকতেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।"
আরও পড়ুন- বসুন্ধরায় সেই গোপন জঙ্গি আস্তানায় তামিমের সাথে থাকত তানভির কাদেরিও
জানা যায়, ২০১৪ সালে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে চাকরি করা অবস্থাতেই সৌদি আরবে হজ পালন করতে যান তানভীর- ফাতেমা দম্পতি। ফিরে এসে তারা দুজনেই চাকরি ছেড়ে দেন। তাদের মানসিকতাতেও আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ‘আল সাকিনা হোম ডেলিভারি সার্ভিস’ নামে এক ব্যবসা শুরু করেন তখনই।
আরও পড়ুন- সিলেটে থাকাকালীন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত ছিল জঙ্গি জাহিদুলের!
তানভীরের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের পশ্চিম বাটিকামারি গ্রামে। তবে তার পূর্ব পুরুষের বাড়ি পাকিস্তানের পেশোয়ারে। তার দাদা প্রয়াত আব্দুল ওয়াহেদ তাবলীগ করতে এসে গাইবান্ধায় ফুলছড়িতে বিয়ে করে বসতি গড়েন। পরে তার বাবা বাতেন কাদেরী বোয়ালি ইউনিয়নে বাড়ি করেন। ১৯৯৪ সালে এসএসসি ও ৯৬ সালে গাইবান্ধাতেই এইচএসসি শেষ করে ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার স্ত্রী ফাতেমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরের একটি বাসায় পুলিশের অভিযানের সময় নিহত হন তানভীর। ওই বাসা থেকে আহত অবস্থায় তিন নারীকে আট করা হয়। যার মধ্যে একজন ফাতেমা। ফাতেমাসহ অন্য দুই নারী অভিযানের সময় পুলিশের চোখে মরিচ ছিটিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। এসময় তাদের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া সন্তান তাহরীন কাদেরিও হামলায় অংশ নেয়। বর্তমানে ওই কিশোর তিন দিনের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে রয়েছে। তবে অপর সন্তানের কোন খোঁজ জানা যায়নি।
অভিযানের পরদিন গত ১১ সেপ্টেম্বর (রোববার) রাতে পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করে লালবাগ থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলার করে পুলিশ। এরমধ্যে নিহত তানভীর কাদেরি ওরফে শমসেদ ওরফে আবদুল করিমের নাম ছিল প্রথমেই। তার সঙ্গে তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা, তাদের ছেলে তাহরীন কাদেরি রাসেল ছাড়াও আসামী করা হয় অপর দুই নারী সন্দেহভাজন জঙ্গি আফরিন ওরফে প্রিয়তী এবং শায়লা আফরিনকেও। এরমধ্যে প্রিয়তী জঙ্গি নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আর শায়লা জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেটের স্ত্রী বলে জানায় পুলিশ।
আপনার মন্তব্য