নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৯:১০

২৫ বছর পর তারাপুর চা বাগানে ‘পূর্ণ বিজয়ের’ আনন্দ

‘একাত্তর সালে আমি তখন সদ্য একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। ১৮ এপ্রিল আমার বাবা, জেঠু, তিন দাদা, বাগানের শ্রমিকসহ ৫১ জনকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। নির্যাতন করা হয় আমার পরিবারের নারীদের। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এই বাগানে আমি ছিলাম অনাহুত। দীর্ঘ ২৫ বছর বাগান ছিলো রাগীব আলীর দখলে। এবছর আদালতের রায়ে আমি বাগানের সেবায়েত নিযুক্ত হয়েছি। দীর্ঘদিন আমার পুরো পরিবারের রক্তের দাগ লেগে থাকা বাগানে বিজয় দিবস উদযাপন করলাম’ -বলছিলেন পঙ্কজ কুমার গুপ্ত।

পঙ্কজ কুমার গুপ্ত; সিলেটের দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগানের সেবায়েত তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছর এই বাগান বিতর্কিত শিল্পপতি রাগীব আলীর কাছ থেকে উদ্ধার করে গত ১৫ মে পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বাগান ফিরে পাওয়ার পর শুক্রবার নানা আয়োজনের মধ্যদিয়ে গণহত্যার স্মৃতি বিজড়িত তারাপুর চা বাগানে বিজয় দিবস উৎসবের আয়োজন করেন পঙ্কজ।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা  চালায় তারাপুর চা বাগানে। বাগান মালিক রাজেন্দ্র কুমার গুপ্ত, তাঁর পরিবারের আরও ৪ সদস্য, চা শ্রমিকসহ শহীদ হন ৫১ জন। ধর্ষিত হন নারীরা। সৌভাগ্যবশত বাগান মালিক পরিবারের মধ্যে একমাত্র পঙ্কজ গুপ্তই বেঁচে যান।

স্বাধীনতার পর এই বাগানে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন পঙ্কজ গুপ্ত। তা এতদিন পড়েছিলো অবহেলা-অযত্নে। শুক্রবার বাংলাদেশের ৪৫ তম বিজয়ের দিনে আবার ফুলে ফুলে ভরে ওঠলো সেই স্মৃতিস্তম্ভ।

পঙ্কজ গুপ্তকে নিয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করতে পেরে খুশি চা শ্রমিকরাও। চা শ্রমিক মনোরঞ্জন দাশ বলেন, আজ আমরা পূর্ণ বিজয়ের আনন্দ অনুভব করছি। বাগানের মূল মালিক, যিনি সপরিবারে এই বাগানে শহীদ হয়েছেন, তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারীকে এই বাগানে ফিরে পেয়েছি। তিনি আবার বাগানের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই শহীদ সন্তানকে নিয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করতে পারছি। এটা আমাদের জন্য খুশি ও গর্বের।

মুক্তিযুদ্ধে বাবা হারানো এই বাগানের এক নারী শ্রমিক বলেন, এতদিন আমাদের দুঃখ বুঝার কেউ ছিলো না। এখন আসল মালিককে পেয়েছি। তিনিও মুক্তিযুদ্ধে তারা বাবা হারিয়েছেন। নিশ্চয়ই এখন আমাদের দুঃখ দূর হবে।

শহীদ স্বজনদের দুঃখ দূর করার আশ্বাসও দিয়েছেন পঙ্কজ কুমার গুপ্তও। শুক্রবার সকালে তারাপুর চা বাগানে আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, তারাপুর চা বাগানের পূর্ণ দায়িত্ব আমি ফিরে পেলে, ক্ষতিপূরণের টাকা ফিরে পেলে সবার আগে শহীদ চা শ্রমিক পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করবো। তাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবো। এসময় বাগানের ভিতরে একটি শহীদ মিনার নির্মাণেরও আশ্বাস দেন পঙ্কজ গুপ্ত। শহীদ চা শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিরও দাবি জানান তিনি।

বিজয় দিবস উপলক্ষে শুক্রবার সকাল থেকেই বাগানের ভেতরের স্মৃতিস্তম্ভে জড়ো হন শ্রমিক-কর্মকর্তারা। পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, পুষ্পস্তবক অর্পণ আর আলোচনা সভার মাধ্যমে এই বাগানে পালিত হয় বিজয় দিবস। সাথে শহীদ সন্তান এই বাগানের সেবায়েত, শ্রমিকদের বাসায় যিনি ‘আসল মালিক’, সেই পঙ্কজ গুপ্তকে বিজয়ের দিনে ফিরে পাওয়া।

উচ্ছ্বসিত ছিলেন পঙ্কজ গুপ্তও। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এই বাগানে আমি ঢুকতেই পারতাম না। বিশেষ দিনগুলোতে বাগানে আসতে চাইতাম। আমার পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে একটু ফুল দিতে চাইতাম। বিশেষ দিনগুলোতে শ্রমিকরাও আমাকে আমন্ত্রণ জানাতো। কিন্তু সবসময় আসতে পারতাম না। বিশেষত সামরিক সরকারগুলোর সময়ে আমি ছিলাম অনেকটা অবাঞ্ছিত। আজ তাই অনেকদিন পর পূর্ণ বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করছি।

উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ তারাপুর চা-বাগান রাগীব আলীর দখল করাকে প্রতারণামূলক আখ্যা দিয়ে পুরো বাগান সেবায়েত পঙ্কজগুপ্তকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

এই নির্দেশনার পর গত ১৫ মে চা-বাগানের বিভিন্ন স্থাপনা ছাড়া ৩২৩ একর ভূমি সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। ২৬ বছর পর রাগীব আলীর দখলমুক্ত হয় তারাপুর চা বাগান। তবে এখনো বাগান দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায়নি। বাগান দখলের দুটি মামলায় রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে বর্তমানে কারাগারে আছেন। মামলা দুটির বিচার কাজ চলছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত