১৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:৫৬
“অকাল বন্যায় দুই মাস আগে বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতি পোষাতে বর্গা নিয়ে এক একর ২০ শতক জমিতে আউশ চাষ করেছিলাম। এবারও সব পানিতে তলিয়ে গেছে। দুই সপ্তাহ ধরে সব জমি পানির নিচে। এতে পানি কমলেও আর ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। একদিকে বাড়িঘর পানিবন্দি; আরেক দিকে দুই দফা ফসল হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছি।”
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হস্তিদুর গ্রামের রাশিদ উল্ল্যাহ পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে কথাগুলো বলছিলেন। একইভাবে উপজেলার গোয়ালাবাজারের গ্রামতলার আবদুল কাইয়ুম ও নুরুল ইসলাম চলতি আউশ ফসল হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। শুধু ওসমানীনগর উপজেলা নয়; সিলেট বিভাগের অন্তত ১২ উপজেলার বিপুল সংখ্যক কৃষক আউশের কাঙ্খিত ফলন না পাওয়ার হুমকিতে পড়েছেন। বীজতলা নিমজ্জিত হওয়ায় আমনের ফলনও বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত এপ্রিলে অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জে অধিকাংশ বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
উজান থেকে নেমে ঢলের পাশাপাশি আর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আসলেও সিলেট বিভাগের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্লাবিত এলাকায় ফসলহানির আশঙ্কায় কৃষকেরা হাহাকার করছেন।
উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টির ফলে গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সিলেট বিভাগের দুই জেলায় অন্তত ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এতে সিলেট জেলায় বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকা এবং কোম্পানীগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও জকিগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ আউশ ফসলের জমি তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলায় বসতবাড়ির পাশাপাশি আউশ ফসল তলিয়ে গেছে। এই সব এলাকায় রোপা আমনের বীজতলাও তলিয়ে যায় বন্যার পানিতে। এদের একজন ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়ার কৃষক আবদুল লতিফ সমকালকে বলেন, বোরো ফসল হারানোর পর ঋণের টাকায় বাড়ির পাশে এক একরের (তিন বিঘা) মত জায়গায় আউশ রোপন করেছিলাম। চলতি বন্যায় এই ফসলও তলিয়ে গেছে বলে জানান দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর পারের এই কৃষক।
চলতি বছর সিলেট বিভাগে সরকারিভাবে এক লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর স্থানীয়ভাবে এক লাখ ৭৬ হেক্টর জমিতে আউশ ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু চলতি বন্যায় লক্ষ্যমাত্রার পুরো ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না কৃষকেরা। দু’মাস আগের বন্যায় এই বিভাগে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৯৫ হেক্টর বোরো ফসল তলিয়ে যায়। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ২৬ হাজার ৭১৫ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ১০ হাজার ২৭৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে ৪৭ হাজার ১৮০ হেক্টর ও সুনামগঞ্জে সর্বোচ্চ ৮১ হাজার ৫২৪ হেক্টর জমির বোরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চলতি বন্যায় সিলেটে মোট ৬৪ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে আউশের ফলন হয়েছে; যার মধ্যে পানিতে নিমজ্জিত চার হাজার ৩৩০ হেক্টর। অন্যদিকে মৌলভীবাজারে ৯৫৬ হেক্টর ও সুনামগঞ্জে ১৪০ হেক্টর আউশ তলিয়ে গেছে। এছাড়া সিলেটে ৩৫ হেক্টর ও মৌলভীবাজারে ১০ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
বৃষ্টিপাতের সঙ্গে পাহাড়ি ঢল কমায় জমির পানি দ্রুত নেমে গেলে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে উল্লেখ করে সিলেটে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মতিলাল হালদার বলেন, কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি কমায় ফসলি জমি থেকে পানি নামছে। দীর্ঘ ১০-১৫ দিন ধরে পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও আউশ ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু কিছু জাতের ধান হয়ত ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তবে সার্বিকভাবে পানি কমে গেলে ধানের তেমন ক্ষতি হবে না বলে আশা করছি।
আপনার মন্তব্য