হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

২৪ মে, ২০১৫ ১৯:০০

মালয়েশিয়াগামী হবিগঞ্জের ২৪ যুবকের খোঁজ নেই

ফাই্ল ছবি: সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চিত্র

সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয়েছে হবিগঞ্জের ২৪ যুবক। তাদের কয়েকজন থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার কারাগারে আটক রয়েছে এমন খবর প্রচার হয়েছে। তবে এখনও তাদের পরিবার নিশ্চিত নয় আদৌ তারা বেঁচে আছে কি-না। কার ভাগ্যে কি ঘটেছে তারও নিশ্চিত খবর কারো জানা নেই। দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও কারো সাথে যোগাযোগও করতে পারছেনা পরিবারের সদস্যরা। এ অবস্থায় তাদের প্রতিটি পরিবারেই এখন শুধুই শোকের মাতম। দুশ্চিন্তায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলকে নিজেদের ব্যবসার জন্য নিরাপদ হিসেবে বেছে নিয়েছে দালাল চক্র। দরিদ্র পরিবারগুলোর সন্তানদের সহজে প্রলোভনে ফেলা সম্ভব বলেই তারা এমন কৌশল অবলম্বন করে। অল্প খরচে বিদেশ গিয়ে অধিক আয় ও উন্নত জীবন-যাপন করার প্রলোভন দেখায় দালাল চক্র। তাদের মিষ্টি কথায় সহজেই বিশ্বাস আনে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো।

এ সুযোগে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ২৪ যুবককে তারা বাগে আনতে সক্ষম হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকেই বিভিন্ন সময় চাপ দিয়ে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে নেয় তারা। এসব দালাল চক্রের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা সীমান্তের টেকেরঘাট গ্রামের আব্দুল গনির ছেলে হিরাই (বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে), বাচ্চু, মঞ্জব আলীর ছেলে মাসুক, আব্দুল আলী, মৃত সুরুজ আলীর ছেলে জিয়া উদ্দিন, আব্দুন নুর ওরফে কন্টই মোল্লার ছেলে আব্দুল কাদির। বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জে রয়েছে শিবপাশার ইউপি মেম্বার আব্দুল আজিজ। নিখোঁজদের মধ্যে বানিয়াচংয়ের ২, আজমিরীগঞ্জের ২ ও চুনারুঘাটের ২০ জনের নিখোঁজের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে সম্প্রতি গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে এসব দালাল গা ঢাকা দেয়। তাদেরও কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা।

হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে অভিভাসন প্রত্যাশী নিখোঁজ যুবকরা হলো গাজীপুর ইউনিয়নের টেকেরঘাট গ্রামের সুলেমান  মিয়ার পুত্র আব্দুল বাছির, সুন্দর আলীর পুত্র জামাল, বাল্লা গ্রামের মরফত উল্লাহ’র পুত্র মতলিব মিয়া, আশরাফ উল্লাহ’র পুত্র সেলু মিয়া, জমির আলীর পুত্র লাভলু মিয়া, গোবরখলা গ্রামের মজিবুর রহমানের পুত্র  মোজাম্মেল হক, খেলু মিয়ার পুত্র গাজীপুর হাই  স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশকৃত রাসেল মিয়া, আঞ্জব আলীর পুত্র গাজীপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ মুকতাজিল, দিলু মিয়ার পুত্র জসিম, দিঘীরপাড় গ্রামের আব্দুল হাই’র পুত্র জসিম, গাজীপুর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের ময়না মিয়া, বড়জুস গ্রামের সাইফুল মিয়া, বানিয়াচং উপজেলার বলাকিপুর গ্রামের আব্দুল কাদিরের পুত্র জমির আলী ও শের আলীর পুত্র সমুজ আলী, বানিয়াচং সদর ৪নং দক্ষিণ পশ্চিম ইউনিয়নের শরীফ উদ্দিন রোডের প্রথমরেখ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বাড়ির রশিদ আহমদের পুত্র মোঃ সাইফুল ইসলাম জুসেদ, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা ইউনিয়নের পশ্চিমভাগের তিনকোশা মহল্লার মোঃ নোমান চৌধুরী ও গোপী চন্দ্র চন্দ।

পুত্রশোকে পাথর চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের দিঘীরপাড় গ্রামের অভিবাসন প্রত্যাশি নিখোঁজ জসিমের পিতা আব্দুল হাই জানান, তার পুত্রকে জিম্মি অবস্থায় রেখে নির্যাতন করে স্থানীয় টেকেরঘাট গ্রামের দালাল বাচ্চু ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। ইতিমধ্যেই তারা ৫ লাখ টাকা আদায় করে নিয়েছে। তিনি সর্বস্ব বিক্রি করে এসব টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও সন্তানের কোন খোঁজ না পেয়ে তিনি এখন পাগলপ্রায়।

আরেক নিখোঁজ যুবক আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা ইউনিয়নের পশ্চিমভাগের তিনকোশা মহল্লার মৃত নিহার মনির চৌধুরীর ছেলে নোমান চৌধুরী। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার বড়। পিতার মৃত্যুর পর সে স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করে পরিবার চালাতো। সম্প্রতি দালালদের মাধ্যমে কম খরচে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব পায়। সাথে সাথেই সে সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশ গিয়ে পরিবারের আরও উন্নতি করবে। আরও বেশী টাকা রোজগার করবে। এমন চিন্তা থেকেই তার নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিন্তু প্রায় ২ মাস অতিবাহিত হলেও তার ভাগ্যে কি ঘটেছে তা তার পরিবার জানেনা। একদিনও তার সাথে পরিবারের যোগাযোগ হয়নি। এ কথা জানিয়েছেন তার ছোট ভাই উমান চৌধুরী। তিনি বলেন, পশ্চিমভাগের গোপী চন্দ্র চন্দ ও নোমান ভাই মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ৫৩ দিন পূর্বে রওয়ানা হয়। তারা এখন হয়তো সাগরে জাহাজে অথবা নৌকায় আটক রয়েছে। পশ্চিমভাগের অলিউরও তাদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিল। সেখান থেকে কৌশলে সে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। আজ পর্যন্ত তার ভাইয়ের কোন খোঁজ পাননি। দালালের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছেনা। ভাই না থাকায় নিজেরা মারাত্মক অর্থকষ্টে পড়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

আরেক নিখোঁজ বানিয়াচং উপজেলা সদরের শরীফ উদ্দিন রোডের রশিদ আহমদের ছেলে সাইফুল ইসলাম জুসেদ (২৭)। শোকে পাথর বাবা রশিদ আহমদ জানান, প্রাপ্ত বয়স হওয়ার পর থেকেই সংসারের ঘাণি টানা শুরু করে। আড়াই তিন বছর পূর্বে সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা কিনে নিজে দিন-রাত চালিয়ে দেড় দু’হাজার টাকা আয় করে। প্রতিদিনের আয় পিতা-মাতার কাছে জমা দিত। ১ সন্তানের বাবা জুসেদ কোন দিন স্ত্রী শামীমা আক্তারের কাছে আয়ের টাকা দেয়নি। সুখি পরিবার হলেও সোনার হরিণ পাওয়ার নেশা তার মাথায় চড়ে। অটোরিকশা চালাতে গিয়ে মানব পাচারকারী দলের সদস্যদের খপ্পড়ে পড়ে জুসেদ। তাদের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে কাউকে না জানিয়ে ১ এপ্রিল বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। ৭ মে জুসেদের বাবাকে জানানো হয় তার ছেলে মালয়েশিয়ার বর্ডারে আছে। ০০৬৬৮০৫৩৯১৪৮৯৩ ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করলে জুসেদকে পাবেন। সে অনুযায়ী তিনি ওই নাম্বারে ফোন করে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তখন জুসেদ জানায়, তারা থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বর্ডারে অমানবিক কষ্টে জাহাজে আছে। শিবপাশা ইউপি’র রহমত আলীর ছেলে মেম্বার আব্দুল আজিজ ও আলী আকবরের ছেলে মকবুল আলী’র মাধ্যমে উদ্ধারের জন্য আকুতি জানায় সে। আজিজ ও মকবুলের নিকট বারবার ধর্ণা দিয়েও ছেলেকে উদ্ধারের কোন কুলকিনারা না পেয়ে তারা এখন পীর ফকিরের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

চুনারুঘাটের দালাল হিরাই ও বাচ্চু মিয়ার মা রহিমা খাতুনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কিভাবে তারা বিদেশ গেছে সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। তাদের সাথে তার কখনোই দেখা হয় না। এমনকি তারা বাড়িতেও আসে না। বানিয়াচংয়ের ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী জানান, তার এলাকা ও আজমিরীগঞ্জে শিবপাশার ইউপি মেম্বার আব্দুল আজিজ দালাল চক্রের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। এসব দালাল চক্রের সদস্যদের বিচার দাবি করেন তিনি। গাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা তাজুল ইসলাম জানান, নিখোঁজ যুবকদের দেশে ফিরিয়ে আনা, তাদের টাকা উদ্ধার ও দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি উদ্যোগ নেবেন।

চুনারুঘাট থানার ওসি অমূল্য কুমার চৌধুরী বলেন, রোববার উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেছেন তার ইউনিয়নে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে তাদের কি অবস্থা তিনি জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, সভায় আমি বলেছি নির্দিষ্ট করে যদি কেউ অভিযোগ দেয় তবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত