রিপন দে, মৌলভীবাজার

০৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ ১৮:৩৩

হারিয়ে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপত্য শিল্পসমূহ

সবুজের চাদরে ঢাকা মৌলভীবাজার এক ঐতিহাসিক চারণভূমি। শত শত বছরের পরিক্রমায় ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক নিদর্শন, স্থাপত্য শিল্প, পুরাকীর্তি ও প্রত্নতত্ত্ব। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই অমূল্য সম্পদের প্রতি অবহেলা আর সুষ্ঠ রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সংস্কারের অভাবে মৌলভীবাজারে এগুলোর কোনটির আংশিক এবং অনেকটি কালের বিবর্তনে একেবারে বিলীন হতে চলেছে।

মৌলভীবাজারের ইতিহাসের সাক্ষী ঐতিহ্যের বাহক এসব পুরাকীর্তি ও নিদর্শনের নামফলক কিংবা সংক্ষিপ্ত পরিচয় উধাও হয়ে গেছে সময়ের পরিক্রমায়। ফলে গবেষক, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং পর্যটকরা এসব প্রাচীন নিদর্শন সমূহের সঠিক ইতিহাস জানতে হিমশিম খাচ্ছেন। পুরাকীর্তিগুলোর যেগুলো বর্তমান আছে তাও লুপ্ত হতে চলেছে। যে কারণে বর্তমান প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে ইতিহাস ঐতিহ্য জানা থেকে। অনেক ক্ষেত্রে পুরাকীর্তির গুরত্ব উপলব্ধি না করে ধংস করা হচ্ছে এবং কখনো কখনো তা চুরি হয়ে যাচ্ছে। এসব ঐতিহাসিক সম্পদের সংরক্ষণ না করে কর্তৃপক্ষ কোথাও কোথাও নাম সর্বস্ব সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখে দায়িত্ব শেষ করছেন বলে সচেতন মহল অভিযোগ করেন।

মৌলভীবাজার জেলার যেসব পুরাকীর্তি, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থান এখন ধংসের দ্বারপ্রান্তে সেগুলো হচ্ছে, আসামের ইস্টার্নগেট নামে পরিচিত কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন, কামরুপ রাজ ভগদত্তের উপ-রাজধানী দিনারপুর ভগ্নাবশেষ (কাগাবলা), পিটিআইয়ের ভূগর্ভস্থ ব্যাংকার যেখানে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর টর্চার সেল ও বধ্যভূমি, শাহবন্দর বধ্যভূমি, উলুয়াইলের পালতোলা জাহাজের ভাসমান মান্ডল, সৈয়ারপুরের প্রাচীন মন্দির, গয়ঘরের খোজার খোলা মসজিদ, তৎসংলগ্ন দীঘি, ঘড়, দুর্গ ও বিবির মাজার, জগৎসী শ্রী শ্রী দোলগোবিন্দ জিউর আখড়া, মনু নদীর তীরে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের জাহাজঘাট, মনুমুখ পাটবন্দর, রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগে দুই শতাধিক বছরের পুরনো শ্রী চক্রবর্তী বাড়ির মন্দির ও বিগ্রহ, শতাধিক বছরের প্রাচীন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, একই এলাকায় সিংহবাড়ীর শিব মন্দির, কমলা রাণীর দীঘি ও রাজা সুবিদ নারায়ণের পরিবারবর্গের সমাধিস্থল, তারাপাশা শতাব্দী প্রাচীন বিষ্ণুপদ ধাম, মনসুরনগর দেওয়ান বাড়ির দীঘি, চৌধুরী বাজারের প্রাচীন মন্দির, টেংরা দেওয়ান বাড়ির দীঘি, পাঁচগাঁও বাংলা সংবাদপত্রের আদি পুরুষ গৌর শংকর ভট্টাচার্যের বাড়ি, ঐতিহাসিক কালো ঝম ঝম ও জাহান কোষা কামানের নির্মাতা জনার্দন কর্মকারের বাড়ি, রাজা সুবিদ নারায়ণের রাজবাড়ি, ১৯৭১ সালে শহীদদের গণকবর, পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে কোদালী দীঘি, কুলাউড়া উপজেলার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তীর্থস্থান রঙ্গিরকূল আশ্রম (বর্তমান ইসকন মন্দির), ভাটেরা টিলার প্রাচীন তাম্রফলক, নন্দনগড়ের সতীদাহ মন্দির, ইরানের শাহানশাহ রেজা শাহ পাহলভীর আগমন উপলক্ষে লংলা রেলস্টেশনে নির্মিত সুরম্য তোরণ, বড়লেখার শাহবাজপুরে মুঘল আমলের সালেগড় দুর্গ, মাধবকুণ্ড ও তৎসংলগ্ন শিব মন্দির, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪’শ বছরের পুরনো শ্রী শ্রী নির্মাই শিববাড়ী, কালপুরের প্রাচীন তাম্রফলক, কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর লেক, সমশেরনগরে ব্রিটিশ নির্মিত বিমানবন্দর ও তৎসংলগ্ন বধ্যভূমি, পতনউষা দুর্গসহ মুঘল, নবাবী, বৃটিশ ও পাকিস্তানি আমলে নির্মিত বিভিন্ন পুরাকীর্তি।

এসব পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থান ধীরে ধীরে সংস্কারের অভাব, অযত্ন আর অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হতে চলছে। এগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেই কারো কাছে।

সরকারি ও বেসরকারি কোন মহলই এ ব্যাপারে আন্তরিক নয়। এসব ঐতিহাসিক স্থান ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা অতীত ঐতিহ্যের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাতে সুরক্ষিত হবে মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক পরিমণ্ডল। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুগে যুগে সহজে জানতে পারবে দেশ মাতৃকার অতীত সম্পর্কে এ অভিমত ব্যক্ত করেন অনেকে।

লেখক ও সাহিত্যিক মহিদুর রহমান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপত্য শিল্প, নিদর্শন পুরাকীর্তি অত্র এলাকার তৎসময়ের সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহ্যের স্মারক বহন করে। তাই এগুলোর সংরক্ষণ পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসা জরুরী।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যেগুলা সরকারি জায়গায় সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে তবে যেগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন তার খবর তিনি এই মুহূর্তে জানেন না। খোঁজ নিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপত্য শিল্প, পুরাকীর্তি ও প্রত্নতত্ত্বের সুষ্ঠ সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের করা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত