প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-১৩ ১৬:১৩:৫৬
আপডেট: ২০২৬-০৮-১৩ ১৬:২০:২৩
নিরঞ্জন দে:
“তোমারে হেরিয়া মিটেছিল ঋষিকবি দেখিবার আশ
তুমি এসেছিলে একসাথে ব্যাস বাল্মীকি কালিদাস।”
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ, অর্থাৎ ৭ আগস্ট ১৯৪১, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলা গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ তখন শুধু বাংলা সাহিত্যের কবি নন; তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর প্রয়াণ যেন একটি যুগের অবসান।
নজরুলও এই সংবাদে গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়েপড়েন। কবিগুরুর সাথে নজরুলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত স্নেহ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। বয়সের ব্যবধানটিও ছিল চল্লিশ বছরের কাছাকাছি। তাঁদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা, ও স্মৃতি রয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নজরুলের কাছে নিছক একজন প্রবীণ কবির মৃত্যু ছিল না এ ছিল তাঁর সাহিত্যজীবনের এক গভীর আশ্রয়, অনুপ্রেরণা ও শ্রদ্ধার ব্যক্তিত্বের মহাপ্রস্থান। সেই শোক-বিহ্বল চিত্তে কবি নজরুল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রচনা করেন কবিতা ‘রবিহারা’ । এরপর আরও লিখেন ‘সালাম অস্তরবি’ এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ নামক কবিতা।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দিন কবির শবযাত্রার আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে কবি নজরুলের নিজকণ্ঠে ধারাবিবরণী প্রচারিত হয়। ঘটনাটির অত্যন্ত আবেগময় একটি দিক রয়েছে। একদিকে কলকাতার রাস্তায় তখন হাজার হাজার মানুষ তাঁদের প্রিয় কবির শেষযাত্রায় শামিল। অন্যদিকে বেতারের তরঙ্গে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের বর্ণনা পৌঁছে যাচ্ছিল অসংখ্য মানুষের ঘরে। আর সেই বর্ণনাকারী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের অনুজপ্রতিম কবি, যিনি তাঁর প্রয়াণে নিজেই শোকে মুহ্যমান। এই শোকপর্বে রচিত ‘রবিহারা’ কবিতাটি আকাশবাণী কোলকাতায় স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেন কবি নজরুল। তৎকালীন বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ডও করা হয়। এই ঘটনাটির একটি আদর্শিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রার সঙ্গে নজরুলের কণ্ঠের এই যোগ বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
বিদ্রোহী কবি, প্রেম ও সাম্যচেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘রবিহারা’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গভীর ও মর্মস্পর্শী শোককবিতা। কিন্তু একে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রচিত একটি শোকগাথা হিসেবে পাঠ করলে কবিতাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। এই কবিতাটিতে ব্যবহৃত রূপক ও শব্দের ভাবসম্পদ এক অনুপম দৃষ্টান্ত আমাদের সংস্কৃতি ও চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে।
‘রবিহারা’ একদিকে যেমন একজন মহাকবির প্রয়াণে আরেক কবির হৃদয়বিদারক শোকের প্রকাশ, অন্যদিকে এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভাগ্যবিড়ম্বনার আশংকা, একটি সভ্যতার আলোকবর্তিকা নিভে যাওয়ার আক্ষেপ। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু এখানে একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; তাঁর প্রয়াণকে নজরুল এমন এক মহাজাগতিক ঘটনা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যার অভিঘাত বাংলা, ভারত, প্রকৃতি এবং মানবমনের সর্বস্তরে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘রবিহারা’ নামটির মধ্যেই কবিতাটির সমগ্র ভাবদর্শনের একটি গভীর সংকেত নিহিত আছে। নজরুল যে ‘রবি’কে হারিয়ে হাহাকার করছেন তাঁর কাছে তিনি আকাশের রবিসম। ‘রবিহারা’ বলতে কেবল রবীন্দ্রনাথকে হারানো নয়; নজরুলের ভাষায় জাতির আলোকহারা হওয়া, আশাহারা হওয়া, দিশাহারা হওয়া এবং আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের একটি প্রধান উৎসকে হারানো। রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল একজন কবি নন; তিনি সূর্যের মতো আলোদাতা, প্রদীপের মতো পথপ্রদর্শক, সুউচ্চ বনস্পতির মতো ছায়া ও আশ্রয়দাতা এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক বিশাল প্রতীক। এই দ্ব্যর্থবোধক নামকরণ করেই কবিতাটিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছেন কবি নজরুল। । ‘রবি’ নামের ব্যক্তিমানুষ এবং ‘রবি’ নামের মহাকাশের সূর্য একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে কবিতার শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু একজন ব্যক্তির জীবনের ঘটনা থেকে মহাজাগতিক প্রতীকে উন্নীত হয়েছে।
কবিতার সূচনাতেই প্রতীকী নির্মাণটি সুস্পষ্ট:
“দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত-পথের কোলে
শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে
উদাস গগন-তলে।”
জীবন সায়াহ্নে উপনীত কবি রবিকে নজরুল কিন্তু অস্তগামী রবি বলেননি। বলেছেন দুপুরের রবি। দুপুরের রবি বা সূর্য থাকেন মধ্য গগনে, মাথার উপরে। উজ্জ্বল আলোকপ্রভায় তেজদীপ্ত। এই রবি সকল শক্তির মূল উৎস, আলোর প্রধান উৎস, জীবনশক্তি এবং জ্ঞানের প্রতীক। আমরা যে সৌরজগতে পৃথিবী নামক নীলগ্রহের বাসিন্দা সেই সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে রবি বা সূর্যের অবস্থান। নজরুলের রবি কবিও বাংলা ও বাঙালির বৃহৎ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। কিন্তু নজরুলের আক্ষেপ এবং কল্পনা- সেই মধ্যাহ্নসূর্য অস্তপথে ঢলে পড়েছেন। এই সূর্যাস্ত প্রতিদিনের চেনা প্রকৃতির দৃশ্য নয়; এটি রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসানের মহৎ রূপক। যে আলো এতদিন বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চেতনাকে আলোকিত করেছে, পথ দেখিয়েছে, চেতনায় উষ্ণতা ও উত্তাপ ছড়িয়েছে সেই আলোর রবি যেন অস্তগামী। তার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে জমেছে শ্রাবণের মেঘ। তারা দলে দলে ছুটে আসছে। প্রকৃতির এই দৃশ্যটি আসলে কবির অন্তরের গভীর শোকের প্রকাশ -যা শ্রাবণের ধারার মতো ঝরে পড়ছে। অগণিত মানুষের চোখের জল এখানে মেঘ হয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। রবি কবির বিদায়বেলা যেন প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতির মধ্যে কোনো বিভাজন নেই; উভয়েই একই শোকের অংশীদার। এই প্রকৃতিচিত্রের মধ্য দিয়ে নজরুল রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুকে ব্যক্তিগত শোকের সীমা অতিক্রম করিয়ে সর্বজনের এবং মহাপ্রকৃতির শোকে পরিণত করেছেন। ‘উদাস গগন’, ‘শ্রাবণের মেঘ’, ‘অস্তগামী রবি’ - সবকিছু যেন একটি বৃহৎ শোকবিদুর দৃশ্যপট রচনা করেছে।
নজরুল বলছেন:
“বিশ্বের রবি, ভারতের কবি,
শ্যাম-বাংলার হৃদয়ের ছবি
তুমি চলে যাবে বলে।”
এই তিনটি পঙক্তিতে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়ের একটি অসাধারণ ত্রিস্তর নির্মিত হয়েছে - বিশ্ব, ভারত এবং শ্যামল বাংলা। তিনি বিশ্বকবি, তিনি ‘বিশ্বের রবি’, কারণ তাঁর সৃষ্টির পরিধি কোনো জাতীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। কবির ভূগোল নেই, কাঁটাতার নেই, সীমারেখা নেই। বিশ্বকবি বিশ্ব-মানবসমাজের প্রতিনিধি, বিশ্বনাগরিক। তাই তিনি বিশ্বের রবি, ঠিক সূর্যের মতো যাকে কোনো প্রাচীর বা সীমারেখা দিয়ে ভাগ করা যায়না। বিশ্বসভ্যতার যাকিছু মহান ধনরাশি তা থেকেই কবি মুঠি মুঠি কুড়িয়ে নিয়েছেন। মানবসভ্যতার সম্ভাবনা ও সংকট নিয়ে গভীর ভাবে ভেবেছেন। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র সহ সমগ্র সৃষ্টিতে সে ভাবনার চিত্র প্রতিবিম্বিত হয়ে আমাদের চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি বিশ্বসভায় সম্মানিত হয়েছেন। দেশে দেশে বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। আবার তিনি ‘ভারতের কবি’ - কারণ তাঁর সৃষ্টিতে ভারতীয় সভ্যতা, দর্শন, প্রকৃতি ও মানুষের বহুমাত্রিক জীবন প্রতিফলিত হয়েছে। ভারতের বৈচিত্র্যময় ও ঋদ্ধ সংস্কৃতি, সভ্যতা, সুর-তাল-ছন্দ, জাতির বোধির উৎসে যে উন্নত চিন্তা ও চেতনা তার সুধারসে মাতোয়ারা হয়েছিলেন কবি। আবার তিনি ‘শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি’, কারণ তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে অন্তরঙ্গ এবং আবেগময় উৎস ছিল কাদামাটির বাংলা, বৃষ্টিস্নাত বাংলা, সবুজ শ্যামল বাংলা, তেরোশত নদীর বাংলা ও বাংলার মানুষ, বাউলের বাংলা। রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত তিনটি পরিচয় পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরকে পরিপূর্ণ করে, ষোলআনা সার্থক করে তোলে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীনতা তাঁর বাঙালিত্বকে অতিক্রম করে অর্জিত কোনো পরিচয় নয়; বরং তাঁর গভীর বাঙালিত্ব থেকেই তাঁর বিশ্বমানবিকতা বিকশিত হয়েছে।
‘শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি’ এই চিত্রকল্পের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলার সম্পর্কের গভীরতা নিহিত। তিনি বাংলার কেবল ভাষার কবি নন; তিনি বাংলার শ্যামঘন প্রকৃতি, ঋতুবৈচিত্র, নদী, মাটি, বৃষ্টি, কৃষক, গ্রাম, নগর, প্রেম, বেদনা, আনন্দ, আকাশ ও মানুষের কবি। বিপদে সম্পদে উৎসবে রবীন্দ্রনাথ গভীর দৃষ্টিতে বাংলাকে দেখেছেন, অনুভব করেছেন। আবার, তাঁর মধ্যেও বাংলা নিজেকে দেখেছে এবং তাঁর মাধ্যমে বাংলা নিজেকে বিশ্বসভায় পরিচিত করেছে। ফলে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু বাঙালির কাছে অনেকাংশে নিজের একটি অংশ হারানোর মতো। নজরুলের শোকের তীব্রতা এখানেই তিনি একজন কবিকে হারানোর কথা বলছেন না; তিনি বলছেন, বাংলা তার নিজের হৃদয়ের অংশ হারিয়েছে, একটি প্রতিকৃতি হারিয়েছে।
এই শোক আরও গভীর হয়ে ওঠে যখন নজরুল বলেন:
“তব ধরিত্রী মাতার রোদন তুমি শুনেছিলে নাকি,
তাই কি রোগের ছলনা করিয়া মেলিলে না আর আঁখি?”
এখানে ‘ধরিত্রী মাতা’ একটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ রূপক। পৃথিবী এখানে একটি গ্রহ নয়; পৃথিবী মা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে ও কবিতায় দেশ, মাটি, পৃথিবীকে মা বলে আখ্যায়িত করেছেন। ‘জননী বসুন্ধরা’ বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে এটি বিরল নয়। নজরুল তাই বলেছেন ‘ধরিত্রী মাতা’। সেই মায়ের কান্না শুনেই যেন রবি কবি চিরনিদ্রায় চলে গেছেন। এমন প্রশ্ন সমাজে প্রচলিত চিরন্তনী শোকের ভাষা। মানুষ যখন প্রিয়জনকে হারায়, তখন সে যুক্তি মানে না, মৃত মানুষের কাছেই প্রশ্ন করে কেন গেলে? কেন ফিরলে না? নজরুলও সেই মানবিক প্রবণতাকে কবিতায় শিল্পরূপ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রশ্নের পরিসর আরও বৃহৎ। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে শুধু মানুষ নয়, ধরিত্রী মাতা নিজেও কাঁদছেন।
এর পরেই আসে কবিতার অন্যতম শক্তিশালী চিত্রকল্প:
“আজ বাংলার নাড়িতে নাড়িতে
বেদনা উঠেছে জাগি’;
কাঁদিছে সাগর নদী অরণ্য,
হে কবি, তোমার লাগি’।”
এখানে বাংলা শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; বাংলা একটি জীবন্ত শরীর। তার ‘নাড়ি’ আছে, তার হৃৎস্পন্দন আছে, তার ব্যথা আছে। ‘বাংলার নাড়িতে নাড়িতে বেদনা’ - এই রূপকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা প্রকাশ পেয়েছে। একজন মানুষের মৃত্যুতে কোনো দেশের ভূগোল বদলে যায় না; কিন্তু জাতির সাংস্কৃতিক সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নজরুল সেই সাংস্কৃতিক ক্ষতকে শারীরিক ব্যথার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারপর শোকের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে সাগর, নদী, অরণ্যও কাঁদছে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে সমগ্র প্রকৃতি যেন তার এক প্রিয় সঙ্গীকে হারিয়েছে। এই কাঁদতে দেখার বিষয়টিও অসাধারণ। অন্তরের যোগ না থাকলে চর্মচোখে তা দেখা যায়না। শোকের এই বিস্তৃতির মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান কাব্যিক গতি লক্ষ করা যায়। প্রথমে একজন মানুষের শোক, তারপর বাংলার শোক, তারপর নদী-সাগর-অরণ্যের শোক, শেষে সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির শোক। ব্যক্তিগত অনুভূতি ক্রমে মহাজাগতিক অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার উৎসকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নজরুল যে পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক প্রতীকসমূহ ব্যবহার করেছেন, তাতে কবিতাটি গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে।
“তব রসায়িত রসনায় ছিল নিত্য যে বেদ-বতী
তোমার লেখনী ধরিয়াছিলেন যে মহা সরস্বতী,
তোমার ধ্যানের আসনে ছিলেন যে শিব-সুন্দর,
তোমার হৃদয়-কুঞ্জে খেলিত যে মদন-মনোহর,
যেই আনন্দময়ী তব সাথে নিত্য কহিত কথা...”
এই অংশে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশক্তিকে বিভিন্ন ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সরস্বতী এখানে বিদ্যা ও সৃষ্টিশক্তির প্রতীক; শিব- সত্য, নিত্য, সুন্দর, চিরন্তন মহত্ত্ব ও সৌন্দর্যের প্রতীক; মদন-মনোহর প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক; আনন্দময়ী সৃষ্টির আনন্দ ও মাতৃশক্তির প্রতীক। লক্ষণীয়, নজরুল এই প্রতীকগুলো ব্যবহার করছেন কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণ দৃষ্টি থেকে নয়; বরং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে ভারতীয় সভ্যতার বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য।
এই অংশটি নজরুলের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনারও এক অসাধারণ নিদর্শন। কবি নজরুলের জন্মসূত্রে লাভকরা ধর্মপরিচয় ভিন্ন, কিন্তু তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশক্তির ব্যাখ্যায় সরস্বতী, শিব, মদন-মনোহর ও আনন্দময়ীর মতো প্রতীক ব্যবহার করেন, তখন তিনি মূলত ঘোষণা করেন যে বাংলা সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ের সম্পত্তি নয়। তার পৌরাণিক স্মৃতি, নান্দনিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক কল্পনা এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্মিলিতভাবে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করেছে। রবীন্দ্রনাথ সেই উত্তরাধিকারের এক মহত্তম প্রকাশ; নজরুল তাঁর উত্তরাধিকারকে নিজের কণ্ঠে পুনরুচ্চারণ করছেন মাত্র। ‘সরস্বতী’ রূপকটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের লেখকসত্তার একটি বিশেষ মূল্যায়ন রয়েছে। নজরুল যেন বলতে চান, রবীন্দ্রনাথের লেখনী কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভার ফল নয়; তাঁর কলমের মধ্যে কোনো ঐশী সৃষ্টিশক্তির অধিষ্ঠান। তাঁর রসায়িত রসনায় যেন জ্ঞানের প্রবাহ বহমান। বেদ অর্থ জ্ঞান। ‘বেদ-বতী’ বলতে নজরুল সুপ্রাচীন ভারতের প্রজ্ঞার ধারাকেই বুঝিয়েছেন- যা রবি কবির সৃজনসত্তাকে রসায়িত করেছে, প্রেরণা যুগিয়েছে। প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের প্রবহমান ধারাকে স্রোতস্বিনী নদী হিসেবে নজরুল কল্পনা করেছেন। নদীকে যেহেতু ভারতীয় সভ্যতায় নারী বা মাতা বা দেবী হিসেবেই দেখা হয় তাই কবি নজরুল জ্ঞানের নদীকে দেবী হিসেবে এখানে বেদবতী আখ্যায়িত করেছেন। বেদবতী বাগদেবী সরস্বতী যেন তাঁর কলম ধরে আছেন বিগলিত করুণায়। তাঁর কবিতা তাই কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; তা সৃষ্টির বিপুল বিচিত্র বৈভবের প্রকাশ। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে নজরুল বলেন:
“তুমি যে ছিলে এ বাংলার আশা প্রদীপ অনির্বাণ।”
‘আশা প্রদীপ’ একটি রূপক। প্রদীপ আশার আলো দেয়, অন্ধকার দূর করে, সম্ভাবনার পথ দেখায়। ‘আশা’ মানুষের ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার এমনই এক প্রদীপ। যে শিখা ‘অনির্বাণ’, কখনো নির্বাপিত হয়না। তাই রবীন্দ্রনাথ অমর অক্ষয়। এই রূপকের গভীরতা অনুরাগী মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। নজরুলের আক্ষেপ - যে আলো নিভে যাওয়ার কথা নয়। অথচ কবির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই অনির্বাণ প্রদীপের চারপাশে যেন অন্ধকার নেমে এসেছে। আবার, রবি কবিকে নজরুল গৌরবের মহিমায় ধারণ করেছেন এবং বাঙালির কাছে রবির অবস্থান তুলে ধরেছেন-
“তোমার গরবে গরব করেছি, ধরার ভেবেছি সরা;
ভুলিয়া গিয়াছি ক্লৈব্য, দীনতা উপবাস ক্ষুধা জরা।”
এই পঙক্তিগুলোতে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার এক গভীর মনস্তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা নিষ্পেষিত , অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে পরাধীন একটি জাতি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বখ্যাতিতে নিজের সাংস্কৃতিক শক্তির প্রমাণ পেয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও বাংলা ভাষায় এমন একজন কবির জন্ম হয়েছে, যিনি বিশ্বসভায় বাংলাকে পরিচিত করেছেন এই সত্য বাঙালির আত্মসম্মানকে উজ্জীবিত করেছে। তাই নজরুলের ভাষায়- রবীন্দ্রনাথের গৌরবে বাঙালি নিজের দীনতা, ক্ষুধা, জরা ও দুর্বলতাকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকতে পেরেছে।
এখানে রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্যিক নন; তিনি একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীকী অবয়ব। তাঁর নোবেল পুরস্কার, বিশ্বপরিচিতি কিংবা সাহিত্যিক মহিমা বাঙালির কাছে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; তা ছিল বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিরও বিশ্বস্বীকৃতি। তাই তাঁর মৃত্যুতে বাঙালির মনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা ব্যক্তিগত শোকের তুলনায় অনেক বৃহৎ।
‘রবিহারা’ কবিতাটির অন্যতম হৃদয়বিদারক প্রশ্ন:
“এত ভালোবাসিতে যে তুমি এ ভারতে ও বাংলায়,
কোন অভিমানে তাঁদের আঁধারে ফেলে রেখে গেলে, হায়।”
এখানে ‘অভিমান’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মৃত্যু স্বাভাবিক জৈবিক পরিণতি হলেও শোকাহত মানুষের কাছে তা কখনোই স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। প্রিয় মানুষ চলে গেলে মনে হয়, সে যেন অভিমান করে চলে গেছে। নজরুল সেই মানবিক অনুভূতিকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে ‘আঁধারে ফেলে যাওয়া’ আবার সেই কেন্দ্রীয় ‘রবি’ রূপককে ফিরিয়ে আনে। রবীন্দ্রনাথ চলে গেছেন মানে আলো চলে গেছে, আর বাংলা অন্ধকারে পড়েছে। বাংলায় সূর্য নেই। এই আলো-অন্ধকারের রূপকটি সমগ্র কবিতার অন্যতম প্রধান নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তি। সূর্য ও অন্ধকার, আলো ও মেঘ, আশা ও নিরাশা, জীবন ও মৃত্যু, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি এই সমস্ত দ্বন্দ্ব পরস্পরের মধ্যে কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথ যত বড় আলো, তাঁর অনুপস্থিতির অন্ধকারও তত গভীর হবে বলে কবি নজরুলের আক্ষেপ।
কবিতার আরেকটি অসাধারণ রূপক হলো:
“বল-দর্পীর মাথার উপরে চরণ রাখিয়া আর
রক্ষা করিবে কে এই দুর্বলের সে অহংকার?”
এখানে রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর উপস্থিতি যেন দুর্বল বাঙালির মাথার উপর এক ধরনের নৈতিক শক্তি। ‘বল-দর্পী’দের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ ক্ষমতাশালী ও অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষায় রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক মহিমা ছিল এক প্রতীকী অস্ত্র। তাঁর মৃত্যুতে সেই আশ্রয়ের অভাব অনুভূত হচ্ছে।
এখানে নজরুলের নিজের বিদ্রোহী সত্তার সঙ্গেও একটি গভীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। নজরুল ছিলেন অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কবি; রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবমুক্তি ও নৈতিক স্বাধীনতার কবি। “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির” এমন দীক্ষা দিয়ে মানুষ পরিচয়ে বুকবেঁধে দাঁড়াতে বলেন যে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অবলম্বন করেই বলদর্পী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পায় বাংলার রবীন্দ্র-অনুরাগী মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনেই মানবতার প্রশ্নে এক ও অভিন্ন। তাঁদের প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও দুজনেরই গভীরে ছিল মানুষের মর্যাদার প্রতি অঙ্গীকার। তাই রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে নজরুলের শোকের মধ্যে ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি একটি বৃহত্তর নৈতিক শূন্যতার অনুভূতিও রয়েছে।
“আশ্বাস দাও, হে পরম প্রিয় কবি, আমাদের প্রাণে,
ফিরিয়া আসিবে নব রূপ লয়ে আবার মোদের টানে।”
এখানে মৃত্যুকে ডিঙিয়ে অমরত্বের দিকে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে চলেছেন। দেহ নিয়ে ফিরবেন না; কিন্তু তিনি ‘নব রূপ’ নিয়ে ফিরে আসবেন। তিনি ফিরে আসবেন তাঁর কবিতায়, গানে, নাটকে, দর্শনে, মানবতাবাদে, বাংলার উৎসবে পার্বণে নবান্নে- প্রকৃতিচেতনায় এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন উদযাপনে। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যখন রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করবে, গাইবে, আবৃত্তি করবে, নতুনভাবে ব্যাখ্যা করবে, তখন তিনি নতুন রূপে ফিরে আসবেন। তাই তিনি হবেন অমর অক্ষয়। সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃত প্রত্যাবর্তন এইভাবেই ঘটে।
আরেকটি চমৎকার রূপকের বিস্তার দেখা যায়:
“ভু-ভারত জুড়ে হিংসা করেছে এই বাংলার তরে
আকাশের রবি কেমনে আসিল বাংলার কুঁড়ে ঘরে।”
‘বাংলার কুঁড়েঘর’ এবং ‘আকাশের রবি’ - এই দুটি চিত্রের প্রয়োগ অসাধারণ। একদিকে উপনিবেশিক জাঁতাকলে নিষ্পেষিত, দরিদ্র, অবহেলিত বাংলা; অন্যদিকে আকাশব্যাপী সূর্যের মতো এক মহামানব। নজরুল বিস্ময়ে অভিভূত - এত ক্ষুদ্র, দীন ও নিপীড়িত বলে বিবেচিত একটি ভূখণ্ড কীভাবে এমন বিশ্ববিজয়ী প্রতিভার জন্ম দিতে পারে? এই বিস্ময়ের মধ্যে জাতীয় গৌরবও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্বের মধ্য দিয়ে বাংলা তার নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করেছে। তিনি বাংলার সীমাবদ্ধতা ভেঙে বিশ্বপরিমণ্ডলে গেছেন। তাঁর বিশ্বজয় বাংলার মাটির গৌরবকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
এই ভাবেরই পূর্ণতা ঘটে:
“এত বড়, এত মহৎ বিশ্ববিজয়ী মহা-মানব
বাংলার দীন হীন আঙ্গিনায় এত পরমোৎসব
স্বপ্নেও আর পাইব কি মোরা?”
‘বিশ্ববিজয়ী মহামানব’ এবং ‘দীন হীন আঙিনা’ - এই দুটি উপমা পাশাপাশি বসিয়ে নজরুল দেখিয়েছেন, মহত্ত্ব শুধু ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফল নয়। একটি দরিদ্র দেশের মাটিও বিশ্বমানবের জন্ম দিতে পারে। বরং কখনো কখনো মাটি বা স্থানের দারিদ্র্য তার আত্মার মহত্ত্বকে স্পর্শ করতে পারেনা। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে বাংলা শুধু একজন কবিকে হারায়নি; একজন বিশ্বজয়ী মহামানবকে হারিয়েছে। এই হচ্ছে কবি নজরুলের উপলব্ধি। তাই তিনি বলেছেন-
“বাঙালি ছাড়া কি হারালো বাঙালি কেহ বুঝিবে না আর,
বাংলা ছাড়া এ পৃথিবীতে এত উঠিবে না হাহাকার।”
কবিতার শেষদিকে কবি নজরুল বলছেন:
“মোদের আশার রবি চলে গেলে নিরাশা-আঁধারে ফেলে,
বাংলার বুকে নিত্য তোমার শ্মশানের চিতা জ্বেলে।”
রবীন্দ্রনাথের দেহ চিতায় দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আগুন নিভে যায়নি। বরং সেই চিতা যেন অনির্বাণ আলোর শিখায় পরিণত হয়েছে। বাংলার বুকের মধ্যে তাঁর শ্মশানচিতা জ্বলতে থাকবে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু বাংলার জনমানসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে অনিন্দ্য সুন্দরের আলোর প্রেরণা হয়ে। মৃত্যু যেমন অন্ধকার, তেমনি সেই মৃত্যু-স্মৃতিই নতুন আলো সৃষ্টি করতে পারে। মৃত্যু অমৃত করে দান - এটা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্কের রসায়নটিও এই কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দুজনের কবিসত্তা, জীবনদর্শন ও কাব্যভাষা এক নয়। বয়স ও কালের ব্যবধানটিও দীর্ঘ। কিন্তু দুজনই মানুষকে মহিয়ান করেছেন, মানুষের জয়গান করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যে বিশ্বমানবতাবাদ, সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৃতিচেতনা বিকশিত হয়েছে, নজরুলের কবিতায়ও মানবতাবাদের সাথে যুক্ত হয়েছে বিদ্রোহ, সাম্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সামাজিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
‘রবিহারা’ প্রমাণ করে যে বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ ঐতিহ্যে বৈচিত্র্য এবং উত্তরাধিকার পাশাপাশি চলতে পারে। বিশেষত নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথকে সরস্বতী, শিব, সুন্দর, মদন, আনন্দময়ী প্রভৃতি ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বিভাজনের কারণ নয়; বরং সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো একটি বৃহত্তর বাঙালি ও আবহমান ভূমিসংলগ্ন চেতনায় মিলিত হয়েছে। এই দিক থেকে ‘রবিহারা’ শুধু একটি শোককবিতা নয়; এটি বাংলা সংস্কৃতির সমন্বয়বাদী আত্মারও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রবীন্দ্রনাথের বিশালতা ও কবি নজরুলের ঔদার্যের আবেগমথিত রূপ। একটি মর্মস্পর্শী ও বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণের প্রায় এক বছরের মধ্যেই ১৯৪২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিরতরে তাঁর কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতা স্তব্ধ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী ইতিহাসের আলোকে ‘রবিহারা’ পড়লে কবিতাটির মধ্যে এক অনিবার্য নিয়তি যেন প্রতিধ্বনিত হয়। নজরুল যখন লিখেছিলেন ‘বাংলার রবি নিভে গেল’, তখন তিনি জানতেন না যে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর নিজের কণ্ঠও নীরবতার দীর্ঘ অন্ধকারে ঢেকে যাবে। এই ঐতিহাসিক পরিণতি ‘রবিহারা’কে আরও বেদনার স্মারক ও আবেগ উদ্দীপক করে তুলেছে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বাংলা ও বাঙালি দুই মহাশক্তিশালী কণ্ঠকে হারাল। সত্য শিব সুন্দরের প্রকাশ থমকে দাঁড়ালো। যদিও তাঁরা বাংলার সত্যসদনের অক্ষয়ধন। বাঙালির অস্তিত্বের উজ্জ্বল অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশ্বজনের পরমাত্মীয়।
রবিহারা কবিতাটি আবহমান বাংলার ভক্তি, শ্রদ্ধা, প্রেম ও নন্দনচেতনার চারণভূমি থেকে সৃষ্ট এক অনুপম নিদর্শন। কবি নজরুলের মতো উপমাতীত প্রতিভা ও হদয়ের দ্বারাই এর নির্মাণ সম্ভব। আমরা কতোটা তার নিতে পারবো - জানি না।
“তোমারে হেরিয়া মিটেছিল ঋষিকবি দেখিবার আশ
তুমি এসেছিলে একসাথে ব্যাস বাল্মীকি কালিদাস।”
‘রবিহারা’ কবিতাটি কবি নজরুলের নিজ কণ্ঠে আবৃত্তির রেকর্ডকৃত অডিও সংস্করণে উপরোক্ত দুটি লাইন কবিতার মাঝামাঝি স্থানে যুক্ত ছিল। এখনো তা সংরক্ষিত এবং শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে তৎকালীন ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাটির সূত্রে ‘নজরুল-রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, - যা বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে ৯ ফাল্গুন, ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০ সালে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে তাতে ‘রবিহারা’ কবিতায় উক্ত স্থানে উপরোক্ত চরণ দুটি নেই এবং কিছুটা সম্পাদিত বা সংস্কারকৃত বলেই মনে হয়। এর পেছনের সত্যটি আমার অজানা। কবি নিজেই সেটি করেছিলেন? কিন্তু কবি নজরুল তো এই কবিতাটি লেখা ও রেকর্ড করার এক বছরের মধ্যেই চিরতরে অসুস্থ হয়ে লেখা ও বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন! যাহোক, তাঁর নিজকণ্ঠে রেকর্ড করা অডিও সংস্করণটিকে আমাদের মান্য করতেই হয়। আবার মুদ্রিত গ্রন্থকেও উপেক্ষা করতে পারিনা। সমাধানটি দিতে পারেন সম্মাননীয় গবেষকবৃন্দ।
যাকে দেখে কবি নজরুলের ঋষিকবি দেখার তৃষ্ণা মিটেছিল তিনি ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রাচীন ভারতের তিন মহাকবি মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস, মহর্ষি বাল্মীকি এবং কালিদাস- এর মিলিত সত্তা হিসেবে তিনি তাঁকে কল্পনা করেছেন তিনি। এই অনুভব ও আবেগমথিত চরণ কবি নজরুলের একান্ত নিজস্ব। আমরা শুধু আমাদের চিরায়ত বিনয়, ঔদার্য ও ভক্তিবাদকে বিস্ময়ে অবলোকন করি। এর শিশিরবিন্দু পরিমাণ ধারণ করতে পারলেই আমাদের বোধির গোড়ায় এতো অন্ধকার জমা হতোনা। কবি নজরুলের ‘রবিহারা’ আমাদের কপাট দেয়া জানালায় পূবালী হাওয়ার দোলা দিয়ে যায়। বলে, আলোর পথ বন্ধ রেখো না, খুলে দাও। রবি এখনো আছেন, আলো আছে, অন্ধকারের ওপারের অন্তহীন আলো।
আপনার মন্তব্য