মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

২৯ মে, ২০১৮ ০১:৪৩

ধরা পড়ছে খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতারা, মূলহোতারা অধরা

মৌলভীবাজারে মাদকবিরোধী অভিযান

মৌলভীবাজারে র‍্যাব পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল হোতারা এখনও ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

দেশের অন্য জেলার তুলনায় মৌলভীবাজারে মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটাই ম্রিয়মান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে এই অভিযোগ মানতে নারাজ র‍্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যম্পের অধিনায়ক বিমান চন্দ্র কর্মকার ও জেলা পুলিশ সুপার মো. শাহ জালাল।

গত কয় দিনের মাদকবিরোধী অভিযানে সারাদেশে প্রচুর ধরপাকড় হলেও মৌলভীবাজারে মাদক ব্যবসার মূলহোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। যারা ধরা পড়ছে তাদের অধিকাংশ মাদকের খুচরা ক্রেতা এবং মাদকসেবী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সমাজকর্মী জানান, বিভিন্ন সময় দেশী মদসহ গুটি কয়েক ইয়াবা ক্রেতাকে আটক করা হলেও মূলব্যবসায়ীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। লাইন্সেস প্রাপ্ত দেশীয় মদের দোকান রয়েছে জেলার প্রতিটি চা বাগানে। দেশীয় মদ ধরে কি লাভ? তাই চলমান অভিযানে সারাদেশের মত মৌলভীবাজারেও ধরতে হবে ইয়াবা-ফেন্সিডিল ব্যবসায়ীকে।

পুলিশ সুত্রে জানা যায়, চলমান অভিযানে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ৮ জনকে আটক করা হয়েছে মামলা হয়েছে ৫টি, কুলাউড়া থানায় আটক করা হয়েছে ১২ জনকে মামলা হয়েছে ১২ টি। জুড়ি থানায় আটক করা হয়েছে ১১ জনকে মামলা হয়েছে ১১ টি

কুলাউড়া সার্কেলের (কুলাউড়া, জড়ি, বড়লেখা) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, আমার সার্কেলে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট যে ৩২জনের তালিকা করা হয়েছে তা ধরেই অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত আসামী ছাড়াও আরো কিছু মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, তালিকার ৩/৪ জন পলাতক আছে এছাড়া সবাইকে আমরা আটক করতে পেরেছি। সে হিসেবে আমার সার্কেল মাদকবিরোধী অভিযানে সফল।

কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তাদির হোসেন জানিয়েছেন, এপর্যন্ত ১১ জনকে আটক করে মামলা হয়েছে ৩ টি। তবে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের খুঁজছে পুলিশ।

রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো শহিদুল ইসলাম জানান, চলমান অভিযানে ৮ জনকে আটক করা হয়েছে মামলা হয়েছে ৪টি।

জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার সব চেয়ে বড় মাদকের স্পট এবং মাদকের মূলহোতাদের আস্তানা সদর এবং শ্রীমঙ্গল থানায়। কিন্তু এই দুইটি থানাতে চলমান অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুই থানায় অর্ধ শতাধিক স্পটে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের রমরমা ব্যবসা চলে। এদের আটকে পুলিশের তেমন তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম নজরুল ইসলাম জানান, অভিযান অব্যাহত আছে সফলতার হিসেব অভিযান শেষে বলা যাবে।

জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত পথে মৌলভীবাজারে অন্তত ২০ টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক নামানো হয়। দেশব্যাপী চলমান মাদক বিরোধী অভিযানের মধ্যেও বন্ধ নেই ফেন্সিডিলের ব্যবসা।

রোববার দুপুরে শ্রীমঙ্গলের ভারত সীমান্তবর্তী মন্দিরা গ্রামের স্থানীয় এক মাদক সম্রাট বিশাল ফেন্সিডিলের চালান ভারত থেকে নিয়ে এসেছে বলে এক সুত্র নিশ্চিত করেছে।

ভারত থেকে আনা মাদক বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তা চলে যায় খুচরা ব্যবসায়ীদদের হাতে। খুচরা ব্যবসায়ীদের হাত ধরে তা চলে যায় বিভিন্ন স্পটে।

মৌলভীবাজারের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মাদক স্পট হলো সীমান্তবর্তী ফুসকুড়ি ফিনলে চা বাগান এলাকা, রাজঘাট ফিনলে চা বাগান এলাকা, সিন্দুরখান, সিন্দুরখাঁনের বালুর ঘাট, মন্দিরগাঁও, কুঞ্জবন, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশ, শ্রীমঙ্গল শহরের লালবাগ এলাকা, কলেজ রোড, জোড়াপুল, রেলওয়ে গেটের পাশে নার্সারি, শাহজীবাজার, পশ্চিম ভাড়াউড়া, সবুজবাগ এলাকার ত্রিমুখী পুল, পশ্চিম ভাড়াউড়া, কালীবাড়ি বাজার, লইয়ারপুর কামার পাড়া, জাম্বুরা ছড়া, জানাউরা, উত্তরসুর, পূর্বাশা, কলেজ রোড জোড়াপুল, সুরভীপাড়া, ও মৌলভীবাজার সদরের বর্ষিজোড়া, বড়হাট, বেরীরচর চাঁদনীঘাট ব্রিজের নিচ, টেংরা বাজার, আথানগীরী, শমসেরগঞ্জ, ও এসব মাদক ব্যবসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ৫০ প্রভাবশালী ব্যক্তি।

মৌলভীবাজার জেলায় শুধু শহরে নয় মাদক ব্যবসা এখন উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়েও পৌছে গেছে। ফোন দিলেই হেলমেট পরিহিত মাদক ব্যবসায়ীরা বাইকে মাদক পৌছে দিয়ে আসে। আবার ক্রেতারাও প্রকাশ্যে এসে নিয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, মাদক আসে বর্ডার দিয়ে। ফেন্সিডিল ভারত থেকে এবং ইয়াবা মিয়ানমার থেকে সে ক্ষেত্রে বিজিবি চাইলে সবার আগে মাদকের উৎস বন্ধ করতে পারবে। এমনিতে বন্ধ হবে না কারণ ১০ টা ইয়াবা বিক্রি করতে পারলে ২ হাজার টাকা লাভ হয় অথচ ২০ লাখ টাকার পুজি নিয়ে ব্যাবসা করেও তা সম্ভব নয়।

মাদক ব্যবসায়ীরা লাভজনক এ ব্যবসায় একাধিক বিনিয়োগ করেন। গ্রেপ্তার হলে যাতে তারা নিঃস্ব না হন, সেজন্য এ ব্যবস্থা। একবার গ্রেপ্তার হলে পরবর্তীতে দ্বিতীয় পুঁজির টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের বেশিদিন কারাগারে থাকতে হয় না।

মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করলে নেমে আসে অত্যাচার সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মাদকের উপর প্রতিবেদন করতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ী রাজনের হামলায় গুরুতর আহত হন সাংবাদিক হৃদয় দেব নাথ।

র‍্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যম্পের অধিনায়ক বিমান চন্দ্র কর্মকার জানান, শতভাগ আন্তরিকতার সাথে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযানে সময় লাগতে পারে তবে মাদক ব্যবসায়ীদের শতভাগ নির্মুল করা হবে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মো: শাহ জালাল জানান, সারা দেশের মত মৌলভীবাজারেও অভিযান অব্যাহত আছে।

মৌলভীবাজার সদর এবং শ্রীমঙ্গলে অভিযান শিথিল কিনা জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন অভিযান শিথিল না হয়তবা আমরা যাদেরকে টার্গেট করছি তাদেরকে ধরতে পারছিনা তবে অভিযান অব্যাহত আছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত