গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি

০২ জুন, ২০১৮ ২০:২৭

বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত গোলাপগঞ্জের মেয়র

বাবা আব্দুল জব্বার চৌধুরীর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। শনিবার (২ জুন) বিকেলে রণকেলী বনবাড়ী পঞ্চায়েতি কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয় গোলাপগঞ্জের এ পৌর মেয়রকে।

পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সবার উপস্থিতিতে শনিবার (২ জুন) বিকাল সোয়া ৩টায় সিরাজুল জব্বারের দাফন শুরু হয়। দাফনের সময় মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন উপস্থিত সবাই।

এর আগে শনিবার পৌর এলাকার এমসি একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে বিকেল ৩ টায় সিরাজুল জব্বারের শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বিপুলসংখ্যক মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও চোখের জলে তাকে রাখা হয় সমাধিতে।

এর আগে দুপুর ২ টা থেকে প্রয়াত মেয়রকে শ্রদ্ধা জানাতে এমসি মাঠে হাজারো মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।

এর আগে শনিবার দুপুর দেড়টায় শেষ বারের মত শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মেয়রের কর্মস্থল গোলাপগঞ্জ পৌরসভায় নিয়ে আসা হয় তাঁর মরদেহ। এক নজর মেয়রকে দেখতে সেখানেও ঢল নামে শোকার্ত মানুষের।

পরে গোলাপগঞ্জ এমসি একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর জানাজায় শরিক হন হাজার হাজার মানুষ। প্রয়াত মেয়রকে চিরবিদায় জানাতে আসা অগণিত মানুষ, বিশিষ্টজন ও পরিবারের সদস্যরা জানাজার নামাজ আদায় করেন।

জানাজার পূর্বে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা আজ আমাদের এক অভিভাবককে হারিয়ে ফেলেছি। তিনি সব সময় জনগণের কাজে সহায়তা করতেন। তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের পরামর্শদাতা ছিলেন।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকবাল আহমদ চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র হেলালুজ্জামান হেলাল।

এসময় জানাজায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে মেয়রের বড় ছেলে আহমদ শরিফ চৌধুরী ও ছোট ছেলে মাজেদ শরীফ চৌধুরী বলেন- আমাদের বাবা দীর্ঘ দিন থেকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি আমাদেরও মানুষের পাশাপাশি থাকার কথা বলেছেন। আমাদের বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

জানাজায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমদ কামরান, কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ, জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য সৈয়দ মিছবাহ উদ্দিন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বদরুল ইসলাম সোয়েব, গোলাপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজ নজমুল ইসলাম, বিয়ানীবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান, বিয়ানীবাজার পৌর মেয়র আব্দুস শুকুর, গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি এডভোকেট মাওলানা রশিদ আহমদ, সিলেট ইবনেসিনা হাসপাতালের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান, গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি আব্দুল আহাদ, গোলাপগঞ্জ অনলাইন প্রেসক্লাব সভাপতি আব্দুল জলিল, আমিনুর রহমান লিপনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর হার্টে ব্লক ধরা পরলে গত ২৩ মে (বুধবার) তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। ওপেন হার্ট সার্জারির পর কিডনি ও লিভারেও জটিলতা দেখা দেয়। ওপেন হার্ট সার্জারির পর কিছুটা সুস্থ হলেও গত কয়েকদিন ধরে তার শরীরের অবস্থা অবনতির দিকে যায়।

এদিকে গত মঙ্গলবার (২৯ মে) বিকেলে সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর শারীরিক আরো অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে ডা. লুৎফুর রহমানের তত্ত্বাবধানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছিল।

এরপর গত বৃহস্পতিবার (৩১ মে) ৩ টা ২০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর প্রথম জানাজা বৃহস্পতিবার (৩১ মে) বারিধারা ৫ নং রোডের প্রধান জামে মসজিদে এশার নামাজের পর অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর শুক্রবার ভোর ৪ টায় দিকে ঢাকা থেকে মেয়রের মরদেহ রণকেলী উত্তর গ্রামের নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর স্মরণে গোলাপগঞ্জ পৌর প্রশাসন ৩ দিনের শোক ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার সাথে একাত্মতা পোষণ করে গোলাপগঞ্জ বাজার বণিক সমিতি।

সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ১৯৪৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ পৌরসভার রণকেলী উত্তর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আব্দুল জব্বার চৌধুরী ও নজিবা খাতুন চৌধুরীর একমাত্র সন্তান তিনি। ১৯৬৫ সালে প্রাচীন বিদ্যাপীঠ এমসি একাডেমী থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।

পরে তিনি পাকিস্তানের করাচী থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তিনি এলাকায় ভাল ফুটবলারও ছিলেন।

পড়াশুনো শেষে ব্যবসায় মনোযোগ দেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসেবেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি অল্প বয়সেই তিনি শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।

তিনি এমসি একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজে প্রায় ৩০ বৎসর ধরে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রণকেলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে, রণকেলী মুহিউস সুন্নাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসার, গোলাপকুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি সহ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন।

ষাটের দশকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হলেও তিনি কখনোই ক্ষমতার লোভ করেননি। তিনি গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৯০ সালে ২ নং গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০০ সালে গোলাপগঞ্জ পৌরসভা হলে সিরাজুল জব্বার চৌধুরী প্রথম পৌর প্রশাসক হন।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেন। ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের পর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে অল্প সময়ে সবার মাঝে জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠেন ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত