নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জুন, ২০১৮ ০২:০৯

ঈদের ব্যস্ততা মণিপুরী পল্লীতেও

রঙিন পাড়ে ‘মইরাং ফি’ নকশা, আঁচল ও জমিনের কারুকার্যে নান্দনিকতার ছোঁয়া— মণিপুরি তাঁতে বোনা এসব শাড়ি ও অন্যান্য পোশাকের চাহিদা থাকে বছরজুড়েই। উৎসবের মৌসুমে আরো বেড়ে যায়। এবারের ঈদও ব্যতিক্রম নয়। পোশাকের জোগান বাড়াতে তাই ব্যস্ততা বেড়েছে মণিপুরি তাঁতশিল্পীদের।

দেশের সিলেট অঞ্চলে মণিপুরি নৃগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের তৈরি পোশাকগুলোই মণিপুরি পোশাক হিসেবে পরিচিত। মূলত নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মণিপুরি তাঁতশিল্পীরা পোশাক বোনা শুরু করলেও এখন সে পোশাক নিজ সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালিদের মধ্যেও সমান জনপ্রিয়। বিশেষ করে শাড়ির ডিজাইনের মেটাফোরিক কাজ মণিপুরি পোশাককে এনে দিয়েছে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য।

ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সিলেট নগরীর লামাবাজারে গড়ে উঠেছে মণিপুরি কাপড়ের বৃহৎ বাজার। পর্যটকদের কাছে এটি মণিপুরিপল্লী নামেও পরিচিত। এছাড়া দরগাগেট এবং শিবগঞ্জেও রয়েছে বেশ কয়েকটি মণিপুরি কাপড়ের দোকান। ঈদ উপলক্ষে এসব দোকানে বেড়েছে কেনাকাটা। মণিপুরি কাপড়ের দাম সাধ্যের মধ্যে হওয়ায় সব শ্রেণীর ক্রেতাই ভিড় করছেন সেখানে।

নগরীর লামাবাজারে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি মণিপুরি পোশাকের দোকান রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রেতারা জানান, প্রকারভেদে একেকটি মণিপুরি শাড়ি ৭০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়। অন্যান্য পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি ৪০০ থেকে ২ হাজার, ফতুয়া ৩০০ থেকে ১ হাজার, থ্রিপিস ৬০০ থেকে ২ হাজার, শার্ট ২০০ থেকে ৮০০ টাকা, শিশুদের পোশাক ১০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর নকশিকাঁথা বিক্রি হয় ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দামে।

গতকাল লামাবাজারের বিশাল মণিপুরি শাড়ি ঘরে শাড়ি কিনতে আসা ক্রেতাদের একজন নাজমা ইসলাম বলেন, ভিন্ন ধরনের পোশাকের জন্য এখানে এসেছি। ঈদে নিজের জন্য ও অন্যদের উপহার দেয়ার জন্যও মণিপুরি শাড়ি কিনেছি।

এ প্রতিষ্ঠানের বিক্রেতা নার্গিস আক্তার বলেন, সিলেটে ঈদের কেনাকাটা জমে ওঠেছে। প্রতিদিন বিক্রি বাড়ছে। ক্রেতারা শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ বেশি কিনছেন। গেল বছরের চেয়ে এবার পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি। তারপরও ক্রেতারা তাদের সাধ্যানুযায়ী পোশাক কিনছেন।

মূলত লামাবাজারকে ঘিরেই মণিপুরি কাপড়ের বাজার গড়ে উঠলেও সিলেট নগরীতে মণিপুরি অধ্যুষিত এলাকা রয়েছে প্রায় ১২টি। প্রতিটি পাড়াতেই রয়েছেন মণিপুরি কাপড়ের একাধিক তাঁতশিল্পী। নগরীর খাদিমপাড়া, শিবগঞ্জ, কুশিঘাট (নয়াবাজার), লামাবাজার, মণিপুরি রাজবাড়ি, লালাদিঘীরপাড়, আম্বরখানা, বড়বাজার, সুবিদবাজার, সাগরদিঘীরপাড়, কেওয়াপাড়া ও নরসিংটিলা মণিপুরিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, এখনো পোশাক তৈরি ব্যস্ত রয়েছেন তাঁতশিল্পীরা। তারা জানান, ঈদ, পূজা ও শীতে কাপড়ের চাহিদা বাড়ে। এবার ঈদ উপলক্ষে অনেক অর্ডার আসছে। বেশি অর্ডার আসছে শাড়ির।

কাঁচামালের অভাব ও তাঁত স্বল্পতায় চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না বলে অনুযোগ করেন তাঁতশিল্পীরা। মণিপুরি তাঁতের কাপড়ের কাঁচামাল সিলেটে সহজলভ্য নয়। ঢাকা, নরসিংদী কিংবা চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয় এগুলো। আর মণিপুরি কাপড়ের সুতা দেশেই পাওয়া যায় না। ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে  আনতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোর দামও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।

নগরীর শিবগঞ্জে মণিপুরিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন তাঁতশিল্পী তাঁতের কাপড় বোনায় ব্যস্ত। এ পাড়ার তাঁতশিল্পী সুমিতা সিনহা বলেন, ঈদ উপলক্ষে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী এসে অর্ডার দিচ্ছেন। সিলেটের বাইরে থেকেও বেশকিছু ব্যবসায়ী এসেছেন। তবে সুতা না পাওয়ার কারণে সবার চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, মণিপুরি কাপড়ের সুতা তো এখন পাওয়াই যায় না। আর পেলেও দাম আকাশচুম্বী। যে সুতা ক’দিন আগে ২০০ টাকা কেজি পাওয়া যেত, তা এখন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

মাছিমপুর এলাকার তাঁতশিল্পী দিয়া রানী বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রায় ৩ লাখ টাকার অর্ডার পেয়েছি। মানুষ না থাকায় আরো অর্ডার ফিরিয়ে দিয়েছি।

মণিপুরি তাঁতশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এডকো। নগরীর শিবগঞ্জে এ সংস্থার পরিচালনায় ‘মোংরাই’ নামে মণিপুরি পোশাকের একটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে।

এডকোর প্রধান নির্বাহী লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, মোংরাই থেকে মূলত পাইকারি বিক্রি করা হয়। ঈদ উপলক্ষে আমাদের প্রচুর চাহিদা বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে অনেকে পণ্যের অর্ডার দিচ্ছেন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছি না।

দক্ষ কর্মীর সংকটের কারণে এমনটি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে মণিপুরিদের প্রতিটি ঘরেই তাঁতের কল ছিল। ঘরের কাজের ফাঁকেই কোমর তাঁত আর ব্রট তাঁতের কল নিয়ে বসতেন মণিপুরি নারীরা। অথচ এখনকার তরুণ প্রজন্মের মণিপুরিরা আর পোশাকের কাজে আগ্রহী নয়। তাঁত না থাকায় তারা এটি শিখছেও না। ফলে দক্ষ কর্মী সংকট দেখা দিচ্ছে। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী ভালো মানের পোশাক তৈরি হচ্ছে না।

তবে সিলেট মণিপুরী মহিলা সমিতির সভানেত্রী এস রীনা দেবী বলেন, প্রায় সব মণিপুরী নারীরা পরিবার থেকেই তাঁতের কাপড় তৈরি শিখে নেয়। তাই তাদের প্রশিক্ষণের পূর্বে প্রয়োজন মণিপুরী কাপড়ের কাঁচামাল সহজলোভ্য করা ও তাঁতের মেশিন চালু করতে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করা। নতুবা প্রশিক্ষণ পেয়েও কোন লাভ হবে না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত