২৫ জুলাই, ২০১৫ ১৩:৩৫
শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যার ঘটনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও সাময়িব বদলি করা হয়েছে। রাজনের খুনিদের সথে বাঁচানোর চেষ্টা ও হত্যা ঘটনা ধামাপাচা দেওয়ার প্রমাণ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অপরদিকে, আলোচিত এই হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত তিন প্রত্যক্ষদর্শীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে দু'জনকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়। অপরজনকে গ্রেফতার করা হয় শুক্রবার রাতে, তাকেও রিমান্ডে নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শীদেরও যেখানে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। মামলার আসামী করা হচ্ছে। সেখানে অর্থের বিনিময়ে আসামীদের বাঁচানো ও মামলা ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার, সাময়িক বরখাস্তের মতো লঘু দন্ড প্রদান করা হয়েছে।
রাজন হত্যার ঘটনায় শুক্রবার জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার এবং এসআই আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে মহানগর পুলিশ। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো, রাজন হত্যার ঘটনা ধামচাপা দিয়ে আসামীদের বাঁচানোর চেষ্টা, টাকার বিনিময়ে এক আসামীকে বিদেশে পালাতে সহায়তা এবং নিহতের পিতার মামলা না নিয়ে তাকে থানা থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার।
মহানগর পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে এসব অভিযোগের অনেকটা সত্যতা মিলে। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও তদন্ত কমিটির প্রদান রোকন উদ্দিনের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার আর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
তবে প্রত্যাহার আর সাময়িক বরখাস্ত আদতে কোনো সাজাই নয় বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। রাজন হত্যার ঘটনায় যেখানে প্রত্যক্ষদর্শী, অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদেরও রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে সেখানে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। নির্মম এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
জানা যায়, কেবল এ ঘটনা নয়, বিভিন্ন সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তাদের শাস্তি হয় না। প্রাথমিক শাস্তি কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার এবং সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে 'বিভাগীয় ব্যবস্থা'।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভাগীয় তদন্তের আড়ালে অনেক সময়ই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আর প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের নামে যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা মূলত কোনো শাস্তির পর্যায়েই পড়ে না। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে এবং পুলিশের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই বদলি, প্রত্যাহার, ক্লোজ এবং সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দেওয়া হয়। এসব শাস্তিতে সাময়িকভাবে কাজের 'বিঘ্ন ঘটা' ছাড়া কোনো প্রভাবই পড়ে না পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে বড় শাস্তি পেতে হয় না অভিযুক্তকে। ফলে প্রচলিত এই শাস্তি পুলিশের অপরাধ কমাতে কোনো ভুমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, 'সাময়িক বরখাস্ত ও প্রত্যাহার কোনো শাস্তিই নয়। এর মাধ্যমে কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কৌশলে পুলিশের অপরাধী সদস্যরা পার পেয়ে যায়। পরে তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। তাই পুলিশ সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। প্রয়োজনে বিধিমালা সংশোধন করে শাস্তি কার্যকর করা প্রয়োজন।'
তবে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে পুলিশ হেড কোয়ার্টারকে সুপারিশ করা হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক, সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তা গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রাথমিক শাস্তি হিসেবে তাঁকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, অনেক সময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হলে সঙ্গে প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে। তবে শুধু প্রত্যাহার করা হলে সাময়িক বরখাস্ত নাও করা হতে পারে। বরখাস্ত করা হলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য নিয়মিত বেতন না পেলেও শাস্তি চলাকালীন নির্দিষ্টহারে ভাতা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে প্রত্যাহার করা হলে তাঁর কর্মস্থল পরিবর্তন হলেও তিনি সব ধরনের সুবিধাই পেয়ে থাকেন।
পরে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী অভিযুক্ত এসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পুলিশে দুই ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা আছে। প্রথমত, দায়িত্বে অবহেলা, ভুল বা বিচ্যুতির কারণে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। এসব শাস্তির মধ্যে আছে লিখিতভাবে সতর্ক করা, বদলি করা, ভর্ৎসনা করা ইত্যাদি। অন্যটি হলো গুরুতর অপরাধে যেমন- শৃঙ্খলা ভঙ্গ, ফৌজদারি অপরাধ, মিথ্যা তদন্ত ও হয়রানি। এসব অভিযোগের তদন্ত প্রমাণিত হলে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় শাস্তি চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া। এর পর আছে, বেতন কর্তন । তৃতীয়-পদাবনতি বা ডিমোশন। চতুর্থত-সার্ভিস বুকে কালো চিহ্ন দেওয়া। এই চিহ্ন পড়লে তিন বছরের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি পদোন্নতি পান না।
আপনার মন্তব্য