শাকিলা ববি

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ২২:১২

টাকার অভাবে দেশে আনা যাচ্ছে না আজাদের লাশ

একমাস ধরে আবুদাবির হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে কমলগঞ্জের আজাদের মরদেহ, লাশ দেশে পাঠাতে আবুধাবিতে টাকা উঠাচ্ছেন পরিচিতজনরা

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আজাদ মিয়া চলতি বছরের ২৫ জুলাই আবুধাবির আলাইন শহরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা যান। তবে প্রায় একমাস পেরিয়ে গেলে টাকার অভাবে তাঁর লাশ দেশে আনতে পারছে না পরিবার। এক মাস যাবত আবুধাবির একটি হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আজাদের লাশ। লাশ দেশে পাঠাতে আবুধাবিতে টাকা উঠাচ্ছেন আজাদের পরিচিতজনরা।  

আজাদ মিয়ার ছোট বোন সাজনা আক্তার বলেন, আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না। ভাই অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসারে অর্থের যোগান দিয়েছেন। ২ বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। বিদেশে গিয়ে ভাই মারা গেছেন। এখন টাকার অভাবে ভাইয়ের লাশও দেশে আনতে পারছি না। আবুধাবিতেও সরকারি লোকজন কেউ সাহায্য করছেন না। লাশের কফিন, টিকেট কিনতে লাখখানেক টাকা লাগে। আবুধাবিতে পরিচিতজনরা সাহায্য উঠাচ্ছেন ভাইয়ের লাশ দেশে পাঠানোর জন্য। সাহায্য উঠলেই দেশে লাশ পাঠাবেন তারা। এখন সেই অপেক্ষাতেই আছি।

তিনি বলেন, ভাই মারা যাওয়ার পর বিদেশ থেকে তার বন্ধুবান্ধবরা আমাদের মোবাইলে একটি ভিডিও পাঠান। সেই ভিডিওতে দেখেছি ভাই ডিউটিতে ছিলেন। এসময় একটি শেওল গাড়ি পাশের একটি ঘরে ধাক্কা দেয়। ওই ঘরটি আমার ভাইয়ের উপর পড়ে। যার ফলে তিনি মারা যান।

আজাদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের বাসিন্দা আজাদ মিয়া। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভ্রমণ ভিসায় আবুধাবি যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেশের চলমান আইন অনুযায়ী বিজনেস ভিসা অর্থাৎ ইনভেস্টার পার্টনার প্রফেশনে (এক্বামা) আইডি লাগিয়ে কাজ করছিলেন। চলতি বছরের ২৫ জুলাই আবুধাবির আলাইন শহরে ডিউটিরত অবস্থায় একটি গাড়ি স্টিলের একটি রেডিমেট ঘরে ধাক্কা দিলে ঘরটি ভেঙে আজাদের উপরে পড়ে। আঘাতে ঘটনাস্থলেই আজাদ মারা যান। এর পর থেকেই আবুধাবির খলিফা হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আজাদ মিয়ার লাশ।  

এদিকে আজাদ মারা যাওয়ার খবর শোনার পর থেকেই তাঁর মায়ের আহাজারি শুরু হয়। ছেলের লাশ দেখার দেখার জন্য এক মাস যাবত আহাজারি করছেন আজাদ মিয়ার মা রোকেয়া বেগম। ছেলেকে একনজর দেখার জন্য নাওয়া খাওয়া ছেড়ে রোকেয়া বেগমের শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়ে গেছে।  

আজাদ মিয়ার ছোট বোন সাজনা আক্তার বলেন, ‘ভাইতো মারা গেছুইন, এখন মাও খোয়ানির সময় আইছে। ভাইয়ের লাশ দেখার লাগি গত ১ মাস থাকি আমরার ঘরো মাতম চলে। আম্মাতো কানতে কানতে ঘুমাইন আবার ঘুম থাকি উঠি কান্দা শুরু করুইন।

সাজনা আক্তার জানান, আজাদের লাশ দেশে আনতে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা লাগবে। তাই টাকার জন্য লাশ আনতে পারছেন না দেশে। আবুধাবিতে যারা পরিচিত রয়েছেন তারা বাংলাদেশীদের কাছ থেকে চাঁদা (টাকা) সংগ্রহ করছেন আজাদের লাশ দেশে পাঠানোর জন্য।

আজাদের পরিবারের কেউ জানেন না সরকারিভাবে বিনা খরচে লাশ আনা যায়। বাংলাদেশে আজাদের পরিবারেও দায়িত্বশীল কেউ নেই, যিনি সরকারি অফিসে যোগাযোগ করবেন লাশ দেশের আনার জন্য।

আজাদ মিয়ার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। ২ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি ৩য়। বড় ভাই অসুস্থ থাকায় কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই তিনি কাজ করে সংসার চালাতেন। দেশে থাকা অবস্থায় প্রায় ১৬ বছর মৌলভীবাজারের হানিফ পরিবহনের কাউন্টারে কাজ করেন। কষ্ট করে ২ বোনের বিয়েও দিয়েছেন। এরপর ভাগ্য বদলের আশায় ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভ্রমণ ভিসায় আবুধাবি যান দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম যুবক আজাদ মিয়া।

আবুধাবির চলমান আইন অনুযায়ী বিজনেস ভিসা অর্থাৎ ইনভেস্টার পার্টনার প্রফেশনে (এক্বামা) আই ডি লাগিয়ে কাজ শুরু করেন এই প্রবাসী। এই এক্বামা লাগানোর জন্যও বোনেরা ধার কর্জ করে ২ লক্ষ টাকা দেশ থেকে পাঠান আজাদের কাছে। আবুধাবিতে পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা ধার করেন এক্বামার জন্য। এক্বামা পেয়ে যখন যে মালিকের কাজ পেতেন করতেন। মৃত্যুর আগে আবুধাবির আলাইন শহরের রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন তিনি।

জানা যায়, বৈধভাবে বিদেশগামীদের প্রবাসে নিজ দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। বৈধ কোনো প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে লাশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। তবে অবৈধভাবে বা ভিজিট ভিসায় গিয়ে কেউ কোনো বিপদে পড়লে বা মারা গেলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করায় রয়েছে সীমাবদ্ধতা। যেকারণে অবৈধভাবে বা ভিজিট ভিসায় বিদেশ গিয়ে বিপদে পড়লে বা কেউ মারা গেলে ওইখানের বাংলাদেশী কমিউনিটির মাধ্যমেই সাহায্য করে দেশে লাশ পাঠানো হয়।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের প্রবাসী কল্যাণ শাখার দায়িত্বরত মৌসুমী আক্তার বলেন, বিদেশ থেকে লাশ আনার বিষয়ক কাজ আমাদের শাখায় হয় না। এটা আমাদের অধীনস্থ কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের মাধ্যমে করানো হয়।

মৌলভীবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, কোনো বৈধ শ্রমিক বিদেশে মারা গেলে তার লাশ আমরা দূতাবাসের মাধ্যমে আনার ব্যবস্থা করে দেই। এক্ষেত্রে আমাদের অফিসে এসে আবেদন করলেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে অবৈধ ভাবে বিদেশ গেলে সেটা আমরা করতে পারবো না কারণ যারা অবৈধ ভাবে যানে তাদের ডাটা থাকে না আমাদের কাছে। যদি আজাদ মিয়া বৈধভাবে বিদেশ গমন করে থাকেন তবে তার পরিবার যোগাযোগ করলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে লাশ আনার ব্যবস্থা করবো।

এ ব্যাপারে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের একজন নাগরিক বিদেশ গিয়ে মারা গেলে সবার উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে লাশ দেশে পাঠানো। বৈধ পথে যাওয়া শ্রমিকরা বিদেশে মারা গেলে লাশ আনতে ব্যক্তিগত কোনো টাকা খরচ হয় না। সরকারি খরচেই লাশ আনা যায়। তবে অবৈধ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সরকারি খরচে লাশ দেশে আনাতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেখানে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া সরকার সমর্থন করে না সেখানে অবৈধ শ্রমিকদের সাহায্যের ক্ষেত্রেও দূতাবাস নৈতিক ভাবে এটা করতে পারে না। কারণ এর ফলে অবৈধ ভাবে বিদেশগামীরা আরো প্রশ্রয় পাবেন।

তিনি বলেন, তবে অবৈধ শ্রমিকদের বিদেশে মারা যাওয়ার পর লাশ আনা নিয়ে যে জটিলতা হয় সেটা অনেক অমানবিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে আমরা ব্রাকের পক্ষ থেকেও কিছু করতে পারি না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে এ বিষয়ে কাজ করার আমাদের কোনো সুযোগ নেই। তাই এ ধরনের ঘটনায় বিদেশে যে বাংলাদেশি কমিউনিটি থাকে তারাই সাহায্য করেন।

শরিফুল হাসান আরও বলেন, মানুষজন না বুঝে অবৈধ পথে বিদেশ যাচ্ছেন। ভিজিট ভিসায় বিদেশ গিয়ে কাজ করা যায় না। যারা করেন তারা অবৈধভাবে করেন। যার ফলে বিভিন্ন সমস্যা হলে সরকার কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারে না। তাই অবৈধ ভাবে বিদেশ যাওয়া থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে। এবং যেসব অঞ্চলের মানুষজন প্রবাসমুখী তাদের অবৈধপথে বিদেশ যাওয়ার কুফল সম্পর্কে বুঝাতে হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত