০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১৫:৫৬
মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে শ্রীমঙ্গল থেকে ২১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কুলাউড়া থেকে ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণে ও ভারতের উত্তর ত্রিপুরার জেলা কৈলাসহর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান।
কথিত আছে প্রায় ৩০০ বছর আগে এই অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঠান বীর শমশের গাজীর নামে শমশেরনগরের নামকরন করা হয়। বঙ্গবীর শমসের গাজী ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী এবং ত্রিপুরার রৌশনাবাদ পরগনার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঐপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করেন। নবাব সিরাজুদ্দোলার পর তিনিই ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে প্রথম নিহত হন। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি ছিল, এশিয়ার বৃহত্তর গ্রাম্য বাজার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশরা কলকাতা দমদম বিমানবন্দরের সঙ্গে শমশেরনগরে একটি বিমানবন্দর স্থাপন করেছিল। দমদমের সঙ্গে মিল রেখে তার নাম রেখেছিল দিলজান্দ বিমানবন্দর।
তাছাড়া ডানকান ব্রাদার্সের প্রধান চা-বাগান শমশেরনগরসহ আরও দুটি চা-বাগান চাতলাপুর ও আলীনগর পাশাপাশি অবস্থানে। ফলে ব্রিটিশরা সে সময় শমশেরনগরে ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের (আইটিএ) সদর দপ্তর স্থাপন করেছিল। পাকিস্তান আমলে নাম পরিবর্তন করে হয়েছিল পিটিএ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর পিটিএ চা বোর্ডে রূপান্তরিত হয়ে তার সদর দপ্তর করা হয় চট্টগ্রামে। আজও আইটিএ বা পিটিএ ভবন লংলা হাউস শমশেরনগরে সেদিনের সাক্ষ্য বহন করছে। এ ছাড়াও ১৯৫২ সালে ইরানের শাহেনশাহ রেজা পাহলবি ঢাকা থেকে রেলভ্রমণের মাধ্যমে শমশেরনগর স্টেশনে অবতরণ করে কুলাউড়া উপজেলার নওয়াব বাড়ি মহাজোট সরকারের সাবেক সাংসদ অ্যাডভোকেট নওয়াব আলী আব্বাছ খানের বাড়ি গিয়েছিলেন। তাঁর সম্মানে শমশেরনগর প্লাটফরমসংলগ্ন রেলগেটে বড় দুটি পাকা তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। আজও সে তোরণগুলো নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
পাকিস্তান আমলে শমশেরনগর বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইনসের (পিআইএ) অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সার্ভিস চালু ছিল। ১৯৭০ সালে সিলেট বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর পিআইয়ের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেলে শমশেরনগর বিমানবন্দরের রানওয়েতে জরুরি অবতরণকালে বিমানটি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে অধিকাংশ যাত্রী মারা যান। সেই থেকে শমশেরনগর বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে বিমানবন্দরটি অচল হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী (বিএএফ) শমশেরনগর বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রথমে বিশাল এলাকার পতিত ভূমিকে কৃষি অন্তর্ভুক্ত মিষ্টিবরই, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, পেয়ারা, ধান ও লেবুর চাষাবাদ শুরু করে পর্যায়ক্রমে এখানে বড় একটি কৃষিখামার গড়ে তোলে। পাশাপাশি বিএএফ এমটি ইউনিট ও সার্ভইভ্যাল স্কুল স্থাপন করে বিমানসেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে বিএএফ রিক্রুটস অ্যান্ড ট্রেনিং স্কুল ও বিএএফ শাহীন কলেজ স্থাপন করা হয়শমশেরনগরে।
এসব কারণ ছাড়াও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ত্রিপুরা পাহাড়বেষ্টিত, টিলা ও রনেমাটির কারনে শমশেরনগরে মৌসুমি ফল আম, কাঁঠাল, জাম, আনারস, লেবু, পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়। ফলে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে শমশেরনগরে বসে বিশাল আম-কাঁঠালির হাট। শমশেরনগর স্টেশন সড়ক ও রেলওয়ে স্টেশনের পতিত জমিতে বসে আম-কাঁঠালির বড় হাট। রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ ও তুলনামূলক কম দামে পাইকারি বিক্রয় হয় বলে শমশেরনগরে মৌসুমি ফলের হাট জমজমাট থাকে।
শমশেরনগরের অবকাঠামোগত অবস্থাও বেশ ভালো। মৌলভীবাজার জেলায় শমশেরনগর খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া সর্বক্ষেত্রেই শমশেরনগর এখন অগ্রসরমান জনপদ। গত কয়েকবছরে শমশেরনগর বেশ বড় কিছু ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে। জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী শমশেরনগরে শিক্ষার হার ৯৫%। সরকারী ও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৩টি। উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে ৩টি , মাদ্রাসা রয়েছে ৪টি এবং কলেজ ২টি। প্রতি বছর পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় শমশেরনগরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সিলেট বোর্ডে উল্লেখযোগ্য ফল করছে।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কিংবা বিসিএস এর মত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতেও এই ইউনিয়নের ছেলে-মেয়েরা মেধার সাক্ষর রাখছে। শমশেরনগরে খেলাধুলার জন্য ৩টি মানসম্মত খেলার মাঠ রয়েছে। দুই যুগ পুরনো শমশেরনগর স্থায়ী গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আজ জাতীয় পর্যায়েও সমাদৃত। জাতীয় দল ও বিদেশী বহু তারকা খেলোয়াড় খেলে গেছেন ঐতিহ্যবাহী শমশেরনগর চা বাগান মাঠে। এছাড়াও ক্রিকেট, ব্যাটমিন্টন, ভলিবল টুর্নামেন্টও এখানে উৎসবের সাথে আয়োজিত হয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে শমশেরনগর আপন আলোয় মহিমান্বিত। দীর্ঘ নয় বছর ধরে সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পিঠামেলা শমশেরনগর সাফল্যের সাথে আয়োজন করে আসছে। এছাড়াও বৈশাখী মেলাও হয়ে থাকে। এসব মেলায় হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। বেশ কিছু বছর যাবত ঢাকার বই মেলার আদলে শমশেরনগরের মত একটি মফস্বলেও বই মেলা হয়ে থাকে। শমশেরনগরে মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ ১৫টি ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। ইউনিয়নের ৬৫% লোক মুসলিম হওয়া সত্বেও ধর্মীয় সম্প্রীতি কি জিনিস সেটা বুঝতে হলে অবশ্যই শমশেরনগরে যেতে হবে। এখানে যেমনি মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ ও ওয়াজ উৎসবের আমেজে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে পালিত হয় তেমনি হিন্দুদের বিভিন্ন পুজাও বর্ণাঢ্যভাবে পালিত হয়। বিভিন্ন পুজাকে কেন্দ্র করে শমশেরনগর চা বাগানে ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে। শমশেরনগর স্টেশন ব্যবহার করে কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের মানুষ যাতায়াত সেবা গ্রহন করে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই সীমান্তবর্তী শমশেরনগর একটি গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্য কেন্দ্র। এ গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৫৭ সালে শমশেরনগরে সিও ডেভলফমেন্ট অফিস করার সকল আয়োজন করা হয়েছিল। এজন্য শমশেরনগর চা বাগানের রাবার বাগান, শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র ও শিংরাউরী ইলেভেন স্টার মাঠ অবমুক্ত করা হয়েছিল। কথিত আছে সে সময় ফজলুল কাদের রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ায় তৎকালীন এমএলএ কেরামত আলীর প্রভাবে ও উদ্যোগে আলীনগর ইউনিয়নের নছরতপুর গ্রামে সিও ডেভলপমেন্ট করা হয়েছিল। শমশেরনগরে রয়েছে বিশাল কৃষি ও মৎস্য খামার। শমশেরনগরে রয়েছে চাতলাপুর স্থল শুলক্ স্টেশনের সদর দপ্তর। সিলেট বিভাগের যে কোন সীমান্ত পথে ভারত থেকে ক্রয় করলে রাজস্ব দিতে হয় শমশেরনগর শুল্ক অফিসে। এ শুল্ক অফিসের মাধ্যমে ভারতের উত্তর ত্রিপুরা ও আসামে আমদানী রপ্তানি বাণিজ্য চলছে। শমশেরনগর ও এর আশপাশের এলাকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় শমশেরনগরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে।
সামরিক সরকার কর্তৃক থানা পরিষদকে উপজেলা পরিষদে রূপান্তরিত করার পর থেকেই প্রথম শমশেরনগরকে উপজেলা করার তাগিদ অনুভূত হয়। কিন্তু একটি মহল শুরু থেকেই শমশেরনগরের বিরোধিতা করে। পরে ১৯৮৬-৮৭ সাল থেকে আবার শমশেরনগরে থানা ও উপজেলা করার উদ্যোগ নিলে উপজেলা সদরের একটি মহল গোপনে বাঁধার সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার আমলে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান মৌলভীবাজার জেলাকে এ গ্রেডে উন্নীত করার লক্ষে শমশেরনগর ও জুড়িতে নতুন দুটি উপজেলা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে হিসাবে কাজকর্ম এগিয়ে গেলেও জুড়িকে উপজেলা করা হয়। সে সময় সরকারের প্রাভাবশালী এক আমলার হস্থক্ষেপে শমশেরনগরকে উপজেলা করা হয়নি। পরে শমশেরনগরের মানুষের দাবীতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে আওয়ামী সরকার আমলে আবার শমশেরনগরে উপজেলা বাস্তবায়নে সরকার তৎপর হয়। কিন্তু তখনই পতনউষার, হাজীপুর ইউনিয়নের মানুষ আন্দোলন শুরু করেছিলেন ওসমানগড় উপজেলা চাই। সেবারও কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে শমশেরনগরের মানুষ আবারও বঞ্চিত হয়। বর্তমানে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও আওয়ামিলীগ সরকার ক্ষমতায় এলে সৈয়দ মহসীন আলী এমপি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হলে তিনি উদ্যোগ নিলেন শমশেরনগর থানা ও পৌরসভা হবে। কিন্তু প্রসাশনিক অদক্ষতার কারনে সেটিও বাধার সন্মুখিন হয়। পরে শমশেরনগরের সর্বস্থরের মানুষ আবারও শমশেরনগর উপজেলা স্থাপনের দাবী জোরালো করে।
এই দাবীর মুখে সম্প্রতি আবার সরকারী উদ্যোগে শমশেরনগর উপজেলা স্থাপনের কাজ শুরু হলে উপজেলা ও থানা পর্যায়ের প্রতিবেদন নেওয়ার সময় সেই বিরোধী চক্রটির মদদে এবার রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নবাসী আন্দোলনে নামে। তাদের দাবী আমরা রাজনগরে থাকবো নতুন থানা শমশেরনগরে যাবো না। যদিও প্রাথমিকভাবে নতুন উপজেলার অধীনে থেকে পরবর্তীতে এ উপজেলা থেকে বের হওয়ার সুযোগ আছে। যেমন জুড়ি উপজেলা স্থাপনে দক্ষিণভাগ প্রথমে ছিল; পরে দক্ষিণভাগ জুড়ি উপজেলা থেকে বের হয়ে গেছে।
একটি উপজেলা স্থাপনের সকল যোগ্যতা ও উপাদান থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী একটি পক্ষের ষড়যন্ত্রে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। শুরু থেকেই একটি মহল শমশেরনগরের উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। শমশেরনগরের যেকোনো উন্নয়ন তারা কটু চোখে দেখে। বিভিন্ন সময় কতিপয় এই সুবিধাভোগীরা শমশেরনগরের সার্বিক উন্নয়নের বিরোধিতা করছে। সম্প্রতি শমশেরনগরবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত দাবি শমশেরনগরকে উপজেলা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সর্বস্থরের মানুষ দল-মত-নির্বিশেষে এক কাতারে এসেছে। ফেসবুক কিংবা অনলাইনেও তারা এই দাবীর পক্ষে জনমত গঠন করছে। সকলের ফেসবুকের প্রোফাইল ফটোতে শোভা পাচ্ছে ‘দাবি মোদের একটাই, শমশেরনগর উপজেলা চাই’ শীর্ষক পোষ্টার। বিভক্ত এই সমাজে শমশেরনগরবাসীর “ঐক্যই” দাবীর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে সক্ষম করেছে । একটি ইউনিয়ন হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত শুধু শমশেরনগরের উপর নির্ভর করেই এর আশেপাশের এলাকার উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু একটি ইউনিয়ন হিসেবে শমশেরনগরের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কাজেই শমশেরনগরে “কামারচাক, পতনউষার, টিলাগাও, হাজীপুর, শরীফপুর ও শমশেরনগর ইউনিয়ন” সমন্বয়ে ‘শমশেরনগর উপজেলা' নাম ধারণ করে নতুন উপজেলা বাস্তবায়ন হলে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃত পক্ষে শমশেরনগর উপজেলা বাস্তাবায়ন ও কার্যক্রম শুরু এখন সময়ের দাবি। তাই শমশেরনগরবাসীর এখন সেই প্রতীক্ষায় প্রহর কাটছে।
আপনার মন্তব্য