১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:৩২
গুরুত্বপূর্ণ কোনাে সভা কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠানে বসে প্রায় চোখ বন্ধ করে থাকতেন মহসিন আলী। মনে হতো ঘুমিয়ে আছেন তিনি। তাঁর এই ঘুম নিয়ে কতো সমালোচনা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি। সচিত্র প্রতিবেদন। সেই মহসিন আলী চিরঘুমে গেলেন।
বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজারে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী।
তাকে সমাধিস্থ করতে এসেছিলেন স্থানীয় কলেজ ছাত্র আবদুল আলিম। অনুষ্ঠান মঞ্চে মহসিন আলীর ঘুমিয়ে পড়া নিয়ে গণমাধ্যমে সমালোচনার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'নেতাকে ঘুম পাড়ালাম। এবার আর তার ঘুম নিয়ে কেউ সমালোচনা করবে না।'
মৌলভীবাজারের প্রতিটি পরিবারের আপনজন ছিলেন মহসিন। ছিলেন সকলের স্বজন। সত্যিকার এক জননেতা। বুধবার মহসিন আলীর মরদেহ মৌলভীবাজার আসলে আবার প্রমাণ মেলে এই শহরবাসীর কতোটা আপন ছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। জানাযায় অংশ নিয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জানাযায় অংশ নিয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। শেষবার মুখটা দেখে চোখের জল ফেলেছে অনেকে। যাদের বেশিরভাগের সাথে মহসিন আলীর কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। দলীয় কর্মীও নন তাদের অনেকে।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে মহসিন আলীর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অসংখ্য মানুষ। স্থানীয় বিএনপি দলীয় কর্মী শহীদ আহমদ বলেন, তিনি তো কেবল আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন না। ছিলেন সকলের নেতা। সবার আপনজন। তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারবাসী একজন অভিভাবক হারালো।
শ্রীমঙ্গল থেকে জানাযায় শরিক হতে এসেছিলেন সোয়েব আহমদ। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা মহসিন আলীর কেবল সমালোচনাই করে গেলো। তাঁর ভালো দিকগুলির কথা তারা জানলোই না। আজ মৌলভীবাজার আসলে সাংবাদিকরা বুঝতে পারতো কেমন মানুষ ছিলেন মহসিন আলী।
সত্যিই জানাযা শুরুর অনেক আগ থেকেই লোকে লোকারণ্য মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। যেনো তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দলে দলে আসছে মানুষ।
মহসিন আলী সমাজকল্যান মন্ত্রী ছিলেন। ছিলেন মৌলভীবাজার পৌরসভার তিনবারের চেয়ারম্যান। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি ছিলেন মৌলভীবাজারাসীর একেবারে ঘরের মানুষ।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আকলাস উদ্দিন বলেন, মহসিন আলীর ঘরে ঢুকতে কারো কোনোদিন অনুমতি নিতে হয়নি। যেকেউ যেকোনো সময় তাঁর বাড়িতে চলে যেতে পারতো। ভিক্ষুক থেকে কোটিপতি সবাইকেই সমানভাবে সমাদর করতেন তিনি।
মৌলভীবাজারের কুসুমবাগ এলাকার ব্যবসায়ী আজমত হোসেন বলেন, মহসিন আলীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো তাঁর সততা। দূর্নীতি তাকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি। মনে যা বিশ্বাস করতেন তাই মুখে বলে ফেলতেন। কোনো লুকোচাপা ছিলো না।
প্রিয় নেতার মরদেহ দেখতে রাজনগর থেকে আসা স্কুল শিক্ষক সেবুল আহমদ বলেন, তিনি ছিলেন সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ধর্মীয় কোনো গোঁড়ামি তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।
বুধবার মৌলভীবাজার গিয়ে শোনা যায় এমন অসংখ্য আবেগময়ী স্মৃতিচারণ।
বুধবার সত্যিকার অর্থেই মৌলভীবাজার ছিলো শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় নতজানু আর শোকে কাতর এক শহর। মহসিন আলীকে শেষ বিদায় জানাতে যেনো থমকে গিয়েছিলো পুরো শহর। প্রিয় নেতার প্রতি ভালোবাসার এক মহত্ত্বম দৃষ্টান্তই যেনো স্থাপন করলো মৌলভীবাজারবাসী। কিংবা এবং ভালোবাসার বিদায় হয়তো মহসিন আলীর মতো জননেতাদের প্রাপ্যই ছিলো।
বিকেল ৫টা ৩ মিনিটে মৌলভীবাজার শহরের শাহ মোস্তফা মাজারে বাবা-মায়ের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।
এরআগে বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুর সাড়ে ১২টায় মহসিন আলীর মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারটি ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। সেখানে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের লোকজন মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর মরদেহ মহসিন আলীর নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন স্বজন-রাজনৈতিক সহকর্মীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ। মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরই প্রিয় মানুষের মুখ একবার দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন সবাই। এসময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন অনেকে।
এরপর দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মন্ত্রীর মরদেহ মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে রাখা হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। বিকেল ৪টায় পুলিশ বাহীনির একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার শেষে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
সিঙ্গাপুরে চিকৎসাধীন অবস্থায় ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে মৃত্যুবরণ করেন মহসিন আলী।
আপনার মন্তব্য