৩০ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:১৩
উসমান আলী (২৫)। মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার হাজীগঞ্জ বাজারের একটি রেস্টুরেন্টে দৈনিক মুজুরিতে কাজ করতেন। কিন্তু করোনার দুর্যোগকালে রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ায় হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তিনি।
কাজ না থাকায় বিপাকে পড়া সবার মত অন্যের দেওয়া সহায়তাই ছিল তার মূল ভরসা। কিন্তু সে সহায়তা নিয়মিত ছিল না। তাই বদলেছেন পেশা। শহরের বাজারে এখন মাস্ক বিক্রি করেন তিনি। তবে দুর্যোগের এই দিনে মাস্ক বিক্রি করেও তেমন আয় হয় না উসমান আলীর।
উসমান থাকেন শহরের ইয়াকুবনগরে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে হাজীগঞ্জ বাজারের স্টেশন রোড এলাকায় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ। হোটেল বন্ধ। চলতে অইব। এর লাগিয়া মাস্ক বিক্রি করিয়ার। পৌরসভা থাকি তিন দিনের চাউল (চাল) অইব পাইছি। ইতায় তো চলে না। সরকার দিব মাসে একবার। দৈনিক তো তারা সায্য (সাহায্য) দিতা নায়। সকাল ৯টায় আইছি। এখন দুপুর ২টা। ৭০ টাকার মাস্ক বিক্রি করছি। কয় টাকা লাভ অইব। কিতা লাভ অইব আপনে বুঝইন। খুব কষ্টে আছি।’
হাত তিনেক দূরে বন্ধ মার্কেটের বারান্দার সামনে আরও কিছু মাস্ক নিয়ে বসে ছিলেন দেবলাল সাহা। মাসখানেক আগে এখানেই দেবলাল সাহা লুঙ্গি, গামছাসহ কাপড় বিক্রি করতেন। করোনার অঘোষিত লকডাউনে কাপড় নিয়ে বসার সুযোগ নাই। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ দেবলাল কারো কাছে হাত পাতার মানুষ নন। কিন্তু সংসার তো চালাতে হবে। তাই বিকল্প পথ বেঁচে নিয়েছেন। কিছু মাস্ক নিয়ে বসেছেন।
দেবলাল সাহা জানালেন, কাপড় বিক্রি বন্ধ হওয়ায় খুব কষ্টে আছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কি করবেন এটা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তিনি। চিন্তায় থাকেন সব সময়।
স্টেশন রোডে প্রবেশ মুখের ফুটপাতে সবজি বীজ নিয়ে বসে ছিলেন ওলিউর রহমান। তার পাশে বসে করোনা নিয়েই আলাপ করছিল কিশোর রিয়াজ। সামনের দিনগুলোতে কি ঘটতে যাচ্ছে। এটা নিয়ে তার চিন্তা। সে জানায়, কোনতা না করলে চলতাম কিলা।
বিজ্ঞাপন
রিয়াজ বের হয়েছেন চাচার দেওয়া কিছু মাস্ক নিয়ে। ওগুলো বিক্রি করে দেবেন। আগে চায়ের দোকানে কাজ করতেন। আর বীজ নিয়ে বসা ওলিউরের কাপড়ের দোকান ছিল পৌর মার্কেটে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দোকান বন্ধ। দোকান খোলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। সবজি বীজ বিক্রিতে বাধা নেই। তাই বীজ নিয়ে বসেছেন। রোজগারের আশায়।
ওলিউর জানান, বাবা পরিবারে সহায়তা করছেন। কিন্তু বেকার বসে লাভ নাই। কারণ সহায়তা তো সব সময় পাওয়া যাবে না। তাই বীজ বিক্রি থেকে কিছু আয় হলে পরিবারের কিছু সহায়তা হবে। তবে খুব একটা বিক্রি হয় না। তাই সব সময় অনিশ্চয়তা কাজ করে।
উপজেলার বিজয় মার্কেটের সামনে মাস্ক ও টুপি নিয়ে বসে আছেন মো. আলী। তার চোখে মুখে হতাশার চাপ। মাসখানেক আগেও তার দোকান ছিল ডাকবাংলো এলাকায়। ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করতেন। নিজের আয় দিয়ে সচ্ছল মত চলত সংসার। করোনার কারণে আর ফুটপাতে বসার সুযোগ নেই। সরকারিভাবে পৌরসভা থেকে মাত্র ১০ কেজি চাল আর কিছু আলু পেয়েছিলেন। এটাই শেষ সহায়তা। কিন্তু এই অনিয়মিত সহায়তায় তো আর সংসার চলবে না। তাই পেশা বদলেছেন। কিছু মাস্ক ও টুপি নিয়ে ফেরি করেন। কথা হয় আলীর সাথে।
মো. আলী বলেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত মানুষ। কারো কাছে হাত পাততে পারি না। লাইনেও দাঁড়াইয়া ত্রাণ নিতে পারছি না। কাউন্সিলর পৌরসভা থেকে কিছু চাল আর আলু দিয়েছিলেন। এক মাসে এটাই শেষ পাওয়া। খুব কষ্টে দিন যার। মাস্ক আর টুপি লাইয়া বসা মানে সময় কাটানো। সকাল থেকে ৫০টাকা বিক্রি করেছি। লাভ হয়েছে ১০টাকা। এখন ১০টা দিতে হবে মহালদারকে (ইজারাদার)। লাভ তো অইল না। পেট চালাতে রুজির (রোজগার) জন্য বের হতে হবে। ঘরে থাকলে এক সময় উপাসে (না খেয়ে) মরা লাগব। আর সরকারি সাহায্য দেওয়া হয় মুখ ছিনিয়া। এর লাগি নিজের চিন্তা নিজেরেই করতে অইব।’
উসামান, ওলিউর, মো. আলী ও দেবলাল সাহারা করোনাভাইরাস সংকটে জীবিকার অন্বেষণে পেশা বদলেছেন। তাদের মত বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ এই সংকটে বদলেছেন পেশা। এরা সকলেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এখন কেউ ক্রোকারিজের দোকানের সামনে আলু, পেঁয়াজ ও তেল নিয়ে বসেছেন। কেউ বসেছেন সবজি নিয়ে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরলে এমন দৃশ্য চোখে পড়বে। জীবিকার তাগিদে তারা পেশা বদল করেছেন। তারপরও চিন্তা মুক্ত নন কেউই। করোনার দুর্যোগকালে কর্মহীন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এ মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় চিন্তা- দুমুঠো খাবার।
আপনার মন্তব্য