০১ মে, ২০২০ ০০:১৫
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বন্যার আশঙ্কা কেটে গেলেও রৌদ্রজ্জ্বল আকাশে কালো মেঘ দেখলেই উৎবেগ আর উৎকণ্ঠায় বিরাজ করে হাওর পাড়ের কৃষকের মনে। কারণ রয়েছে সামনে নিন্মচাপ আর ব্রি আর ২৯জাতের ধান কাটা নিয়ে চিন্তায় কৃষক। এই ধান কাটতে আরও ১০-১২দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢল চলে আসে তবে কষ্টের ফলানো বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাবার আশংকা রয়েছে।
এর মধ্যেই উৎসব মুখর পরিবেশে জেলা তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভরপুরসহ ১১টি উপজেলায় পুরোদমে ধান কাটা ও মাড়াই চলছে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় এ বছর হাওরে ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় আর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ। এবার উপজেলায় ১৭হাজার ৫শত ২৭হেক্টর জমিতে ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪০০হেক্টর ব্রি ২৮ বাকী অংশ ব্রি ২৯ চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের নিচু এলাকায় ১৩,৮৫০হেক্টর বাকী অংশ উঁচু এলাকায় ধান চাষ হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯৭হাজার ৪শত ৫৮মেট্রিক টন। এপর্যন্ত ৬৫ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে।
কিন্তু কৃষকরা বলছেন এবার বোরো ধানের বাম্পার ফল হলেও ব্রি ২৯ধান পাকতে দেরী হওয়ায় তারা চিন্তায় আছেন। আর উপজেলায় এই পর্যন্ত প্রায় ৪৫-৫০ভাগ ধান কাটা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, এখন পর্যন্ত টাংগুয়ার হাওর, শনি হাওর, সমশা, বারার হাওর, লোভার হাওর, মহালিয়, গুরমা, বলদা, মাটিয়ান হাওরসহ নিচু হাওর এলাকায় ৮হাজার হেক্টর জমির বেশী ধান কর্তনের বাকী আছে। এর মধ্যে স্থানীয় জাতের দেশি ধান আড়াই হাজার হেক্টর ও ব্রি-২৯জাতের ধান সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টরের বেশী কর্তনের বাকী আছে।
উপজেলা উপসহাকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, ধান কর্তনের জন্য উপজেলায় এ বছর ১৩টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার হাওরের জমিতে ধান কর্তন করছে। এর মধ্যে ৫টি শনির হাওরে, ৪টি মাটিয়ান হাওরে ধান কর্তন করছে। প্রতিটি হার্ভেস্টার যন্ত্র ঘণ্টায় আড়াই কিয়ার(৯০শতক) জমির ধান কাটতে পারে। একই সাথে এবং একই সময়ে ধান মাড়াই ঝাড়া ও বস্তা ভর্তি হয়ে যায়। কম খরচে দ্রুত সময়ে ধানকাটা, মাড়াই ও বস্তাভর্তি হয়ে যায়।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী হাওরাঞ্চলে ধান কাটার জন্য ৭০ভাগ ভর্তুকিতে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার পাঠিয়েছেন। আর স্থানীয় প্রশাসনও দ্রুতই এ যন্ত্র হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করলেও অনেক হাওরেই কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনের যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। ফলে বেশীর ভাগ হাওরে হাওরে মেশিন গুলো প্রবেশ করতে পারছে না আর এখন হাওরে ব্রি ২৯জাতের ধান রয়েছে। ফলে অনেক কৃষক কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনের ধান কাটার সুফল ভোগ করতে পারছে না। সড়কের ব্যবস্থা করা হলে মেশিন হাওরে যেতে পারত। এতে করে কৃষকরা কম খরচে দ্রæত ধান কাটতে কৃষকরা উপকৃত হত বলে জানান হাওরাঞ্চলের সচেতন মহল।
উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের চুনখলা হাওরের কৃষক শাবজল হোসেন জানান, তিনি এবার ২৫কিয়ার জমি চাষ করেছেন। এপর্যন্ত ১১কিয়ার জমি কেটেছেন। সরকারী ধান কাটার মেশিন অনেক চেষ্টা করেও পান নি। তাই জনপ্রতি ৪-৫শত টাকা মজুরী শ্রমিক দিয়ে ধান কেটেছেন।
মাটিয়ার হাওরের কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, আমি ৬ বিঘা জমি বর্গা চাষ করেছি সব ব্রি ২৯। আমারত টাকাই নাই সরকারী মেশিন দিয়ে ধান কাটালেও ত প্রতি কিয়ারে ১২-১৫শত টাকা লাগবে টাকা দিব কোথা থেকে। তাই মেশিনের চিন্তা না করেই ধান কাটা শুরু করব।
শনির হাওরের কৃষক ইয়াসির আরাফাত বলেন, শনির হাওরে আমার রোপিত জমির ধান পেকেছে। চেষ্টা করছি ধানকাটার যন্ত্র দিয়ে কাটতে। যদি না পাই তবে বাধ্য হব কৃষি শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে। কৃষি শ্রমিক দিয়ে ধান কাটালে খরচ বাড়বে।
শনির হাওরের কৃষক ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাফিজ উদ্দিন বলেন, আমাদের হিসাবে হাওরে দেশি জাতের ও ব্রি-২৯প্রজাতির ধানসহ ৮হাজার হেক্টর ধান কর্তনের বাকী আছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে সবাই সবার কষ্টের ফলানো বোরো ধান ঘরে তুলতে পারবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান-উদ-দৌলা বলেন, আমরা শুরু থেকেই কৃষকের পাশে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি হাওর থেকে উৎপাদিত একমাত্র বেরো ফসল সহজেই কৃষকরা তাদের গোলায় তুলতে পারেন।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, কৃষকের মুখে হাসি আর গান ছড়িয়ে দিতে আমরা সবধরনের চেষ্টাই করছি। এজন্য করোনা দুর্যোগেও কৃষকের পাশে থাকতে প্রতিদিন হাওর আর মাড়াই খলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জী বলেন, করোনা দুর্যোগেরও মধ্যেই হাওরে উৎসবের মধ্যে দিয়ে ধানকাটা চলছে। হাওরে ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় হাওরাঞ্চলের কৃষকের মুখে হাসি।
আপনার মন্তব্য