০৫ মে, ২০২০ ০১:২৯
দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার। গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে তা কয়েক দফায় বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলা লকডাউনও করা হয়। তারপরেও তা যে বিশেষ কাজে লাগেনি, তার চিত্র ফুটে উঠেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সংক্রমণ দেখে। প্রায়দিনই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে লকডাউন উপেক্ষা করে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে পড়ছে করোনাভাইরাসের ‘ক্লাস্টার’ হিসেবে পরিচিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে। পথিমধ্যে পুলিশ দেখলেই প্রতারণা ও কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
শ্রীমঙ্গলে সর্বশেষ শনাক্ত হওয়া কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগী কিশোর গার্মেন্টসে কর্মরত বোনদের সাথে ঢাকা থেকে ফেরেন। গত মাসের ২৭ তারিখ তারা তিনজন নরসিংদী থেকে শ্রীমঙ্গলের সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের তাদের বাড়িতে আসে। তারপর তাদের তিনজনেরই নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়, গতকাল রাতে সেই তিনজনের মধ্যে ওই কিশোরের রিপোর্ট পজিটিভ আসে।
সিন্দুরখাঁন ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সহকারী নজরুল ইসলাম জানান, গত ২৮ এপ্রিলে আমার কর্ম এলাকা সিন্দুরখান ইউনিয়নের একটি গ্রামে নরসিংদী থেকে বাড়িতে আসা ২ জন নারী গার্মেন্টসকর্মী ও তাদের সাথে থাকা এক কিশোরের সন্দেহজনক করোনাভাইরাসের নমুনা (স্যাম্পল) কালেকশন করা হয় এবং তা পরীক্ষার জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। পরে তা পরীক্ষার পর তাদের দুই বোনের করোনা নেগেটিভ আসলেও কিশোর ভাইটির করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে।
কিন্তু এ পরিবারের তিন সদস্য লকডাইন চলাকালীন সময় শ্রীমঙ্গলে এলো কিভাবে তা নিয়ে আলোচনায় মসগুল গোটা শ্রীমঙ্গলবাসী। এ পরিবারের এক সদস্যের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানা যায়, আক্রান্ত কিশোরসহ তার দুই বোন ২৭ এপ্রিল নরসিংদী থেকে প্রথমে একটি সিএনজিতে করে কিছুদূর যান, তারপর কখনও হিউম্যান হলার আবার কখনও টমটম ব্যবহার করে তারা শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছান । পরে সেখান থেকে তারা একটি ট্রাকে করে শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত পৌঁছান। পথিমধ্যে তারা খানিকটা পথ হেঁটেও পার হন।
সেই তিনজনে নরসিংদী ফেরত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের কাছে এই প্রতিনিধি জানতে চান তারা পথিমধ্যে কোথায় পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন কি না? জবাবে তিনি জানান, নরসিংদী থেকে বের হওয়ার সময় একবার পুলিশ আটকেছিলো এছাড়া পথিমধ্যে তারা আর কোথাও পুলিশ দেখতে পাননি।
শ্রীমঙ্গলের প্রবেশপথে পুলিশ ছিলো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ ছিলো কিন্তু চেকপোস্টে যাবার আগেই আমরা গাড়ি থেকে নেমে যাই তারপর হেঁটে চেকপোস্ট পার হয়ে আবার গাড়িতে উঠি, তাই চেকপোস্টে পুলিশ আমাদের আটকায়নি।
স্থানীয় ও আক্রান্তদের প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় আক্রান্ত চার ব্যক্তির তিনজনই ঢাকা ও নরসিংদী থেকে এসেছে। নরসিংদী ফেরত আক্রান্ত এই কিশোরের আগে ২৬ এপ্রিল ঢাকা করোনা শনাক্ত হওয়া এক শিক্ষার্থী যিনি শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানের বাসিন্দা গত ২২ এপ্রিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে শ্রীমঙ্গল আসেন। এছাড়া শ্রীমঙ্গলে করোনা শনাক্ত হওয়া প্রথম রোগী একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা তিনিও তার বাড়ি ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে শ্রীমঙ্গলে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যদিও তার সাথে যোগাযোগ করে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে উপজেলার বাইরে থেকে আসার কারণে লকডাউন ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা।
শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় পত্রিকা চায়ের দেশের বার্তা সম্পাদক সনেট দেব চৌধুরী বলেন, করোনা প্রতিরোধে সম্মেলিত প্রচেষ্টা দরকার এখনই। লোক দেখানো লকডাউন বাদ দিয়ে শ্রীমঙ্গলকে করোনা থেকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করা জরুরি, শুধু আলোচনাই নয়, প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার আহবান করছি।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী এসকে সুমন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আসলে শ্রীমঙ্গলের লকডাউন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পরেছে। সবই ঠিকঠাক চলছে শুধু মুখে মুখেই এসব লকডাউনের প্রচারণা হচ্ছে, সত্যিকারের লকডাউন থাকলে এ সব ব্যাক্তিরা শহরে ঢুকছে কিভাবে? শ্রীমঙ্গলকে পুরো লকডাউন করা হোক। এখনো অনেক সময় আছে হাতে। পরে আর কিছুই করার থাকবে না। প্রশাসন কঠোর সিদ্ধান্ত নিক।
এদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বললে তারা জানান, শ্রীমঙ্গলে লছনা চেকপোস্টের ওইপাশে সাতগাঁও চা ফ্যাক্টরি থাকার কারনে তারা কৌশলী হয়ে কখনও চা শ্রমিক কখনও লাকড়ি ব্যবসায়ী বলে পুলিশকে পরিচয় দিচ্ছেন। চা বাগান খোলা থাকায় এই সুযোগটি তারা নিতে পারছেন বলেও মজার ছলে জানান তারা।
লকডাউনের এই অবস্থা কেন? জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) সার্কেল আশরাফুজ্জামান বলেন, আমরা সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছি মানুষের জন্য কিন্তু সেই মানুষই যদি সচেতন না হয় তাহলে কীভাবে হবে? মানুষজন বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে শহরে প্রবেশ করে।
যতক্ষন আমাদের জীবন আছে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু তারপরও লোকজন সচেতন না হলে আমরা আসলে কী করব? বিভিন্ন ফাঁড়ি রাস্তা ও তথ্য গোপন করে লোকজন শহরে আসে কিন্তু আমরা তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই সেখানে ছুটে যাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই।
আপনার মন্তব্য