০৭ অক্টোবর, ২০১৫ ২২:৪৮
নিউইর্য়কের ঝলমলে শহরে দিন রাত সবই সমান মনে হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা মানুষ চলাচল করছে। সবাই ব্যস্ত। যে দিকে তাকাই উঁচু উঁচু বিল্ডিং। মনে মনে মাটি খুঁজেছি, কোথাও পাইনি।
কথাগুলো বলছিল জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র শিশু প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেয়া অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী মনি বেগম।
মনি জানায়, সেভ দ্যা চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকা আহসানিয়া মিশন সারা দেশব্যাপী এভরি ওয়ান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। বাল্য বিয়ে, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা, শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া প্রতিরোধে তারা প্রথমে তিনমাসের প্রশিক্ষণ দেয়। ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার পরে তাকে ইয়ুথ লিডার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকায় পরীক্ষার মাধ্যমে সারাদেশের মধ্য থেকে তাকে জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেয়ার জন্য বাছাই করা হয়।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর মনি নিউইর্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্ব শিশু অধিকার সম্মেলনে বক্তব্য দেয়। মনি তার দেয়া বক্তব্যে বাল্যবিয়ে, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা, শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া প্রতিরোধ, কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের বিষয়ে আলোকপাত করে।
তবে তার বক্তব্যের মূল ফোকাস ছিল বাল্যবিয়ে। সেখানে সে একটি স্লোগান দেয়, যেটি ছিল ‘Let her Grow’ তাকে বাড়তে দাও। তাকে বড় হতে দাও। এছাড়াও সে ‘No Child Left Behind’ অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পায়। ডেভিড ক্যামেরুন বিশ্বব্যাপী লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে তার সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ছাড়াও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি, জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মিস মার্থা সেন্টোন পেইস, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরীসহ সেফ দ্যা চিলড্রেনের ৫ জন সিইও’র সাথে মতবিনিময় করে মনি।
নিউইয়র্কে ৮দিনের অবস্থান সর্ম্পকে মনি বেগম জানায়, ওখানে ইট পাথরের ঝলমলে শহরে মাটি খুঁজে পাইনি। রাত দিন সব সমান মনে হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা মানুষ চলাচল করছে। সবাই ব্যস্ত। যে দিকে তাকাই উঁচু উঁচু বিল্ডিং। মনে মনে মাটি খুঁজেছি, কোথাও পাইনি। এমনিতে ভালোই লেগেছে। বাসে করে ঘুরে বেড়িয়েছি। প্রতিদিন মা-বাবার সাথে ফোনে কথা বলেছি। হোটেল হলিডে ইনের পাশেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রুচি। প্রতিদিন ভাত খেয়েছি। ভাত ছাড়া অন্যকিছু ভালো লাগতো না।
জাতিসংঘে গিয়ে কী শিখলে এমন প্রশ্নের জবাবে মনি বেগম বলে, ‘আমরা শিশু আমাদের বড় হতে দিতে হবে। শিশুদের জন্য সুন্দর একটি পরিবেশ করে দিতে হবে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। মেয়েদের অন্ধকারের মধ্যে রেখে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র উন্নয়ন করতে পারবে না। যেকোনো দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে পেছনে ফেলে রেখে কখনই সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।’
বড় হয়ে কি হতে চাও? এমন এক প্রশ্নের জবাবে মনি বলে, ‘বড় হয়ে আমি একজন পাইলট হতে চাই। তবে আইনজীবী হওয়ারও ইচ্ছা আছে। আর মাঝে মাঝে সঙ্গীত চর্চা করব।’
মনি বেগমের বাবা মরম মিয়া বলেন, ‘মনি অনেক বাধা বিপত্তি পাড় করেছে। সংগ্রাম করেছে। তার এ সাফল্যে আমরা আজ গর্বিত।’
সেভ দ্যা চিলড্রেনের উদ্যোগে বিশ্বের ১৯টি দেশ থেকে আসা ১৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে মনি বেগম। সাথে গাইড হিসেবে ছিলেন সেভ দ্যা চিলড্রেনের সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার তাহরীম জিনাত চৌধুরী।
তাহরীম জিনাত চৌধুরী বলেন, যেহেতু একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে এসেছেন অনেকেই মনে করেছিলেন মনি তার সফরসঙ্গী। বিষয়টি আসলে সেটা নয়। সেভ দ্যা চিলড্রেনের উদ্যোগেই মনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যায়। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সে শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, বাল্যবিয়ে রোধ, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মা ও শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, শিশু নির্যাতন বন্ধসহ শিশুবিষয়ক নানা কথা তুলে ধরে বক্তব্য দেন বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে।
আহসানিয়া মিশনের এভরি ওয়ান ক্যাম্পেইন প্রকল্পের সমন্বয়কারী মো. জাহাঙ্গির হোসেন জানান, মনি আমাদের প্রতিনিধি হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পেইন করবে। আমরা তাকে বাছাইকালে কুলাউড়াসহ ৩টি উপজেলায় কাজ করি। সেখান থেকে তাকে বাছাই করে জাতিসংঘে পাঠাই।
উল্লেখ্য, মনি বেগম মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ঘড়গাঁও গ্রামের মেয়ে। বাবার নাম মরম আলী ও মা হাওয়া বেগম। মনি ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট। স্থানীয় সুলতানপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী।
জাতীসংঘের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মনি বেগম ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ও ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বাড়িতে ফিরে আসে।
আপনার মন্তব্য