১৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:০৯
শেখ রবিউল আলম। ছবি: ফেসবুক
দীপ্ত টিভির সম্প্রচার কর্মকর্তা তানজিল জাহান ইসলাম তামীম হত্যা মামলার এজাহারে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের নাম থাকলেও চার্জশিটে তার নাম বাদ পড়েছে। এর ফলে তিনি আলোচিত এই হত্যা মামলা থেকে মুক্ত হয়েছেন।
তামীমের পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করা হয়েছে। মামলা থেকে রবিউলকে অব্যাহতি দেওয়ায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
ঢাকার রামপুরা মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে ডেভেলপার কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর খুন হন তামীম। ঘটনার পর তার বাবা সুলতান আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মামুনকে প্রধান আসামি এবং ‘প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজ’-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউলকে তিন নম্বর আসামি করা হয়।
মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত হাতিরঝিল থানা পুলিশ করলেও পরে তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে স্থানান্তর করা হয়। পিবিআই আদালতে যে চার্জশিট জমা দেয়, তাতে ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও রবিউল ও মামুনের নাম বাদ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জাকারিয়া আলম বলেন, ‘ঘটনায় কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় মোহাম্মদ মামুন ও শেখ রবিউল আলমসহ কয়েকজনের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
বাদীর নারাজি আবেদন উপেক্ষার বিষয়ে জাকারিয়া বলেন, ‘আমি তদন্তে যা পেয়েছি, সেটাই জমা দিয়েছি। আর ঘটনাটি বেশ আগের হওয়ায় অনেক কিছু এখন আমার স্পষ্ট মনে নেই।’
তদন্তের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তামীমের বাবা সুলতান আহমেদ বলেন, ঘটনার মূল জায়গাতেই হাত দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘বিরোধটা ছিল ফ্ল্যাট বিক্রেতা আর ফ্ল্যাটের দখল নেওয়া মানুষের মধ্যে। মূল ঘটনা তাদের নিয়েই। কিন্তু তাদের নামই চার্জশিট থেকে গায়েব করে দেওয়া হলো। টাকা আর ক্ষমতার জোরে সব কিছু ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
ঘটনার পটভূমি বর্ণনা করে সুলতান জানান, মহানগর প্রজেক্টের ডি-ব্লকে নিজেদের যৌথ জমিতে নয়তলা ভবন তৈরির জন্য তিনিসহ তিনজন জমির মালিক প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজের সঙ্গে চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী ২৭টি ফ্ল্যাটের মধ্যে প্রত্যেক জমির মালিককে পাঁচটি করে ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি পান মাত্র দুটি ফ্ল্যাট।
সুলতানের অভিযোগ, রবিউল বাকি তিনটি ফ্ল্যাটের মধ্যে একটি ফ্ল্যাট মামুনের শাশুড়ির কাছে বিক্রি করে দেন এবং অন্য দুটি ফ্ল্যাট প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজের দখলে রাখেন। ঘটনার দিন তামীম ও তার বাবা ওই দুটি ফ্ল্যাটের ভেতরের কাজ (ইন্টেরিয়র) করাতে গেলে প্লিজেন্ট প্রোপার্টিজের কর্মচারীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে গুরুতর আহত হন তামীম। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরপরই সংঘর্ষের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে রহস্যজনকভাবে মুছে যায়। মামলায় নাম আসার পর সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মামুন দাবি করেন, মূল বিরোধ ছিল জমির মালিক আর ডেভেলপার কোম্পানির। ঘটনার সময় তিনি নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরেই ছিলেন।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে মামুনের দাবি, সেটি ছিল তার ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ। কেউ একজন তার বাসায় ঢুকে ফুটেজ থাকা ডিভিআর মেশিন চুরি করে নিয়ে গেছে।
তবে হাতিরঝিল থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আরাফাত বিন ইউসুফ জানান, তিনি তদন্তের সময় সেই ডিভিআর পাননি।
ঘটনার দুই দিন পর তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার রুহুল কবির খান জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক তদন্তে মামুন ও বিএনপি নেতা রবিউলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাতিরঝিল থানা পুলিশ শুরুতে মো. কুরবান আলী, মাহিন, বন্ধন ও রাসেল নামের চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়।
অন্যদিকে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিএনপি রবিউলের দলীয় পদ স্থগিত করে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার পদ স্থগিত থাকবে। তবে পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর বিএনপি তাকে ঢাকা-১০ আসনে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।
এক বিবৃতিতে রবিউল দাবি করেন, ঘটনাটি শুধুই ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে ঘটেছে, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি নিজে ঘটনাস্থলে থাকার কথা অস্বীকার ও জোরপূর্বক দখল বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তামীমের ভাই শামভিল জাহান জানান, তাদের পরিবার এখন আদালতে নারাজি আবেদনের শুনানির অপেক্ষায় আছে।
রবিউল ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়েছেন কি না এ প্রসঙ্গে শামভিল বলেন, ‘এখন বলা কঠিন। তারা এখন ক্ষমতায় আছেন, এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামুনের ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অন্যদিকে রবিউলের ফোনে যোগাযোগ করা হলে অন্য এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, ‘তিনি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত আছেন।’
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ।
আপনার মন্তব্য