সিলেটটুডে ডেস্ক

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৯

দেশে ৪৫ হাজার ধারণক্ষমতার ৭৫ কারাগারে বন্দি ১ লাখ ৬ হাজার

প্রতীকী ছবি

নানা অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাগারে রাখা হয়। আবার মামলা চলা অবস্থায় জামিন না পাওয়া আসামিরাও বন্দি থাকেন। থাকেন রাজনৈতিক মামলার আসামিরাও। বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার আড়াইগুণের বেশি বন্দি রয়েছেন। এর একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দি রাজনৈতিক কারণে অন্তরীণ। মাসের পর মাস জামিন হচ্ছে না।

দেশে ৭৫টি কারাগার আছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার, ৬০টি জেলা কারাগার। এ কারাগারগুলোতে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। কিন্তু গতকালের (২৯ সেপ্টেম্বর) হিসাবে বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি। ধারণক্ষমতার চাইতে বন্দি বেশি থাকে বেশিরভাগ সময়, তবে সেটা আগে লাখ ছাড়ায়নি।

সম্প্রতি কারাগারে থাকা বন্দিদের মৃত্যুর হার বেড়েছে। এর বেশিরভাগ লোকই রাজনৈতিক মামলায় বন্দি। বেড়েছে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর সংখ্যাও। অনেক ক্ষেত্রেই বন্দির বয়স বেশি নয়। অর্থাৎ অকালমৃত্যু হচ্ছে। এর একটা উল্লেখযোগগ্য সংখ্যক চব্বিশের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা।

কারা অধিদপ্তর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর ৯ মাসে ১২৩৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান অন্তত ৩০০ জন বন্দি।

কারা অধিদপ্তরের গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হিসাব এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ চলতি বছরের শুরু থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে চলতি বছর মাসে গড় মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২৮ জনের। ৫ বছর ৯ মাসের হিসাবে, মাসে গড় মৃত্যু প্রায় ১৮। দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর বন্দি–মৃত্যু বেশি।

কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে তাদের ‘মিশন’ হিসেবে লেখা রয়েছে পাঁচটি বিষয়। সেগুলো হলো বন্দিদের নিরাপদ আটক নিশ্চিত করা; কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা ও বন্দিদের মাঝে শৃঙ্খলা বজায় রাখা; বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, যথাযথভাবে তাদের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা এবং একজন সুনাগরিক হিসেবে সমাজে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মোটিভেশন (উৎসাহ) ও প্রশিক্ষণ দেওয়া।

একজনের জায়গায় আড়াইজনের কাছাকাছি বন্দি রেখে যথাযথভাবে বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা–সুবিধা দেওয়া সম্ভব কি না এনিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কারাগারগুলোতে বছরওয়ারি কত বন্দি ছিলেন, তার একটি হিসাব পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ নামের একটি ওয়েবসাইটে। সেখানে প্রতি দুই বছর অন্তর বন্দির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০১৪ সালে কারাগারে বন্দি ছিলেন ৬৫ হাজার ৬৬২ জন। এর পর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে বন্দি ছিলেন ৮৮ হাজারের মতো।

ওয়েবসাইটটিতে ২০০০ সাল থেকে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বন্দির সংখ্যা কখনো লাখ ছাড়ায়নি। অবশ্য চলতি মাস সেপ্টেম্বরের হিসাবে বন্দি ১ লাখ ২ হাজারের কিছু বেশি। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে যা আরও ৪ হাজার বেড়েছে। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বন্দির সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার।

কারা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রেপ্তার বেশি হচ্ছে। মাদক মামলা, ছিনতাই, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলায়ও অনেককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মামলায় বন্দি থাকা অনেকে দিনের পর দিন জামিন পাচ্ছেন না। এতে কারাগারে বন্দি বাড়ছে।

৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স আছে ২৭টি। কারা হাসপাতাল থেকে বাইরের কোনো হাসপাতালে অসুস্থ বন্দিকে পাঠাতে হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অন্য যানবাহনে করে পাঠাতে হয়। এসব যানবাহনে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে না।
চিকিৎসক–সংকট। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮। তবে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আরেকজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছেন।

কারা সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কারা হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে ১০১ জন চিকিৎসক পাঠানো হয়। তারা দিনে কয়েক ঘণ্টা করে হাসপাতালে থাকেন। ফলে দুপুরের পর থেকে কোনো বন্দি অসুস্থ হলে তাদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিনীতা রায় বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ১৩ হাজার বন্দি আছেন। এই কারা হাসপাতালে থাকার কথা ৭ জন চিকিৎসকের। তিনিসহ দুজন চিকিৎসক এখানে সংযুক্ত অবস্থায় আছেন। তিনি বলেন, এই কারা হাসপাতালে বিশেষায়িত কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না। অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসার জন্য এখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিসহ ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবলের অভাবে রোগ পরীক্ষা খুব কম হয়।

নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা। তবে তা নেই। নারী বন্দি আছেন তিন হাজারের মতো। নেই কোনো গাইনি চিকিৎসক।

২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজুলেশন ৭০/১৭৫-এর মাধ্যমে বন্দিদের প্রতি আচরণের জন্য জাতিসংঘের ন্যূনতম মানদণ্ড (ইউনাইটেড ন্যাশনস স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনার্স) গ্রহণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নামকরণ করে নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসের মূল বক্তব্য হলো, বন্দিকে অমানবিক পরিবেশে রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কোনোভাবেই শাস্তির অংশ হতে পারে না। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বন্দির জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রেরই।

মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান ধারণক্ষমতার বেশি বন্দির চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বলেন, বন্দিরা কারাগারে রাষ্ট্রীয় ও নিরাপদ হেফাজতে আছেন ধরে নিতে হবে। আইন অনুযায়ী তার যতটুকু খাবার পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ খাবার দেওয়া, যতটুকু ঘুমানোর জায়গার দরকার, তা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ কারাগারে ১০ জনের জায়গায় ১৫ জন গাদাগাদি করে থাকছেন। সন্ধ্যার পর কারাগারে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকে (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) আক্রান্ত হলে বন্দির জরুরি চিকিৎসার দরকার হয়। চিকিৎসক–সংকটে তা দেওয়া যায় না। রাতে কোনো বন্দি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স বা পরিবহন সংকটের কারণে তাদের স্থানান্তর করা যায় না। এসব মৃত্যু নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। এর দায় রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। এসব অপরাধমূলক অবহেলা।

ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, কোনো মৃত্যু কাম্য নয়। বর্তমানে বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স–সংকট চলছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে আসা চিকিৎসকেরাও দুই ঘণ্টার বেশি কারা হাসপাতালে থাকেন না। প্রয়োজনের সময় যানবাহন ভাড়া করে বাইরের হাসপাতালে বন্দি রোগীকে পাঠাতে দেরি হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত