১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:২৭
প্রবাসীবহুল অঞ্চল সিলেট। এখানকার অর্থনীতি, সংস্কৃতির মতো রাজনীতিরও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন প্রবাসীরা। নির্বাচন এলে সেই প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এখানকার প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের অন্যতম যোগানদাতা এই প্রবাসীরা।
তবে এখন আর কেবল স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীদের অর্থ সহায়তা দিয়েই ক্ষান্ত নন প্রবাসীরা, নিজেরাই এখন প্রার্থী হচ্ছেন নির্বাচনে। আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসী প্রার্থীদের আধিক্য থাকলেও ইদানীংকালে জাতীয় নির্বাচনেও আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন তারা। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ৬টি আসন থেকে এক ডজন প্রবাসী প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেতে মাঠে তৎপর রয়েছেন।
মনোনয়ন দৌড়ে থাকা এসব প্রবাসীদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতা। বিএনপিরও আছেন কয়েকজন।
প্রবাসী প্রার্থীদের আধিক্যের কারণে নির্বাচনে অর্থের অবাধ ছড়াছড়ি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অতীতে দেখেছি প্রবাসীরা প্রার্থী হলে অনেকক্ষেত্রে তারা অর্থের জোড়ে ভোট কিনে নিতে চান। এতে নির্বাচনী পরিবেশই নষ্ট হয়। আবার অনেকে আছেন সাড়ে চার বছরই এলাকার জনগণের কোনো খোঁজ নেন না। কেবল নির্বাচন এলেই তাদের মুখ দেখা যায়। অর্থ আর লবিংয়ের জোরে তারা মনোনয়ন পেতে তৎপর হয়ে ওঠেন।
তিনি বলেন, এলাকাবাসীর সাথে যার যোগাযোগ নেই, মানুষ যাকে সবসময় কাছে পায় না; ভোটাররা নিশ্চয়ই এমন নেতাকে নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে চাইবে না।
তবে প্রবাসীদের দেশের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা হওয়াকে ইতিবাচক মনে করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তিনি বলেন, প্রবাসীরা যে বিদেশ গিয়ে দেশকে ভুলে যাননি, দেশের কথা ভাবেন, তাদের প্রার্থী হতে চাওয়া এটাই প্রমাণ করে। তারা এখানকার অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করলে রাজনীতিতেও কেনো সক্রিয় হতে পারবেন না প্রশ্ন রেখে মিসবাহ সিরাজ বলেন, তবে যারা প্রার্থী হতে চান তাদের অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থের কথা না ভেবে জনকল্যাণে মনোযোগী হতে হবে।
দশম সংসদ নির্বাচনেও সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে দুটি আসন থেকে প্রবাসী প্রার্থীরা সাংসদ নির্বাচিত হন। সিলেট-২ আসন থেকে ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া ও সিলেট-৫ আসন থেকে সেলিম উদ্দিন বিএনপিবিহীন গত নির্বাচনেই প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন। যুক্তরাজ্য প্রবাসী এই দুই সাংসদ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা।
এবারও এই দু’জন জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ দু’জন ছাড়া এবার মনোনয়ন পেতে মাঠে তৎপর রয়েছেন আরও কয়েকজন প্রবাসী। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর-বালাগঞ্জ) আসনের মনোনয়ন চান যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এই আসনের সাবেক সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীও যুক্তরাজ্য প্রবাসী। তিনি এবারও এই আসনে দলের মনোনয়ন চান। তবে পরিবার প্রবাসে থাকলেও দীর্ঘদিন দেশে অবস্থান করেই রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন শফিক।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, যুক্তরাজ্য প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার মনির হোসেন ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম।
সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ) আসনের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য যুক্তরাজ্য প্রবাসী এটিইউ তাজ রহমান।
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে বর্তমান সাংসদ প্রবাসী সেলিম উদ্দিন ছাড়াও যুক্তরাজ্য প্রবাসী এম জাকির হোসেনও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে মাঠে তৎপর রয়েছেন।
সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে তৎপর রয়েছেন কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরওয়ার হোসেন। এছাড়া এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান ফ্রান্স আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা চৌধুরী সালেহ আহমদ, লন্ডন ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, লন্ডন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফছার খাঁন সাদেক ও যুক্তরাজ্য স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সামসুল ইসলাম বাচ্চু।
এসব প্রবাসী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন থেকে দেশে অবস্থান করে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনী মৌসুমে দেশে এসে মনোনয়ন পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আমি দেশে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। প্রবাস থেকে দেশে এসে দীর্ঘদিন ধরে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের পাশে রয়েছি। জনমতও আমার পক্ষে আছে। আশা করছি, জনমত আমলে নিয়ে দলীয় প্রধান আমাকে মূল্যায়িত করবেন।
নির্বাচিত হলে প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করার কথা জানিয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা দেশে এসে নানাসময় হেনস্তার শিকার হন। আমি এগুলো লাঘবে চেষ্টা করবো। এছাড়া দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে থাকায় সেখানকার বাঙালিদের সাথে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচিত হলে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে আমি ভূমিকা রাখতে পারবো।
সিলেট-২ আসনের বর্তমান সাংসদ প্রবাসী ইয়াহইয়া চৌধুরী বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের সবচেয়ে প্রবাসীবহুল অঞ্চল। প্রবাসীদের প্রতিনিধি হিসেবেই আমি সংসদে আছি। তাদের সমস্যা-সঙ্কট নিরসনে আমি অতীতে কাজ করেছি। আশা করছি, আগামী দিনেও জনগণ আমাকে নির্বাচিত করবেন।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যে আসনের সাংসদ, সেই সিলেট-৬ আসনে এবার মনোনয়ন চান কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরওয়ার হোসেন। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে থেকে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন সরওয়ার। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে প্রবাসীদের দেশমুখী করাই হবে আমার প্রধান কাজ। তারা দেশে এসে যেসব হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হন তা নিরসনেও কাজ করে যাবো।
আপনার মন্তব্য