আজ রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

Advertise

তোফায়েল আহমেদ এবং একটি চেয়ার

জাহিদ নেওয়াজ খান  

সম্ভবত ১৯৭৬ সাল। আমার তখন ছয় বছর বয়স। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার এক খালু ভর্তি। তাকে দেখতে গিয়ে হাসপাতালের লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি অন্যপাশে কেবিন ব্লকের বারান্দায় চেয়ারে বসে একজন রোদ পোহাচ্ছেন। রোদ পোহানো ব্যক্তিটি আমার শিশুমনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। চোখ কেড়েছে লোকটার দু'পাশে দাঁড়ানো দুজন পুলিশের উপস্থিতি।

হাসপাতালে পুলিশ কেন?

একজন জানালেন, একজন রাজবন্দি সেখানে, তাই পুলিশ।

রাজবন্দি শব্দটা ততদিনে জানা। কিন্তু এর অর্থ আমি জানতাম, যে রাজা বন্দি তিনি রাজবন্দি। এর মানে ওই বারান্দায় একজন রাজা। পরে জেনেছিলাম সেই রাজার নাম তোফায়েল আহমেদ। আরও পরে বুঝেছিলাম যে তিনি রাজা না হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির রাজপুত্তুর তিনি।

এরও পরে পত্রিকায় তাঁর ছবি দেখেছি অনেক, খবরে তার বক্তৃতাও পড়েছি।

সেই মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম মুখোমুখি দেখা ১৯৯২ সালে, সম্ভবত ডিসেম্বর মাসে।

তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষ শেষ করছি, কিন্তু দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। অ্যাসাইনমেন্টটা 'লক্ষ্মী ভাই' ডেকে সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী দিয়েছিলেন নাকি আমাকে তুই করে ডাকা চিফ রিপোর্টার বদিউল আলম ভাই, মনে করতে পারছি না।

বাবরী মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ভোলাতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে সেটা সরেজমিন দেখতে একটা দল সেখানে যাচ্ছে, আমার অ্যাসাইনমেন্ট তাদের সঙ্গী হয়ে রিপোর্ট করা। একটা লঞ্চের নাম বলে জানিয়ে দেওয়া হলো সদরঘাট গিয়ে ওই লঞ্চে উঠে তোফায়েল আহমেদের নাম বললেই যাওয়ার সব ব্যবস্থা হবে।

লঞ্চে উঠে বলার পর আমাকে একটা টুইন কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে যাকে পেলাম তাকে দেখে একটু ভড়কেই গেলাম। বাংলার বাণীর অনেক সিনিয়র একজন সাংবাদিক, সুভাষ চন্দ বাদল। লঞ্চ ছাড়ার আগেই ভয়-টয় কেটে গেল। বাদলদা এমন মানুষ যিনি সবাইকে আপন করে নেন, তার উপর তিনি জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই।

কিছুক্ষণ পর দৌড়াদৌড়ি হুড়োহুড়িতে বুঝলাম তোফায়েল আহমেদ লঞ্চে উঠেছেন।

রাতে খাবারের সময় তাঁর সঙ্গে প্রথম সরাসরি সাক্ষাত। বাদলদাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি এত ছোট একজন মানুষ, কিন্তু তোফায়েল ভাই যথেষ্ট সম্মান আর আদরের সঙ্গে তাঁর পাশে বসালেন (তখনও রাজনীতিকদের স্যার বলার চল আসেনি, আমিও প্রথম দেখা থেকেই তাঁকে ভাই বলেই সম্বোধন করলাম।)

সেখানে আরও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, ন্যাপের পঙ্কজ ভট্টাচার্য, গণতন্ত্রী পার্টির সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং লেখক-সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ (সবাই আজ প্রয়াত)।

মানিক ভাই আমাকে আপনি আপনি করছিলেন বলে তোফায়েল ভাই বললেন, এ ত বাচ্চা ছেলে, এখনো ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মানিক ভাই বললেন, ছাত্র ইউনিয়ন জীবন থেকে সবাইকে আপনি বলার অভ্যাস, এই বয়সে এসে আর চেঞ্জ করতে পারব না।
এরকম নানা কথায় রাতের খাবার শেষে কেবিনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ভোলার লঞ্চ ঘাটে নেমে দেখি বিরাট ব্যাপার। তোফায়েল আহমেদ তখন বিরোধীদলীয় এমপি, কিন্তু এমন কোনো সরকারি দপ্তর নেই যে তাঁর জন্য গাড়ি পাঠায়নি।

পরের দু'দিন ওই টিমের সঙ্গে ভোলার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েছি। নির্যাতনের শিকার হিন্দু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলেছি। এর মধ্যে রেপ ভিকটিমও ছিলেন।

তবে সব কথা যে লিখতে পেরেছি, এমন না। সব মিলে তিনটা নিউজ করতে পেরেছিলাম। একটা তাদের ভিজিট, একটা এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ঘরবাড়ি ছাড়া হওয়ার কারণে ফরম ফিল-আপ করতে পারছে না (তাও ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে), আর ঢাকায় ফিরে একটা লিড যার শিরোনাম হয়েছিল ভোলায় খাদ্যাভাবের আশঙ্কা (সরাসরি বলা যাবে না, তাই ওইরকম শিরোনাম)।

এত সব কথা বলা একটা ঘটনা বলার জন্য। সে সফরে ভোলাতে আমরা তোফায়েল ভাইয়ের বাসাতেই ছিলাম। পরিবারের অন্যরা তখন হয়ত ঢাকাতে ছিলেন।

দ্বিতীয় দিন তোফায়েল ভাইয়ের বেডরুমে বসে সবাই কথা বলছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম নাকি বসে ছিলাম মনে নেই। হঠাৎ তোফায়েল ভাই বললেন, এই ছেলে তুমি ত চড়াই পাখির মতো চঞ্চল, খালি এদিক ওদিক নড়াচড়া করো। একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ভুলেও যেন ওটায় বসে না পড়ো। ওই চেয়ারটায় শুধু আম্মা বসেন, আর নেত্রী আসলে নেত্রী।

ওই চেয়ার নিয়ে সেদিন অনেক কথা হয়েছিল। তিনি হয়ত আমাকে বলে অন্যদেরও সেই চেয়ারের মাহাত্ম্য বুঝিয়েছিলেন। ওই কথায় একটা মেসেজ ছিল। সেটা যারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের রসায়ন জানেন, তারা বুঝতে পারবেন।

এরপর ইউএনবিতে থাকার সময় আমি অনেকবার ভোলাতে তার সফরসঙ্গী হয়েছি, চিফ রিপোর্টার শামীম ভাই বেশিরভাগ সময় আমাকে পাঠাতেন (বদিউল আলম ভাইয়ের মতো শামীম ভাইও প্রয়াত)। না গেলেও উনার পিআরও বিজনদা নিউজ পাঠিয়ে দিতেন। আর তোফায়েল ভাই মাঝেমধ্যে পাঠাতেন ভোলার ঘুইংগার হাটের বিখ্যাত মিষ্টি। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, মিষ্টি খেয়ে বউমা কী বলে? আমি বললাম, বউমা কোথায়? মানে তখনো আমি বিয়ে করিনি। তখন তিনি হাসতে হাসতে বললেন, মিষ্টি তাহলে কে খায়? আমি বললাম, অফিস। তখন তিনি বললেন, মিষ্টি ত তাহলে বেশি পাঠাতে হবে।

ইউএনবি অফিসে মিষ্টি পাঠানো তোফায়েল ভাইও একজন মিষ্টি রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনীতিবিদদের ভুল-ত্রুটি থাকবে। তিনিও এর বাইরে ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। আজ (১ জুন) তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তোফায়েল আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

জাহিদ নেওয়াজ খান, সম্পাদক, চ্যানেল আই অনলাইন ও বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর