শুক্রবার, , ১৬ নভেম্বর ২০১৮ ইং

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:৪২

অবসর না নির্বাচন, কী করবেন মুহিত?

জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বারবার নিজের মত পালটাচ্ছেন সিলেট-১ আসনের সাংসদ ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কখনও অবসরের ঘোষণা দিয়ে আর প্রার্থী না হওয়ার কথা বলেছেন। আবার কখনও আবারও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা জানাচ্ছেন মুহিত।

ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- শেষ পর্যন্ত কি করবেন মুহিত? সত্যি সত্যি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করবেন নাকি আবারও প্রার্থী হবেন ৮৫ বছর বয়সী এই অর্থমন্ত্রী?

২০০১ সালে সিলেট-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করে হেরে যান মুহিত। ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক এই আমলা। পরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এরআগেও এরশাদ সরকারের আমলে দুই বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে জড়ানো মুহিত।

২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনের আগেও আর প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন মুহিত। বয়সজনিত কারণে অবসরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

তারও আগে একবার মুহিত বলেছিলেন, ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেও আর মন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চান না তিনি।

যদিও সে বছর নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে পুনরায় সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য হন মুহিত। ফের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও পরে তাঁর উপর।

নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়ে ফের নির্বাচিত হওয়া ও মন্ত্রিত্ব গ্রহণ প্রসঙ্গে সে সময় মুহিত বলেছিলেন- ‌'প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে তো না করা যায় না'।

একাদশ নির্বাচনের অনেকদিন আগে থেকেই মুহিত আর নির্বাচন না করার কথা বলে আসছেন। রাজনীতি থেকে অবসরের ইচ্ছার কথাও বলেছেন একাধিকবার। সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ও নিয়েছেন। এরপর আবারও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক।

২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, 'আই উইল রিটায়ার ইন টু থাউজ্যান্ড এইটটিন। আই থিংক ইট উইলবি গুড টাইম। দ্যাট টাইম আই উইল বি এইটি ফাইভ। (আমি ২০১৮ সালে অবসরে যাব। আমি মনে করি এটা একটা ভাল সময়। তখন আমার বয়স হবে ৮৫।)'

সেদিন ‘পৃথিবীর কোথাও আমার বয়সী কোনো অর্থমন্ত্রী আপনি পাবেন না’ জানিয়ে মুহিত বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবসরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথাও বলেছেন তিনি।

এ বছরের ৬ সেপ্টেম্বর সচিবালয়েই সাংবাদিকদের মুহিত বলেছিলেন- 'আমি আর নির্বাচন করছি না। এটা মোটামুটি নিশ্চিত। আমার পরিবর্তে সিলেট-১ আসন থেকে আমার ছোট ভাই মোমেন (জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন) নির্বাচন করবে। তার প্রতি আমার সমর্থন আছে এবং থাকবে। তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বোর্ড ওই আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, তিনি প্রার্থী হবেন না, তবে মনোনয়ন পত্র সাবমিট (জমা দেওয়া) করবেন।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে আবার সুর পালটেছেন অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত। এবার বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও প্রার্থী হবেন না।

এরপর ২৩ অক্টোবর দশম সংসদের শেষ অধিবেশনে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমি আর নির্বাচন করবো না। সংসদে এটাই আমার শেষ বক্তৃতা।

সেদিন তিনি নিজেই জানান, অবসরে যাচ্ছেন তিনি। সবার কাছে এ জন্য দোয়াও চান।

মুহিত অবসরে যাচ্ছেন এমনটি ধরে নিয়ে সিলেট-১ আসনে কে হচ্ছেন আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কয়েকজন প্রকাশ্যে প্রচারণায়ও নামেন।

এসবের মধ্যে গত ২৬ অক্টোবর সিলেটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনে এসে ভিন্ন তথ্য নিয়ে হাজির হন বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ।

তিনি জানান, আগামী নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে থেকে আবুল মাল আবদুল মুহিতই প্রার্থী হবেন।

তোফায়েলের এমন বক্তব্যের পর সুর পাল্টান মুহিতও। সংসদে অবসর নেওয়ার ঘোষণার এক সপ্তাহের ব্যবধানে গত ১ নভেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুহিত জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন তিনি। তবে এ কথাও জানান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নেবেন। সে নির্দেশনা মানবেন তিনি।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মুহিত বলেন, ''নির্বাচনে আমি তো দাঁড়াব না, দ্যাটস মাই ডিসিশন। আমি নমিনেশন পেপার সাবমিট করব। ডামি কিছু সাবমিট করতে হয়। যদি আমার ক্যান্ডিডেট যে হবে সে মিস করে যায় তাহলে আমাকে দাঁড়াতে হবে… এ রকম ধরনের। ইট ইজ এ রুটিন ব্যাপার।”

কেন নির্বাচনে দাঁড়াবেন না- সেই প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমি অবসর নিতে চাই, আমার মনে হয় আমার অবসর নেওয়া উচিত।”

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে মুহিতের একেক সময় এই একেক ধরণের কথায় বিপাকে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরাও। তিনি প্রার্থী হবেন কী হবেন না এ নিয়ে সন্দিহান তাঁরাও। ইতোমধ্যে মুহিতের পক্ষে নগরীতে প্রচারণায় নেমে গেছেন তাঁর অনুসারীরা। 'আবুল মাল আবদুল মুহিতকে আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাই' -এমন দাবি জানিয়ে নগরীতে পোস্টার-ফেস্টুন সাঁটিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী হিসেবে মোট ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন মুহিত।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানে ওয়াশিংটন দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। আর প্রবাসী বাংলাদেশি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মুহিত। ১৯৮১ সালে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। ১৯৮২ থেকে ৮৩ সালে এরশাদ সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চপদে চাকরি করেন তিনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত