১০ অক্টোবর, ২০২৫ ১৯:২৯
[২০২০ সালে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তাঁর ওইদিনকার বক্তৃতা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশংসিত হয়। আজ প্রয়াত হয়েছেন সিলেটে জন্ম নেওয়া এই লেখক-শিক্ষাবিদ। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় শাবিপ্রবির সমাবর্তনে দেওয়া তাঁর বক্তৃতার চুম্বক পুণঃ প্রকাশ করা হলো।]
সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে মনজুরুল ইসলাম বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতে পারে না। বরং চিন্তা যত বিবিধ হয়, যত বিচিত্র হয়, যত বহু পথে পরিব্যাপ্ত হয় তত এর শক্তি বাড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কয়েকটি প্রকোষ্টে জ্ঞানকে বিষয় নির্দিষ্ট করে বিশেষজ্ঞ তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরীক্ষা ও ছক বাঁধা গবেষণা কার্যক্রম। এবং ঘণ্টা মেপে পাঠ সমাপনের আয়োজন। ফলে একদিকে যেমন বিষয় অনুযায়ী চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অর্থাৎ পাঠ্যবইকেন্দ্রিক তথ্য সকলে জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করে তা দিয়ে চিন্তাকে সাজাচ্ছে, অন্যদিকে পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। হচ্ছে না কারণ আমাদের প্রচলিত শিখন ও শিক্ষা পদ্ধতি তা হতে দেয় না।
তিনি বলেন, চিন্তার গভীরতা, বৈচিত্র্য, গতিশীলতা এবং দূরগামীতা না থাকলে নতুন জ্ঞান তৈরি হয় না। আমরা ভালো মানের পরীক্ষার্থী তৈরিতে যতোটা উদ্যোগী, শিক্ষার্থী তৈরিতে ততোটাই অমনোযোগী। অথচ প্রকৃত শিক্ষাই পারে মানুষকে তার সীমাবদ্ধ জীবন থেকে বের করে বৃহতের সন্ধান দিতে।
চিন্তায় স্বকীয়তা না থাকলে, ছকের বাইরে দাড়িয়ে চিন্তা করতে না পারলে নতুনের আবির্ভাব ঘটে না। সমাজে স্থিতাবস্থা বিরাজ করে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী নতুন চিন্তা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে? চিন্তার সাথে চিন্তার সৃষ্টিশীল দ্বন্দ্ব, এমনকি ঠুকাঠুকির পরিবেশ তৈরি করে? পাথরে পাথরে ঠুকাঠুকির ফলে সৃষ্টি হয় আগুন। যে আগুন কে আমরা বলি জ্ঞান। যে জ্ঞান অন্ধকার দূরে করে।
মনজুরুল ইসলাম বলেন, একে তো জ্ঞানকে আমরা সনদের ওজনে মাপতে শুরু করেছি। তার উপর গবেষণাকে পশ্চিম অনুসৃত পদ্ধতি ও প্রকাশনার শর্তের অধীনে এনে দেশীয় জ্ঞানকে গৌণ অবস্থানে ঠেলে দিয়েছি। এখন বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সাধারণ চাকরীতে স্থায়ী হওয়া ও পদোন্নোতি পাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। এর একটি কারণ আমাদের উচ্চশিক্ষার সামনে পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বাজার।
তিনি বলেন, পুঁজির প্রধান মন্ত্র হচ্ছে মুনাফা। পুঁজির কোনো মানবিক মুখশ্রী নেই। যা আছে লাভের এবং লোভের। শিক্ষার পেছনে যখন এই অমানবিক পুঁজির বিনিয়োগ হয়, শিক্ষা তার উদ্দেশ্য বা আদর্শিক উদ্দেশ্য হারায়। শিক্ষার দুটি উদ্দেশ্য ন্যায়নিষ্ঠতা ও মানবিকতাকে আমরা ক্রমাগত অবহেলা করে আসছি।
সমাবর্তন বক্তা বলেন, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায় থেকে আমরা মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী পরীক্ষার্থী তৈরি করছি। যে দুটি অঞ্চল থেকে নীতিনিষ্ঠতা ও মানবিকতার সূত্রগুলো তারা পাবে এবং সেগুলো জীবনে ব্যবহার করবে সে দুটি অঞ্চল থেকে তাদের আমরা ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছি। এর একটি হচ্ছে- সংস্কৃতি আর অন্যটি সমাজ। সংস্কৃতির একটি সংজ্ঞা হলো- নিরন্তর পরিশুদ্ধতার চর্চা। যে শিক্ষার্থী জীবনে সাহিত্য পড়েনি, লোকসাহিত্য যার নাগালের বাইরে, যে সঙ্গীত-চিত্রকলা বা প্রকৃতি পাঠে কোনোদিন প্রবেশাধিকার পায় নি, তার অন্তর্গত সুচিন্তা ও ঔদার্যের সঙ্গে মিলিয়ে নীতিনিষ্ঠতা ও মানবিকতা বিকশিত হবে না। বরং ছক বাঁধা শিক্ষাক্রমে তাকে সেসব গুলিয়ে দেবে। তাকে বাজারের হিসেবে তার চিন্তাভাবনাকে মেলাতে উৎসাহিত করবে। আমাদের সমাজ থেকে যে সুনীতি চলে যাওয়ার পথে আছে তার মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষার নীতিনিষ্ঠতার চ্যুতি।
তিনি বলেন, সমাজ, যার কাঠামোটি গড়ে দেয় পরিবার, একসময় নীতিনিষ্ঠতার চর্চাকে উৎসাহিত করতো। কিন্তু সমাজ যত বস্তুগত উন্নতির দিকে গেলো অর্থাৎ বাজারের কব্জায় চলে গেলো, তত তার নীতিনিষ্ঠতায় ভাঙ্গন ধরতে থাকলো। এখন অনেক পরিবারেও দুর্নীতি নিরুৎসাহিত হয় না। ধর্মাচারের সাথে ধর্মের নীতি ও সৌন্দর্যবোধকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে মানবিকতা একেবারে হারিয়ে যায়নি। একে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
শাবি সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক হলেও এতে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদ আছে। তাই সত্যিকার উদারনৈতিক শিক্ষার পরিবেশ এখানে তৈরি করা যাবে, যাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকবে না। বরং সাহিত্য, দর্শন, সমাজতত্ত্বসহ নানা বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্তিতে তারা প্রকৃত জীবনধর্মী হয়ে উঠবে। এই ভিশন বা দূরদৃষ্টি অর্জনের যেই বড় কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া উচিৎ ছিল তা হয়নি। আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও প্রচলিত শিক্ষাচিন্তা তা হতে দেয়নি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদারনীতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে যেতে সক্ষম হয়েছে। মেধার বিকাশ সাধনের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আরও অনেকদূর অগ্রসর হতে পারতেন।
আপনার মন্তব্য