সিলেটটুডে ডেস্ক

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ২৩:৫৭

শিক্ষক রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে শাবি ছাত্রলীগকে ৮ সাবেক ছাত্রনেতার খোলা চিঠি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাদের প্রতি খোলা চিঠি লিখে শিক্ষক রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে থাকার আহবান জানিয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ৮ ছাত্রলীগ নেতা।

১৯৯৫ ব্যাচের ছাত্রলীগ নেতা ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ পলাশ, মাহবুবুর রহমান দীপু, পলক দত্ত, মোহাম্মদ জুনায়েদ হুসেন সোহাগ, অভিজিৎ কুমার বনিক, মাহবুবে সোবাহানী আল্লামা, শাখাওয়াত হোসেন এবং সুশান্ত দাস গুপ্ত স্বাক্ষরিত খোলা চিঠিটি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশ করা হলো:

"প্রিয় শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের ভাই ও বোনেরা,

শাবিপ্রবির সাবেক ছাত্রলীগ এর বড় ভাই হিসেবে তোমাদের জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা।

দেশের একশ্রেণীর মানুষ বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, প্রায়শ সমস্বরে উচ্চকন্ঠে চিৎকার করে “ছাত্র রাজনীতি বন্ধ কর, ছাত্রলীগ খুব খারাপ”। নবীন প্রবীণ কিছু বুদ্ধিজীবী যখন এভাবে সব ধরনের মিডিয়ায় ঢালাওভাবে ছাত্রলীগের প্রতি বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদেরকে সেই সুযোগ দিয়ে থাকেন, তখন অনেক নাগরিক সত্যি সত্যি সেটা বিশ্বাস করে ফেলতে পারেন যে, ছাত্রলীগ আসলেই বুঝি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। প্রাক্তন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে তাই আমাদের মনে হয়েছে, এর প্রতিবাদ করা দরকার এবং ছাত্রলীগের ছোটভাইদের প্রতি আমাদের বক্তব্যটুকু তুলে ধরা দরকার।

বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, কিছু নাগরিকের পক্ষ থেকে ভিন্ন যুক্তি আসছে। অনেকের এই আওয়াজকে কেউ অস্বীকার করার বা এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নাই। জবাবদিহি করতে হবেই। ছাত্রলীগের ভূমিকা পুরোপুরি ইতিবাচক নয় বিধায়ই এমন কথা আসছে।

কি অদ্ভুত রকমের গৌরবোজ্জ্বলই না ছিল ছাত্র রাজনীতির চেহারা! বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল ছাত্ররা। এমনকি কোনো কোনো ঐতিহাসিক আন্দোলনে তারা জাতীয় রাজনীতিকেও পথ দেখিয়েছে। ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১ ইতিহাসের পাতায় কোথায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা নেই ছাত্রলীগের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা?

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের সব অতীত গৌরব আজ ধূলিসাৎ হবার উপক্রম হয়েছে। স্বকীয়তার অভাব, মূল রাজনৈতিক দলের এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্ধ অনুসারী হয়ে স্বার্থান্বেষী হওয়া, অন্য দলের কর্মীদের অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ব্যবহার ছাত্রলীগকে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে এসবই হয়তো অনেকাংশেই ঠেকানো যেতো, যদি ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি শিক্ষকরা তাঁদের পেশাদারি দায়িত্ব পালন করতেন।

বর্তমানে শিক্ষকরাই রাজনীতিতে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছেন। ক্লাসরুম ছেড়ে শিক্ষকদের সকল মনযোগ যেনো গিয়ে থেমেছে রাজনীতিতে। ক্ষতিটা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার এবং ছাত্রদের। এমন ঘটনাও ঘটে যেখানে শিক্ষকরা ছাত্রদের ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করার চেষ্টা করছেন। শাবিপ্রবিতেই কয়েকদিন আগে ঘটে এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের রক্ষক, জ্ঞানের বৃদ্ধি এবং তা সুস্থ মানসিকতা ও উচ্চ মনন সম্পন্ন নাগরিক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নেতৃ্ত্ব তৈরী করার কথা ছিল, যারা রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতনভাবে স্বাধীন চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করবে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ শিক্ষকদের উপরে ছাত্রদের হামলার অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদের দাবীদাওয়া নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কেন শিক্ষকদের দাবীদাওয়া নিয়ে মাথা ঘামাবে? কেন তারা সেখানে অংশগ্রহণ করবে? কেন তারা সেখানে কোন পক্ষ নেবে? শিক্ষকরা একটিবারের জন্যও ভাবছেন না যে কেন আমরা মেধাবীদের এভাবে অসুস্থ রাজনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছি? শিক্ষক হিসেবে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ছাত্রদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির পরে ছাত্রদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছেন শিক্ষকরা। ছাত্রলীগের ৩ জন কর্মী ছাত্রলীগ থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার হয়ে গেলো। কই, কোন শিক্ষকের কোন চুল তো বাঁকা হয়নি।

উপাচার্য মহোদয় শিক্ষকদের এর আন্দোলনের মুখে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকেন বা প্রবেশ করতে পারেন না বা প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রদের ব্যবহার করেন। প্রশ্ন জাগে, এ রকম পরিস্থিতি কি একান্তই অনিবার্য ছিল? যাই হোক, এসব শিক্ষক রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার। সেটি নিয়ে কথা আমরা হয়তো বলতাম না। কিন্তু তারা সেখানে ছাত্রদের জড়িয়েছেন। তাই কথা না বলে পারছি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ভিত্তিক কার্যক্রম, শিক্ষা-সহায়ক কর্মসূচি (বিতর্ক, খেলাধুলা, বিজ্ঞান মেলা, চাকরি বিষয়ক সেমিনার ইত্যাদি), শিক্ষা সহায়ক সুযোগসুবিধা যেমন কম্পিউটার সুবিধা, উন্নত ক্লাসরুম, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ ইত্যাদি বৃদ্ধি করার দিকে গুরুত্ব দেয়া মানে শিক্ষার্থিদের মৌলিক চাহিদার দিকে খেয়াল রাখা। আমরা স্বপ্ন দেখি -- মেধাবী ছাত্ররা ছাত্রলীগে নেতৃত্ব দেবে, ছাত্র রাজনীতির পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে আসবে এবং ছাত্রদের মৌলিক দাবি-দাওয়া নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় সংকটেও ছাত্রলীগ অতীতের মতোই ঝাঁপিয়ে পড়বে। প্রাক্তন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে এই আমাদের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা, এই দাবী খুব বেশী কিছু তো নয়।

আহমদ ছফার লাইন কটি আজ বড় বেশী প্রাসঙ্গিক – “এই রকম নিস্ফলা–বন্ধ্যা সময়েও আমি বিশ্বাস করি, ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির প্রতি বিদ্যুতের অক্ষরে অমোঘ নির্দেশ জারি করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তেজিত হও, জাগ্রত হও, জ্ঞানের আলোকে জাগো, মানবতার আবেগে জাগো, প্রতিরোধের দুর্দম স্পৃহা বুকে নিয়ে নতুন পৃথিবী নির্মাণ করার প্রতিজ্ঞায় জাগো"

ছাত্রলীগের প্রিয় অনুজগণ, তোমরা ভবিষ্যত নেতৃ্ত্বর দাবীদার। তোমরা রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতনভাবে স্বাধীন চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করো। পড়াশুনাতে মনোযোগ দাও। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে একাত্ম হও। শিক্ষক রাজনীতি থেকে একশত হাত দূরে থাকো। তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ো না। এগিয়ে নাও ছাত্রসমাজকে। এগিয়ে নাও দেশ ও জাতিকে।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।"

ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ পলাশ
মাহবুবুর রহমান দীপু
পলক দত্ত
মোহাম্মদ জুনায়েদ হুসেন সোহাগ
অভিজিৎ কুমার বনিক
মাহবুবে সোবাহানী আল্লামা
শাখাওয়াত হোসেন এবং সুশান্ত দাস গুপ্ত।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত