১১ মার্চ, ২০২৬ ১৬:১৩
ছবি: সংগৃহীত
রাত নামলেই তারা অদৃশ্য হয়ে যেত শহরের সস্তা হোটেলগুলোর ভিড়ে। আবার ভোর হলেই একটি সাদা প্রাইভেটকার নিয়ে বেরিয়ে পড়ত সিলেটের পথে পথে। দিনের আলোয় তারা ঘুরে বেড়াতো শহরের ব্যস্ত সড়ক আর নির্জন রাস্তায়, সুযোগ খুঁজে অপরাধ করার জন্য। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলে সক্রিয় ছিল একটি চক্র—চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এমনকি ডাকাতির সঙ্গেও জড়িত ছিল তারা।
তাদের কৌশল ছিল সহজ কিন্তু চতুর। একটি নির্দিষ্ট গাড়িকে তারা বানিয়েছিল চলমান ঘাঁটি। রাতে অল্প সময়ের জন্য সস্তা হোটেলে উঠত, সকালে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত। এই কৌশলের কারণেই অনেকদিন ধরে তারা পুলিশের নজর এড়িয়ে চলতে পেরেছিল।
কিন্তু সবকিছুরই একসময় শেষ আসে। ৮ মার্চ ২০২৬, ভোর প্রায় ৬টা ৪০ মিনিট। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বালিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা পারভেজ নিশি শ্রীমঙ্গলে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য কমলগঞ্জের বটতলা বাজারে অপেক্ষা করছিলেন। তখনই একটি সাদা প্রাইভেটকার এসে তাকে শ্রীমঙ্গল যাবেন কি না জিজ্ঞাসা করে। তিনি রাজি না হওয়ায় গাড়িটি আশপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর নিশি বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলে গাড়িটি তাকে অনুসরণ করে। বাড়ির রাস্তার কাছে পৌঁছাতেই গাড়ি থেকে একজন নেমে তার মুখ চেপে ধরে জোর করে টেনে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। ১০–১২ হাত টেনে নেওয়া হলেও নিশি সাহস হারাননি। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে পালিয়ে নিরাপদে যেতে সক্ষম হন।
এই ঘটনার পর তিনি কমলগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।
মামলার পরপরই পুলিশের বিশেষ টিম তদন্তে নামে। মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, শ্রীমঙ্গল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান রাজুর নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে কমলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম তদন্ত করে। পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিঠু রায়, এসআই আমির উদ্দিন, এসআই রনি তালুকদার ও এএসআই হামিদুর রহমানসহ একাধিক টিম সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা অভিযানে নামে।
অবশেষে ১০ মার্চ সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— জাকির মিয়া (২৬), কাওছার আহমদ (৩৪) এবং জসিম মিয়া (৩৬)।
পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোবহানীঘাট এলাকার আত্মা কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে অপহরণের কাজে ব্যবহৃত সাদা প্রাইভেটকারটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা একাধিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। সিডিএমএস যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে চুরি ও মাদক আইনে একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তাদের দলের আরেক সদস্য জাহাঙ্গীর পলাতক রয়েছে, যার বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ তিনটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজান মাসের ভোরে ফাঁকা রাস্তায় একা পেয়ে ওই নারীকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে অপহরণের চেষ্টা করেছিল তারা।
অবশেষে দীর্ঘদিন ধরে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ানো সেই চক্রটি ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। তবে তদন্ত এখনো চলছে—কারণ পুলিশের ধারণা, এই চক্রের পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক লুকিয়ে থাকতে পারে।পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বেশ কিছু অপরাধের কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
পুলিশ আরও জানায়, রমজান মাসে ভোরে বেলা ফাঁকা রাস্তায় মেয়েটিকে একা পেয়ে তারা ধর্ষণের টার্গেট করে অপহরণের চেষ্টা চালিয়েছিল বলে জানা গেছে।
সিডিএমএস যাচাই করে গ্রেফতারকৃত জাকির, কাওসার এবং জসিমের বিরুদ্ধে চুরি এবং মাদক আইনে একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া তাদের দলের জাহাঙ্গীরের (পলাতক) বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ ৩টি মামলা রয়েছে।
আপনার মন্তব্য