প্রণবকান্তি দেব

১৪ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬ ১৫:২৬

প্রেমের নতুন উচ্চারণ

প্রণবকান্তি দেব

একসময় প্রেম মানেই ছিল দীর্ঘ চিঠি, আতরমাখা রুমাল, ডাকপিয়নের অপেক্ষা, হাতে লেখা কাগজে কালি ছড়িয়ে থাকা অনুচ্চারিত কাঁপন। প্রেম মানেই ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎ, সুনীল, আবুল হাসান,আর আল মাহমুদ। আর এখনকার প্রেম শুরু হয় একটি “Hi”,"whats up" দিয়ে, গভীর হয় একটি “Are you home?” প্রশ্নে, আর ভেঙে যায় একটি “seen”, একটি "Block"–এ।

সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে—কিন্তু হৃদয়ের স্পন্দন কিংবা মন কেমন কেমন করা কি বদলেছে? আজকের তরুণ-তরুণীরা প্রেমকে প্রকাশ করছে বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণ, ইমোজির নীরবতা, মিমের রসিকতা আর ডিজিটাল আচরণের সূক্ষ্ম সংকেত দিয়ে। তারা নিজের প্রেমের অভিধান রচনা করছে নিজেই।

এখন প্রেম মানে শুধু পার্কে বসে বাদাম চিবানো নয়; এখন প্রেম মানে রাত জেগে হোয়াটসঅ্যাপের ‘টাইপিং’ স্ট্যাটাসের দিকে তাকিয়ে থাকা, কিংবা পছন্দের মানুষের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ‘হার্ট’ রিয়্যাক্ট দিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দেওয়া। আজকের তরুণ-তরুণীদের আবেগের অভিধানে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু শব্দ। তারা এখন আর শুধু ‘ভালোবাসি’ বলে থেমে থাকে না। তাদের সম্পর্কে কখনো থাকে ‘ভাইব চেক’-এর অস্থিরতা, কখনো আবার দীর্ঘদিনের পরিচয় রূপ নেয় ‘সিচুয়েশনশিপ’-এ।

যেখানে আবেগ আছে প্রচুর, কিন্তু সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। তবুও দিনশেষে যখন যান্ত্রিক শহরের জ্যামে আটকে থাকা বাসে কেউ হেডফোনের এক পাশ প্রিয় মানুষের কানে গুঁজে দেয়, তখন সেই আদিম মায়াটুকু ঠিকই বেঁচে থাকে।
ডিজিটাল এই যুগে মান-অভিমানের ধরণও বদলেছে। এক সময় অভিমান মানে ছিল কথা বন্ধ করে রাখা, আঁড়ি দেয়া আর এখনকার অভিমান মানে হলো ‘সিন করে রিপ্লাই না দেওয়া’ কিংবা হুট করে প্রোফাইল পিকচার সরিয়ে ফেলা।

প্রিয় মানুষটির কোনো কাজ পছন্দ না হলে তারা সরাসরি বলে দেয়, “তোমার মাঝে কিন্তু প্রচুর রেড ফ্ল্যাগ দেখতে পাচ্ছি!” আবার কেউ যখন অতি যত্নে আগলে রাখে, তখন তাকে অনায়াসেই দিয়ে দেয় ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’-এর তকমা।

তবে এই শব্দের মারপ্যাঁচের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর একাকিত্বও। স্ক্রিনশট আর স্ক্রিন রেকর্ডিংয়ের ভিড়ে তারা আজও খোঁজে এমন একজনকে, যার কাছে নির্দ্বিধায় হওয়া যাবে ‘ভালনারেবল’ (Vulnerable)। যে মানুষটি তার সবটুকু পাগলামিকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে বলবে, “ইটস ওকে, আই গট ইউ!”

লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপে থাকা মেয়েটি যখন ভিডিও কলে স্ক্রিন শেয়ার করে প্রিয় মানুষের সাথে সিনেমা দেখে, কিংবা টিউশনির টাকা জমিয়ে ছেলেটি যখন তার প্রেমিকাকে শহরের দামী কোনো ক্যাফেতে নিয়ে গিয়ে বলে, “আজ সব ট্রিট আমার পক্ষ থেকে”—তখন বোঝা যায়, মাধ্যম বদলালেও হৃদয়ের উচাটনটুকু বদলায়নি।

হয়তো আজকের প্রেম অনেক বেশি দ্রুতগামী, হয়তো এখানে ‘গোস্টিং’-এর ভয় আছে, আছে হুট করে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তবুও সব জটিলতার ভীড়ে এক চিমটি রোমান্টিকতা নিয়ে বেঁচে আছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তাদের প্রেমের ভাষা আলাদা হতে পারে, তাদের প্রকাশের ভঙ্গি হতে পারে বিচিত্র; কিন্তু দিনশেষে এক জোড়া হাত শক্ত করে ধরার আকুলতাটুকু আজও অমলিন। কারণ, প্রেম মানে তো আসলে কোনো সংজ্ঞায় আটকে থাকা নয়, প্রেম মানে হলো সবটুকু অনিশ্চয়তা জেনেও কারো জন্য নিজের ইনবক্সটা খোলা রাখা।

এটা সত্য, সম্পর্কের অভিধান এখন আগের চেয়ে বিস্তৃত, জটিল ও সূক্ষ্ম। আগে “বন্ধু” আর “প্রেমিক/প্রেমিকা”—এই দুই পরিচয়েই সম্পর্কের সীমা নির্ধারিত হতো। এখন শোনা যায়— “We’re just vibing.”, “ও শুধু crush, সিরিয়াস কিছু না, কিংবা “Low-key relationship রাখছি, অথবা “He’s my comfort person"। এই শব্দগুলো শুধু স্ল্যাং নয়; এগুলো সম্পর্কের আবেগগত অবস্থান বোঝানোর সূক্ষ্ম উপায়ও বটে।

প্রযুক্তির থাবায় ভাষা এখানে সম্পর্কের মানচিত্র এঁকে দিচ্ছে—যেখানে সাদা-কালো নয়, আছে অসংখ্য ধূসর রেখা। “তুই honestly আমার safe place", “তোর সাথে কথা বললেই mood টা better হয়ে যায়, “তুই না থাকলে দিনটা incomplete লাগে, " “আমি তোকে নিয়ে overthink করি" - এসব বাংলা ইংরেজির যুগপৎ বয়ানেই তৈরি হয় সম্পর্কের নানা সমীকরণ।

আবার আজকের প্রেমে অনেক কথা না বলেও বলা হয়ে যায় ইমোজির মাধ্যমে। যেমন: “খুব রাগ করছি ????”, “তুই না থাকলে আমি ????”, “আজকে তোকে অনেক miss করছি ????”, “তুই আমার মানুষ ????”, “ঘুমিয়ে পড়িস না, কথা বলি একটু ????❤️” ইত্যাদি একেকটি ইমোজি কত শত গল্প, কবিতার সমান হয়ে যায় মুহুর্তেই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উতাল হাওয়ায় উড়ে গেছে আমাদের বহুকিছু।

এখন কোন সম্পর্কের ঘোষণা মানেই সরাসরি ফেসবুক রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস নয়। বরং প্রিয় মানুষের হাতের তালু বা কফির কাপের সাথে তার একটুখানি অবয়ব মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝাপসা ছবি পোস্ট করা—যাকে তারা বলে 'সফট লঞ্চ'। এটি এক ধরণের মিষ্টি লুকোচুরি, যেখানে সবাই জানে কিন্তু কেউ নিশ্চিত নয়।

আবার আগে যাকে বলা হতো ‘প্রিয় বন্ধু’, কিংবা 'সই', আজ তার নাম ‘বেস্টি’। অনেক সময় এই বেস্টিই হয়ে ওঠে মনের মানুষ। অন্যদিকে, একতরফা প্রেমের ক্ষেত্রে এখনকার তরুণরা বেশ মজার একটি শব্দ ব্যবহার করে—‘ডেলুলু’। কেউ হয়তো জানে তার প্রিয় মানুষটি তাকে ভালোবাসে না, তবুও কল্পনায় ঘর বাঁধে সে। তারা হাসিমুখে বলে, “Delulu is the only solulu (solution)”, অর্থাৎ কল্পনাই তাদের একমাত্র সমাধান। এই হালকা চালের কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নিঃসঙ্গ প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস।

প্রেমের ভাষা কখনো স্থির ছিল না। এটি নদীর মতো—সময়, সমাজ ও প্রযুক্তির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিশ্বায়নের প্রবল প্রতাপে কাঁপছে এখন তরুণ মন। সবখানেই তা-ই পরিবর্তন। তারা আর আগের মতো হাতে লেখা চিঠি দেয় না, কিন্তু রাত জেগে অপেক্ষা করে একটি রিপ্লাইয়ের জন্য। হয়তো তারা দীর্ঘ কবিতা লেখে না, কিন্তু লিখে— “Text me when you reach.” এই ছোট বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অগাধ মমতা।

ডিজিটাল এই যুগে প্রেমের ভাষা ছোট হয়ে এলেও তার ব্যাপ্তি কিন্তু কমেনি। হয়তো এখন আর চিঠির ওপর চোখের জল পড়ে না, খামের ভাঁজে লুকোয়না বিষন্নতা কিন্তু ফোনের ওপাশে ব্লক হয়ে যাওয়া প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা তরুণটির নীরবতা কোনো অংশে কম হাহাকারময় নয়। কি-বোর্ডের টাইপিং বাবল আর ব্লু-টিকের অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি মুহূর্তই যেন এক একটি কবিতার একেকটি গল্পের জন্ম দেয়।

শেষ কথা এটাই, ভাষা বদলায়, মাধ্যম বদলায়— কিন্তু ভালোবাসা তার পথ খুঁজে নেয়, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব উচ্চারণে।

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত