২২ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬ ২০:২৬
মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বিশ্ব একত্রিত হয়েছিল নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ। ভারতের জন্য এটি ছিল গভীর গর্ব ও আনন্দের মুহূর্ত—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, প্রতিনিধি ও উদ্ভাবকদের স্বাগত জানাতে পেরে।
ভারত যে কাজই করে, তা করে ব্যাপকতা ও উদ্যম নিয়ে—এই সামিটও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শতাধিক দেশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। উদ্ভাবকেরা অত্যাধুনিক এআই পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করেন। প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে হাজারো তরুণ-তরুণীকে দেখা গেছে প্রশ্ন করতে, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত কল্পনা করতে। তাদের কৌতূহল এই সামিটকে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক গণমুখী এআই সম্মেলনে পরিণত করেছে। আমি এটিকে ভারতের উন্নয়নযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখি—কারণ এআই উদ্ভাবন ও প্রয়োগে একটি গণআন্দোলন সত্যিই সূচিত হয়েছে।
মানব ইতিহাসে বহু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ধারাতেই স্থান পায়—আগুন, লিখনপদ্ধতি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতো। তবে এআই-এর বিশেষত্ব হলো—যে পরিবর্তনে আগে দশক লেগে যেত, তা এখন কয়েক সপ্তাহেই ঘটতে পারে এবং সমগ্র পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পারে।
এআই শুধু যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করছে না; এটি মানব ইচ্ছাশক্তির এক বহুগুণ বৃদ্ধি। তাই এআই-কে যন্ত্রকেন্দ্রিক নয়, মানবকেন্দ্রিক করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এই সামিটে আমরা বৈশ্বিক এআই আলোচনার কেন্দ্রে মানবকল্যাণকে স্থান দিয়েছি—‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’ নীতিকে সামনে রেখে।
আমি সবসময় বিশ্বাস করি, প্রযুক্তি মানুষের সেবা করবে—মানুষ প্রযুক্তির নয়। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ইউপিআই হোক বা কোভিড টিকাকরণ কর্মসূচি—আমরা নিশ্চিত করেছি যে ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো সবার কাছে পৌঁছায়, কাউকে পিছনে ফেলে নয়। একই চেতনা আমরা এই সামিটেও দেখেছি—কৃষি, নিরাপত্তা, দিব্যাঙ্গদের সহায়তা এবং বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযুক্তিগত সমাধানে।
ভারতে এআই-এর ক্ষমতায়নের ইতিমধ্যেই বহু উদাহরণ রয়েছে। সম্প্রতি ভারতের দুগ্ধ সমবায় সংস্থা Amul চালু করেছে ‘সারলাবেন’ নামের একটি এআই-চালিত ডিজিটাল সহকারী, যা ৩৬ লক্ষ দুগ্ধচাষী—যাদের অধিকাংশই নারী—তাদের নিজস্ব ভাষায় গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছে। একইভাবে, ‘ভারত ভিস্তার’ নামের একটি এআই-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কৃষকদের আবহাওয়া পূর্বাভাস থেকে বাজারমূল্য পর্যন্ত নানা তথ্য বহুভাষায় সরবরাহ করছে।
মানুষ কখনোই যেন কেবল তথ্যের উপাদান বা যন্ত্রের কাঁচামাল হয়ে না পড়ে। বরং এআই-কে হতে হবে বৈশ্বিক কল্যাণের এক হাতিয়ার—বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনকারী। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দিতে ভারত উপস্থাপন করেছে মানবকেন্দ্রিক এআই শাসনের কাঠামো—
*MANAV ফ্রেমওয়ার্ক*:
* *M – Moral and Ethical Systems (নৈতিক ও নীতিগত ভিত্তি):* এআই নৈতিক নির্দেশিকায় পরিচালিত হবে।
* *A – Accountable Governance (জবাবদিহিমূলক শাসন):* স্বচ্ছ নিয়ম ও শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
* *N – National Sovereignty (জাতীয় সার্বভৌমত্ব):* তথ্যের উপর জাতীয় অধিকারকে সম্মান করতে হবে।
* *A – Accessible and Inclusive (অভিগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক):* এআই যেন কিছু মানুষের একচেটিয়া সম্পদ না হয়।
* *V – Valid and Legitimate (বৈধ ও যাচাইযোগ্য):* এআই আইনসম্মত ও যাচাইযোগ্য হতে হবে।
‘MANAV’, যার অর্থ ‘মানব’, ২১ শতকে এআই-কে মানবিক মূল্যবোধে ভিত্তিস্থ করার নীতিমালা উপস্থাপন করে।
বিশ্বাসই এআই-এর ভবিষ্যতের ভিত্তি। জেনারেটিভ সিস্টেম যখন বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট তৈরি করছে, তখন ভুয়া ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। যেমন খাদ্যে পুষ্টির লেবেল থাকে, তেমনি ডিজিটাল কনটেন্টেও থাকা উচিত সত্যতা-প্রমাণের লেবেল। ভারত ইতিমধ্যেই কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করেছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে যৌথ মানদণ্ড প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে।
শিশুদের কল্যাণ আমাদের হৃদয়ের খুব কাছের বিষয়। এআই ব্যবস্থায় এমন সুরক্ষা থাকতে হবে, যা দায়িত্বশীল ও পরিবার-নির্দেশিত ব্যবহার নিশ্চিত করে—যেমনটি আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব দিই।
প্রযুক্তি তখনই সর্বোচ্চ কল্যাণ বয়ে আনে, যখন তা ভাগ করে নেওয়া হয়—কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গোপন রাখা হয় না। উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম লক্ষ লক্ষ তরুণকে প্রযুক্তিকে আরও নিরাপদ ও মানবিক করে তুলতে অবদান রাখার সুযোগ দেয়। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হলো সম্মিলিত প্রজ্ঞা। এআই-কে বৈশ্বিক সাধারণ সম্পদ হিসেবে বিকশিত হতে হবে।
আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ ও বুদ্ধিমান ব্যবস্থা একসঙ্গে সৃষ্টি করবে, কাজ করবে ও বিকশিত হবে। সম্পূর্ণ নতুন পেশার আবির্ভাব ঘটবে। ইন্টারনেটের সূচনায় যেমন সম্ভাবনার পরিধি কল্পনা করা যায়নি, তেমনি এআই-ও সৃষ্টি করবে নতুন পেশা ও অসংখ্য সুযোগ।
বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীই হবে এআই যুগের প্রকৃত চালিকাশক্তি। আমরা দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃদক্ষতা অর্জন ও আজীবন শিক্ষাকে উৎসাহিত করছি—বিশ্বের বৃহত্তম ও বহুমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুবসমাজ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার আধার হিসেবে ভারত এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রস্তুত। সামিটে ভারতীয় সংস্থাগুলো দেশীয় এআই মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন উন্মোচন করেছে—যা আমাদের উদ্ভাবনী শক্তির প্রমাণ।
এই অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে ‘ইন্ডিয়া এআই মিশন’-এর অধীনে আমরা শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলছি—হাজার হাজার জিপিইউ স্থাপন করেছি এবং আরও স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের কম্পিউটিং সুবিধা নিশ্চিত করে ক্ষুদ্রতম স্টার্টআপকেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছি। পাশাপাশি, জাতীয় এআই রিপোজিটরি গড়ে তুলে ডেটাসেট ও মডেলের গণতন্ত্রীকরণ নিশ্চিত করছি। সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা অবকাঠামো, স্টার্টআপ ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা—সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল জুড়ে আমরা কাজ করছি।
ভারতের বৈচিত্র্য, গণতন্ত্র ও জনমিতিক গতিশীলতা অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। ভারতে সফল সমাধান বিশ্বমানবতার জন্যও কার্যকর হতে পারে।
বিশ্বের প্রতি আমাদের আহ্বান স্পষ্ট—
*ভারতে নকশা করুন ও উন্নয়ন করুন। বিশ্বে পৌঁছে দিন। মানবতার কল্যাণে পৌঁছে দিন।*
লেখক: নরেন্দ্র মোদী: ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
আপনার মন্তব্য